সার্কাসের মেয়েটি!

0

women in circusঅপরাহ্ণ সুসমিতো: মেয়েটা মঞ্চে উঠেছে আজ লাল জিন্স পরে । তার উপর লাল টপস । আচমকা মনে হলো আগুন লেগেছে বুঝি মঞ্চে । এতক্ষণ দর্শকরা উসখুস করছিল । মেয়েটা দর্শকদের সামনে হেলেদুলে কুর্ণিশ করতেই সবাই নড়েচড়ে বসল । অভাবী দর্শকদের কেউ কেউ তীব্র শিস দিয়ে উঠল । পেটে খিদে থাকলেও শিস দেবার শক্তি অফুরান। কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।

আগুন রঙা মেয়েটা ঘুরে ঘুরে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়ে দেয় দর্শকদের । মাতোয়ারা হয়ে ওঠে চারপাশ । শোরগোল দেখে বোঝা গেল সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল আকর্ষণীয়া এই মেয়েটির । সার্কাসে নানা ধরনের খেলার মধ্যে এরই মধ্যে এই খেলাটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে । মেয়েটা আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় একটা বৃত্তাকার ডায়াসে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় । মাঝে মাঝে মুখ গোল করে একটা আঙ্গুল ঢুকিয়ে অশ্লীল ইশারা করে,দর্শক উত্তেজনায় আরও ফেটে পড়ে । মেয়েটা আবার কোমর দুলিয়ে স্টেজ ঘুরে আসে।

আগুন নেমে যায় .. যাদুকর কালো আলখেল্লা ড্রেসে মঞ্চে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে মূহূর্তে অনুমান করে নেয় আজ কত টিকেট বিক্রি হয়েছে । আনন্দে একটা মৃদু ঢেকুর ওঠে । গলা খাকারি দিয়ে সিরাজউদ্দৌলা’র কন্ঠ নকল করে শুরু করে;

“হিন্দু ভাইবোনদের আদাব,মুসলমান ভাইবোনদের আসসালামুআলাইকুম,খ্রীষ্টান ভাই বেরাদার গুড ইভিনিং । ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকেরা নিজ নিজ আসনে সোজা হইয়া বসেন । হাতের মুঠি খুইলা বসেন । হাত মুঠি কইরা বসলে এই মেয়েটির ক্ষতি হতে পারে,তার বুকে ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত হইয়া যাইতে পারে । আমি এখন খেলব পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন খেলা । মেয়েটাকে আমি চাকু ছুঁড়ে মারবো”.. পেছনের সারির দর্শকরা যাদুকরের কথা স্পষ্ট শুনতে পারে না ।

অধীর উত্তেজনায় টানটান হয়ে আসে শরীর । টাইট প্যান্টের মেয়েটা এখনো হেলেদুলে হাঁটছে । কোনো কোনো অতি আগ্রহী দর্শক আসন ছেড়ে মঞ্চের দিকে ছুটে যেতে চেষ্টা করে । স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রস্তুত,লাঠিসোটা নিয়ে আছে । ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় । শুধু যে সব দর্শকের হাতে টাকা দেখা যায়,তাদেরকেই ছাড় দেয় । টাকা হাতে উন্মত্ত দর্শক মেয়েটার দিকে টাকা বাড়িয়ে দেয় । মেয়েটা ঝুঁকে দর্শকের সামনে দাঁড়ায় । আহা ওরা সুযোগ পাচ্ছে টাকাটা মেয়েটার টপসের ভিতর গুঁজে দিতে । মঞ্চের আলো কখনো নিভে আসে । উল্লসিত দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়ে । যাদুকর শান দেয়া ছুরির ডালা নিয়ে আবার সামনে দাঁড়ায় । দর্শকদের ভিতর নেমে আসে পিন পতন নিস্তব্ধতা ..খেলা শুরু হচ্ছে ।

মেয়েটার বুকটা ধক ধক করে ওঠে অজানা ভয়ে । লাল লিপস্টিক মাখানো ঠোঁট শুকিয়ে আসে,অজান্তে জিভ দিয়ে খানিক ভেজানোর চেষ্টা করে তবু হাসিমুখটা ধরে রাখে । দর্শক আসনের আলো নিভে যায়..মঞ্চের সমস্ত আলো মেয়েটার উপর এসে পড়ে .. মেয়েটা নিজের জায়গায় গিয়ে পজিশন নেয় । ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে..এক পলক অভাবী মায়ের মুখটা মনে পড়ে.. অনুষ্ঠান প্যান্ডেলের বাইরে স্থানীয় সাংসদের অনুগত এক মাস্তান মোটর সাইকেলে বসে ঘনঘন সিগারেট ফুঁকছে । অপেক্ষায় আছে কখন এই ছুরি খেলা শেষ হবে আর আগুন মেয়েটাকে নিয়ে উড়াল দেবে । মেয়েটাকে তার চাই.. অপেক্ষার সময় খুব সমুদ্র দীর্ঘ,কাটে না । সিগারেট জ্বলে নেভে অন্ধকারে তারাবাতির মতো ।

রাতের আকাশে মেঘ মাঝে মাঝে চাঁদটাকে লজ্জায় লুকিয়ে রেখে আবার ছেড়ে দেয় । আলোর টানটান প্রভা নামে গোটা প্যান্ডেল জুড়ে । প্রথম চাকুটা মেয়েটার প্রায় গালের কাছে দিয়ে সাঁ করে ছুটে গিয়ে ডায়াসে খচ করে বেঁধে । মেয়েটা ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিল তবু হাসি নামে না ঠোঁট থেকে ।

অস্ফুট একটা নীরব কান্নার ধ্বনি ভেতরে মুচড়ে ওঠে.. : মা গো আমারে বাঁচাও..

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.