ইউনূস সাহেব, জবানের লাগাম টানুন

Kaniz Aklima
কানিজ আকলিমা সুলতানা

কানিজ আকলিমা সুলতানা: একথা অনস্বীকার্য যে, ১৯৭৬ সালে ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দেশের গ্রামীণ নারীদের একটা বিপুল অংশ পেশাজীবীতে পরিণত হয়। সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে সেই ঋণের টাকা দিয়ে হাঁস মুরগী, গরু, ছাগল কিনে  প্রতিপালন করে বা সবজি উৎপাদন করে বাজারজাত করে নারীরা অর্থ উপার্জন শুরু করে। প্রাথমিক অবস্থায় এই টাকার উপর নারীদের তেমন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। স্বামী বা ছেলের জন্য ব্যাংক ঋণ নিতো তারা। নিজের কাজের জন্য নিলেও পরিবারের পুরুষরাই এই টাকা খরচের ব্যাপারে মতামত দিতো বা নারীর হয়ে টাকা লেনদেনের কাজটুকু তারাই করতো। কিন্তু ধীরে ধীরে  অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ঋণের টাকা দিয়ে ছোট পরিসরে স্বাধীনভাবে নানা ধরনের কাজ শুরু করে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করে।

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম যখন শুরু হয় তখন যে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে জামানত ছাড়া ঋণ পাওয়া ছিল এক অলীক স্বপ্ন। চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বহু মানুষ তখন ভিটেহারা হতো। অন্যদিকে দেশের প্রচলিত নিয়মানুসারে ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে যে ধরনের জামানত চাইতো তা দেয়ার ক্ষমতা  দরিদ্র পরিবারগুলোর ছিলনা। বিশেষত স্থাবর-অস্থাবর যেকোনো ধরনের সম্পত্তিতে নারীদের মালিকানা না থাকায় নারীরা ব্যাংকে কোন রকম দলিল দস্তাবেজ দাখিল করতে পারতো না।

বুদ্ধিমান ডঃ ইউনূস সেইসময় এই সমস্যাটিকে সঠিক ভাবে চিহ্নিত করতে সমর্থ হন এবং কোনো রকম জামানত ছাড়া সহজ শর্তে গ্রামীণ নারীদের মাঝে ঋণ কার্যক্রম শুরু করেন। ঋণ পাওয়ার পর সময়সূচী অনুসারে নির্ধারিত পরিমাণ ঋণের টাকা কিস্তিতে শোধ করবে, শুধু এই একটি মাত্র শর্তে নারীরা যখন ঋণের ব্যবস্থা করতে পারলো  তখন ক্ষুদ্র ঋণের বৃহৎ সুদের হার নিয়ে তাদের কোনো  জিজ্ঞাসাই রইল না। উল্লেখ্য যে, ডঃ ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণের সুদের প্রকাশ্য হার ২০% এবং গুপ্ত হার ৩০%, মতান্তরে ৪৪%।

নারীরা এই হিসাবটিকে বড় করে না দেখলেও সময়ের সাথে সাথে নারীদের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণের বিপরীতে বিশাল সুদের পরিমাণ ডঃ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিলকে স্ফীত করে তুললো। সুচতুর ডঃ ইউনূস একটা সামাজিক সুযোগ তৈরীর মাধ্যমে এই দেশের অশিক্ষিত দুর্বল মানুষের শ্রমকে শুষে ফুলে ফেঁপে উঠলেও সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের কাছে নিজেকে আদর্শবাদী অর্থনীতিবিদ হিসেবে তুলে ধরতে সমর্থ হন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের দেশটিতে গত বিয়াল্লিশ বছরেও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আইনের দুর্বলতা, প্রশাসনের দুর্নীতি, দক্ষ আদর্শবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অভাবে এই দেশের সাধারণ মানুষেরা দিনের পর দিন নানা ভাবে প্রতারিত হয়ে চলেছে। সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় ডঃ ইউনূস গরীবের বন্ধু সেজে দীর্ঘকাল গরীবের রক্তচোষার কাজটি করে গেছেন।

গত প্রায় চল্লিশ বছরে দেশের বহু অর্থনীতিবিদ এবং সুধীজন নানাভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের চরম উচ্চ সুদের হারকে বিশ্লেষণ করে প্রমাণিত করার পরও কোনো সরকারই এই সমস্যার প্রতিকার করেনি। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি একটা কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারিতে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে একের পর এক নির্বাচিত সরকার থাকার পরেও গ্রামীণ ব্যাংক দীর্ঘকাল স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে গিয়েছে, উপরন্তু কোনো না কোনোভাবে সরকারী সহায়তা পেয়ে এসেছে। যার উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে জনসাধারণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন প্রযোজ্য হয়। অন্যান্য নিয়মের মধ্যে মহা-পরিচালক, পরিচালক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বয়স, বেতন, নিয়োগ ইত্যাদি সেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকে।

কিন্তু ডঃ ইউনূস এই সবের কোনো তোয়াক্কা কখনো করেননি। নির্ধারিত  বয়স পেরিয়ে গেলেও তিনি স্বপদে বহাল থেকেছেন, বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি নিয়ে গেছেন। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংককে সু-ব্যবস্থাপনায় আনতে উদ্যেগী হয়েছে। কিন্তু ততদিনে পানি অনেক ঘোলা হয়ে গেছে। ইউনূস সাহেবের রাজনীতিকায়ন হয়ে গেছে। পক্ষ-বিপক্ষ উভয়েই কদর্য বাকযুদ্ধে নেমেছে।

২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ও ডঃ ইউনূস সম্মিলিতভাবে শান্তিতে নোবল পুরস্কার পেয়েছে। যারা নোবল পুরস্কার দিয়েছে তাদের বিচারবুদ্ধি বা উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায়, একটা প্রতিষ্ঠানকে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় নিলে নোবেল পুরস্কারের সাথে সাংঘর্ষিক হয় না। আজ যারা ইউনূস সাহেবকে অন্ধ সমর্থন দিচ্ছেন তারা এই দেশের গরীব নারীদের মেহনতের কথা, তাঁদের শোষিত, বঞ্চিত হওয়ার কথা ভুলে যাচ্ছেন। আবার সরকারের সাথে সম্পৃক্ত যারা আজ ইউনুসকে ‘সুদখোর’ বলে চিৎকার করছেন, তারাও ভুলে গেছেন তাদের আগের শাসন আমলে তিনি নির্বিঘ্নে তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে গেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে এক বক্তব্যে ডঃ ইউনূস নারী সমাজের উদ্দেশ্যে বলেছেন যে, যারা গ্রামীণ ব্যাংক দখল করবে, নারীরা যেন তাদের হাতে ভেংগে দেয়। ডঃ ইউনুসের এই ধরনের বক্তব্য দেশের আইনের শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা, যা শান্তিকামী মানুষদের কাছে একেবারেই অভিপ্রেত নয়। যিনি এতকাল এই দেশের নারীদের শোষণ করলেন আজ তিনি তাঁদেরকে দেশের আইনের বিরোধিতা করতে বলে অন্যায়ের পারদ তুঙ্গে তুলছেন।

ডঃ ইউনূস, আপনি এই দেশের নারীদের এখনো মূল্যায়ন করে উঠতে পারেননি। খনার উত্তরাধিকারী এই দেশের নারীরা বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরমাতা, বিজ্ঞ ও সহনশীল। ঘর, মাঠ, চাকরি, ব্যবসার কাজে, গার্মেন্টসের মেশিনে আর লক্ষ লক্ষ শিশুর শিক্ষাদানসহ নানা ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত তাঁরা যুদ্ধ করে চলেছে প্রগতির জন্য, কল্যাণের জন্য। শিশু জন্মের পূর্ব শর্ত হিসেবে ন্যূনতম পরিবেশ বা খাদ্যের সরবরাহ ছাড়াই এই দেশের মায়েরা একের পর এক সফল মানুষ জন্ম দিয়ে যাচ্ছে, তাকে সততা, সভ্যতা শিখিয়ে জীবনের পথে উপযুক্ত করে তুলছে।

ডঃ ইউনূস, আপনাকে বিনয়ের সাথে বলতে চাই, শাসককুলের কালো অধ্যায় আপনাকে এই দেশের গরীব মানুষের রক্ত চুষতে দিয়েছে। পশ্চাদপদ সমাজের নারীদের ঘামে ভেজা টাকায় আপনি নোবেল জিততে পেরেছেন, সামাজিক ব্যবসার নামে নানা অপকর্ম চালিয়ে গেছেন, ঋণের টাকায় সাম্রাজ্য গড়তে এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের সাথে আপনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো আচরণ করে তাঁদের দুধের গরু, হালের বলদ, ঘরের চালা কেড়ে নিয়েছেন। কত অভাগা ফাঁসিতে ঝুলে ঋণের কবল থেকে মুক্তি পেতে প্রাণ দিয়েছে।

কিন্তু আর নয়। সময় এসেছে, এই সমাজ আপনার কাছে হিসাব চাইবে, নারীরা তাঁদের প্রাপ্য বুঝে নিবে। এই মায়ের জাতির সাথে হাত ভেংগে দাও, পা ভেংগে দাও জাতীয় অশালীন ভাষায় কথা বলবেন না। তাঁরা কোনটা ভাংবে, কোনটা গড়বে সেটা আপনার কর্পোরেট হুকুম দিয়ে পরিচালিত হবে না। দয়া করে জবানের লাগাম টানুন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.