দেনমোহর: এক টাকা

joutukগওহার নঈম ওয়ারা: আমাদের প্রিয় এক কমরেডের মেয়ে বিয়ে করলেন এক টাকা দেনমোহরে। কমরেডের মেয়ে হিসাবে চিনতাম না, তাকে চিনতাম মেয়ের বান্ধবী হিসাবে। থ্রি থেকে এক সাথে পড়েছে। স্কুলের গেটে দেখেছি বহুবার। বাড়িতে এসেছে কম। বেশি দেখেছি- একুশের মিছিলে, বই মেলায়, পয়লা বৈশাখে, চারু কলায়, রমনায়, শাহবাগে কখনো একা, কখনো দল বেঁধে বন্ধুদের সাথে। গলা ছেড়ে কথা বলে- চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট করে বলে যেটা বলতে চায়। বাবা অন্ত প্রাণ।

মাস দশেক আগে ওর বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথম জানতে পারি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একদা সার্বক্ষণিক কর্মী শিক্ষক সমিতির অন্যতম কান্ডারি ছিলেন মেয়েটির বাবা। রমনার টেনিস ক্লাবের সামনে প্রথম জানাজা হলো। খণ্ডিত-অখণ্ডিত কমরেডদের অনেকেই এলেন- কারো সাদা চুল, কারো পায়ে ব্যাথা, আহ্ উহুর বন্যা ব’য়ে গেলো। সবাই তখন মেয়েটির গার্জেন- ‘এখন তুমি আমার মেয়ে’। তবে পতাকা আনতে ভুলে গেছেন তাঁরা। শাহবাগে ফুলের ব্যবসা না থাকলে হয়তো ফুল আনতেও দেরি হতো। পার্টির পতাকা নেই। জাতীয় পতাকাও পাওয়া গেলো না একজন মুক্তিযোদ্ধা চলে গেলেন।

এরপর আরও তিনটা জানাজা হয় মুন্সীগঞ্জের রামপালে, ফরিদপুরে আর শেষ যাত্রায় ভাঙ্গায়। নম: নম: করে গার্ড অব অনারও পান তিনি। ঢাকা ফিরে এবার মেয়েটি একেবারে একা হয়ে যায়। হপ্তা অন্তে বাবা তার কাজের জায়গা থেকে ঢাকায় ফিরবে এই আশায় সপ্তাহ কেটে যেতো মেয়েটার। বাবার সাথে গল্প, রান্না আর খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে ফুরুত করে কেটে যেতো শুক্কুর শনির চক মেলানো দু’টো দিন। মেয়েটা আবার একলা হয়ে যেতো- চাকুরির চেষ্টায়; খণ্ডকালীন চাকুরিতে-বা বই পড়ে কাটিয়ে দিতো আবার পাঁচটা দিন। বাবা সব সপ্তায় আসতেন না, তখন আবার মন খারাপ হতো। পরের সপ্তায় বাবা এলে মন ভালো হয়ে যেতো, ফুর ফুর করে কথা বলতো- হাসতো। ভাঙ্গায় মাটির ঘরে রেখে আসা বাবা আর আসেন না। বাড়িওয়ালা চিন্তায় পড়ে। কে দেবে ভাড়া- কতোদিন চলবে এভাবে। স্পষ্টভাষী মেয়েটাকে কাছে টেনে নিতে ভয় পায় অনেক আত্মীয়। মেয়েটাও স্বাধীনভাবে থাকতে চায়, থাকতে চায় নবজাগরণ মঞ্চের কাছাকাছি।

শুধু কি ভয় ? ভয়ের চাঁদরের নীচে লোভটার কথা ভুলে গেলে চলবে কিভাবে ? কমরেড যাওয়ার আগে মেয়ের নামে পৈত্রিক সম্পত্তির কিছু হেবা করে যাননি। দলিল সব তার নামে- নামাজ পড়ি আর না পড়ি, ধর্ম মানি না মানি ভাগ বাটোয়ারা তো শরীয়ত মতেই হবে। মেয়েতো বাবার নামের সব সম্পত্তি পাবে না। ছেলে হলে পেতো- বাবার ভাই কিছু পাবে, ভাইয়ের ছেলে-মেয়েরাও ভাগ পাবে। তবে মেয়েটির এখন প্রধান সমস্যা ঢাকায় থাকা ! কিভাবে কোথায় কার কাছে থাকবে? তার প্রিয় বন্ধুটির চাকরি হওয়ায় একটা দিশা পায় মেয়েটি।

গায়ে হলুদ, কাবিন, বিয়ে সংবর্ধনা, দিনক্ষণ ঠিক হয়। কার্ড ছাপানো হয়। নিমন্ত্রণ, দাওয়াত, হল বুকিং সব চলে একেবারে কেতাবি ঢংয়ে। আর পাঁচটা বিয়ের মতো, তবে অনেক সাদা-সিধা অনারম্বড় ছিলো সেসব পর্ব।

গোল বাঁধলো কাজী আসার পর। তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে মেয়ের পক্ষের প্রায় সব শর্ত একে একে লেখার পর কাজীর কলম ভেঙ্গে গেলো দেনমহরের কলামে এসে। মেয়ে এবং ছেলে দু’জনেই ঠিক করেছেন তাদের দেনমোহর হবে এক টাকা – শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার জন্য।

আজকাল বিয়ের আসরে মেয়ে পক্ষ যেমন দেন মহরের টাকা বাড়াতে চায় আকাশের সীমানায়। ছেলে পক্ষও তেমনি এটাকে টেনে নীচে নামাতে চায় মাটিতে,পারলে মাটির নীচে। এই নোংরা দড়ি টানাটানি তাদের দু’জনের বিশেষ করে মেয়েটির একেবারেই পছন্দ নয়। তার যুক্তি, আমার দাম কি টাকা দিয়ে মাপা ঠিক? তার কাছে এটা খুবই অসম্মানজনক; বুঝাতে চেষ্টা করি এটা নারীর অধিকার। তোমরা যে উদাহরণ তৈরি করবে সেটা যদি আবার কোন কপট পুরুষ অবাধে সস্তায় বিয়ে শাদী করার একটা মওকা হিসাবে ব্যবহার করে তখন কি হবে?

মেয়েটার যুক্তি অনেক স্বচ্ছ- দেনমোহরের যাঁতাকলে বিয়ে স্থায়ী করার যে খেলা চলে, সেটা আমাদের ভাঙ্গতে হবে। আমি নিজে যদি আমার জীবন প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তাহলে অন্যদের কিভাবে বলবো। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই সমান একজন টাকা দেবে আরেকজন সেটা নেবে এ ব্যবস্থা চালু থাকলে বৈষম্য, অধিকার হরণ এসবই চলতে থাকবে। কাজী জীবনে এরকম কথা শোনেনি। বিয়ের পিঁড়িতে বসে কোন মেয়ে এরকম আচরণ করতে পারে, তা তার বিশ্বাস হয়না।

আমি মেয়েটার যুক্তি সমর্থন করি- ভাবি এটা তার জীবন। তাদের জীবন তারা যেভাবে চালাবে সেটা যদি অন্য কারো ক্ষতি না করে তাহলে আমরা বাধা দেওয়ার কে? আমি একা হয়ে যাই মজলিশে। বাহাস চলে আমার আর কাজীর মধ্যে। এখন কাজীরা ফি নেন দেনমোহরের টাকার উপর শতকরা হিসাবে- সেটাও তো ভাববার বিষয় !!

দেনমোহর এক টাকা হলে কি হবে? মজলিসের এক বুজুর্গ সে কথার রেফারেন্স টেনে কাজীর মেজাজ আরও খিজলে দিলেন। আপোষ রফার ফরমুলা বের করেন অন্যরা। একটা অংক বসিয়ে দিয়ে পুরোটা উশুল দেখানোর পুরানো ফরমলা। মেয়েটা রাজী হয় না। বলে তাহলে আমি বিয়েই করবো না। কাজী মোবাইলে ইতি-উতি পরামর্শ করেন। সবাই শরিয়তের কথা বলে- মোবাইলে ধরিয়ে দেয় অচেনা এক জবরদস্ত ওস্তাদ হুজুরকে। আমি সালাম দিয়ে কথা শুরু করি। কিন্তু আমাদের দু’জনের উচ্চতা দু’রকম- লেভেল প্লেইয়িং ফিল্ড নয়। দু’জন যোজন যোজন দূরের মানসিকতা নিয়ে কি কথা বলবো? আমি হাদিসের বর্ণনা দেই, দুই খুরমা তিন খেজুর দেনমোহরের কথা বলি। তিনি বিবি ফাতেমার দেনমোহরের কথা বলেন। আমি বলি, বিয়ে হচ্ছে দু’জন পুর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে একটা চুক্তি সে চুক্তির শর্ত কি হবে এটা তারা ঠিক করবে। আমরা দেখবো কোন অমানবিক, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অসামাজিক শর্ত আছে কি-না।

 বাহাস চলতে চলতে রাত গড়িয়ে প্রায় মধ্যরাত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে কবুল করে মেয়ে।

 সঙ্গত কারণে এ লেখায় কারোর নাম ব্যবহার করা হলো না তবে বিয়ের আসরের সবাই সেটা প্রত্যক্ষ করেছেন। বিষয়টি এখন পাবলিক। ফেসবুকে চলে গেছে খবর।

 এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হোক সকলে মতামত জানান। যুক্তি তর্কে মুক্তি আসবে সমাজের। রীতির কারাগারে বাঁধা মানুষ মুক্ত সমাজ গড়তে পারেনা।  মেয়েটিকে ধন্যবাদ।

Gowher Nayeem Wara
লেখক

লেখক: শিশু অধিকার কর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.