একজন হার না মানা বীথির গল্প

তৌহিদ জামান: চালকের আসনে একজন নিম্নবিত্ত নারী। তাও আবার ইজিবাইক। প্রথমেই চোখ থমকে যায়। অনভ্যস্ত চোখে দৃশ্যটি সয়ে নিতে কিছুটা সময় নেয়। কিন্তু চালক নির্বিকার। তার এদিকে নজর দেওয়ার ফুরসত কই। কতক্ষণে যাত্রী নিয়ে ছুটবেন, সেদিকেই মনোযোগ। তাছাড়া মানুষের চোখ এতোদিনে তিনি সয়ে গেছেন। বলা যায়, সইতে বাধ্য হয়েছেন। এ নিয়ে অবশ্য তেমন কোন আক্ষেপ নেই এই নারীর।

তার নাম বীথি বেগম। বয়স এখনও ত্রিশ ছুঁতে পারেনি। কিন্তু নামের আগে বিধবা শব্দটি জেঁকে বসেছে। নিজের শরীরের অবস্থাও ভাল নয়। বলা চলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। দুহাতে তেমন বল (শক্তি) পান না। তবুও ব্যস্ততম এই শহরের বুক চিরে প্রতিদিন পরিবারের সব সদস্যের মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দিতে নিরন্তর শ্রম দিতে হচ্ছে এই সাহসী কর্মজীবী নারীর। তিনি এই শহরের একজন যাত্রীবাহী ইজিবাইক (ব্যাটারিচালিত) এর চালক।

যশোর শহরতলী বিরামপুরের গাবতলায় পরের জায়গায় ঘর তুলে দু-ছেলে, অসুস্থ মা আর নানিকে নিয়ে থাকেন। সংসারের খরচ চালাতে বছরখানেক আগে ইজিবাইক চালানো শুরু করেন। এর আগে তিনি এলাকায় শাড়ি-কাপড় ফেরি করতেন।

সাতক্ষীরার কলারোয়ায় বীথির শ্বশুরবাড়ি। স্বামী-সংসার নিয়ে একসময় ডাল-ভাত খেয়ে মোটামুটি সুখেই ছিলেন। বছর নয় আগে স্বামী জুলফিকার আলী গাছ থেকে পড়ে আহত হন। তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে যায়। রাজধানীতে নিয়ে স্বামীর চিকিৎসায় ব্যয় হয়ে যায় অনেক টাকা। বিক্রি করতে বাধ্য হন স্বামীপক্ষ থেকে পাওয়া জমি-জিরাত সবকিছু। সব বিক্রি করেও শেষরক্ষা হয়নি তার। স্বামী জুলফিকার আর সুস্থ হন না। মারা যান, তাও প্রায় আট বছর হলো। ছোট ছেলে তানজিল তখন পেটে।

বীথি জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই যশোরে মা ও নানির সাথে আছেন। বড় ছেলে তানভীর ইসলাম যশোর উপশহরে একটি মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণীতে, আর ছোটছেলে তানজিল ইসলাম দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। সেখানে আরবির পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজিও পড়ানো হয় বলে জানান তিনি। নিজে খুব বেশি লেখাপড়া না শিখলেও সন্তান দুটিকে সর্বোচ্চ ক্লাস পর্যন্ত লেখাপড়া করানোর প্রবল ইচ্ছা বীথির।

যশোর শহর ও শহরতলীর প্রায় সব জায়গায় তিনি যাত্রী বহন করেন। দড়াটানা মোড় থেকে পালবাড়ি ভাস্কর্যের মোড়, কিংবা খাজুরা বাসস্ট্যান্ড থেকে মণিহার অথবা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সবখানেই তিনি যাত্রী নিয়ে যান। তার কোমল হাতে শক্ত করে ধরে স্বচ্ছন্দ গতিতে বাইক চালিয়ে পৌঁছে দেন যাত্রীদের কাঙ্খিত গন্তব্যে।

এখন পর্যন্ত যশোরের একমাত্র নারী চালক হিসাবে বেশ মর্যাদা নিয়েই তিনি প্রতিদিন করে যাচ্ছেন  নিজের কাজটুকু। পিছু ফেরার ফুরসত কই !

চালক হিসাবে তাকে যাত্রীদের ভীষণ পছন্দ। এমন এক যাত্রী নিপু বলছিলেন, পুরুষ চালকরা বেশ বেপরোয়া গতিতে বাইক চালায়। কিন্তু উনি (বীথি বেগম) তাদের মত নন, সাবলীল গতিতে চালান। শহরে নিয়মিত আসতে হয়। সেকারণে ইজিবাইক ব্যবহারও করতে হয় নিয়মিত। উনি থাকলে তার বাইকেই উঠি।

সংসারের ব্যয়নির্বাহে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ইজিবাইকে শহরময় যাত্রী পরিবহনে কাজ করতে হয় বীথিকে। তিনি বলেন, বাইকের হ্যান্ডেল ধরতে কষ্ট হয়। হাত দুটোয় তেমন শক্তি নেই। তবুও ছেলে আর মা-নানির কথা চিন্তা করে চালিয়ে যাচ্ছি। আর নিরাপত্তার কথা ভেবে আসরের আজানের পর আর গাড়ি চালাই না।

তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে দেড়শ থেকে দুশ টাকা উপার্জন হয় তার। এই টাকায় কোনোমতে চলছে তার সংসার। পরের জায়গায় ঘর তুলে থাকি। সেখানে জায়গার ভাড়াই মাসে আড়াইশ টাকা। ছেলে দুজনের লেখাপড়ার খরচ, সংসারের খরচ-বেশ কষ্টে-সৃষ্টে চলে দিন। এর মাঝেই একটা স্বপ্নের কথা বললেন, নিজের একটা বাইক থাকলে অনেক সাশ্রয় হতো। কেননা প্রতিদিন ইজিবাইকের মালিককে দিতে হয় সাড়ে চারশ টাকা।

জীবনযুদ্ধে লড়ে যাওয়া এই মানুষটার একটাই স্বপ্ন-সন্তান দুটি যেন লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হয়।

Bithi-Jessore pic

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.