পাথর ছুড়ে মারা নিষিদ্ধে জনমত গড়ে তুলুন

0

stoning pixউইমেন চ্যাপ্টার: এবছরেরই ১১ জুলাই পাকিস্তানে দুই সন্তানের তরুণী মা আরিফা বিবিকে পাথর ছুড়ে মারা হলো। তার একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল, তার কাছে মোবাইল ফোন ছিল। বিবির এই হত্যাকাণ্ডের জের ধরে একটি আন্দোলন এখন দানা বেঁধে উঠছে। ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ এমন অমানবিক শাস্তি বিলোপের জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন।

আরিফার এই কাহিনীই প্রমাণ করে, পাথর ছুড়ে মারা আগেও ছিল, এখনও আছে। কেন ও কিভাবে এই শাস্তি এখনও বিদ্যমান সমাজে, তা ভাবতে গেলেই এটা রহিত করাটা বেশ কঠিন ঠেকে। Women Living Under Muslim Laws ঘুরে এলেই মোটামুটি পরিস্কার হয়ে যায় বিষয়টা, আর তাতে করে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলাটাও অনেকখানি সহজ হয়ে যায়।

শরীয়া আইন অনুসারে শাস্তির একটি ধরন হচ্ছে এই পাথর ছুড়ে মারা। মৃত্যু পর্যন্ত ‘অপরাধীকে’ পাথর ছুড়ে মারা অব্যাহত থাকে। কিন্তু ২০১৩ সালেও কেন এই মধ্যযুগীয় বর্বর শাস্তি? বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এটাই সত্য যে, এখনও এটি ঘটছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। আরিফা বিবির ঘটনাটি তারই একটিমাত্র প্রমাণ। এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়, গণমাধ্যমে আসে না। প্রতিবছর অসংখ্য নারী প্রাণ দিচ্ছে এমন বর্বরতার।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের ১৫টি দেশে পাথর ছুড়ে মারাটাকে জায়েজ বলে ধরে নেওয়া হয় আইন মোতাবেকই। সেই দেশগুলোতে এটা যেমন অনুশীলন করা হয়, তেমনি আইন দিয়ে তা যুক্তিসঙ্গতও প্রমাণ করা হয়। ইরান, মৌরিতানিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেনে পাথর ছুড়ে মারাটা হচ্ছে আইনী শাস্তি। অন্যদিকে, ইরান, পাকিস্তান এবং সোমালিয়ায় এসব ঘটনা অহরহই ঘটছে। আর পাকিস্তানে যা ঘটছে তা কোন আইনী ব্যাখ্যা দিয়েও পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

তুলনামূলকভাবে আফগানিস্তান, ইরাক এবং মালিতে আইনে এ ধরনের শাস্তির অনুমতি না থাকলেও এ ধরনের শাস্তি অব্যাহত আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত নয়, এমন ব্যক্তিরাই এসব দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে এবং মালয়েশিয়ায় স্থানীয়ভাবে এই শাস্তির প্রচলন আছে, যদিও দেশ দুটিতে জাতীয়ভাবে এটি নিষিদ্ধ। তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? রাষ্ট্রের ভিতরেও এমন শক্তি বিরাজ করছে, যেখানে নারীরাই হচ্ছে এর প্রধান শিকার।stoned to death

নারীদের ওপরই প্রধানত এই খড়্গ নেমে আসে। কিন্তু কেন? একটু ফিরে দেখা যাক। পাথর ছুড়ে মারা হয় সাধারণত ব্যভিচারের অপরাধে, বা জেনা করার অপরাধে। নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণের নাম করেই সাধারণত এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে থাকে। তবে এর মূল শিকার কিন্তু ওই নারীরাই। একে লিঙ্গ বৈষম্যের আরেক রূপ হিসেবেও ধরা হয়ে থাকে। নারীর মৌলিক স্বাধীনতা এবং সংস্কৃতিগতভাবে যা তার ওপর আরোপিত আছে, এসবই নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উস্কে দেয় এইসব দেশে। এসব দেশে ব্যভিচারের অভিযোগ কেবলই আনা হয় নারীর বিরুদ্ধে, হাতে গোণা দু’একজন পুরুষ বাদে।

শরীয়া আইন অনুসারে দারিদ্র্য এবং অশিক্ষা নারীদের এক প্রধান শত্রু। এ দুটো কারণই তাদেরকে এই শাস্তির দিকে ঠেলে দিতে যথেষ্ট। তা আদালতের রায়েই হোক, বা নিজস্ব কমিউনিটির বিচার বা সালিশেই হোক।

২০০৮ সালে সোমালিয়ার ১৩ বছরের কিশোরী আয়শা ইব্রাহিম দুহুলোকে গলা পর্যন্ত মাটিচাপা দিয়ে ৫০ জন পুরুষ মিলে পাথর ছুড়ে মেরেছিল। ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিল এক হাজার মানুষ। দক্ষিণ সোমালিয়ার একটি স্টেডিয়ামে এই ঘটনা ঘটে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক রিপোর্টে বলা হয়, আয়শার বাবা বলেছিল, তার মেয়েকে তিনজনে মিলে ধর্ষণ করেছিল। কিন্তু মেয়েটি তখন আল শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে উল্টো তাকেই ব্যভিচারের দায়ে শাস্তি দেওয়া হয়।

পাথর ছুড়ে মারাকে ইসলাম এবং মুসলিম আইন অনুসারে ব্যভিচারের অন্যতম শাস্তি হিসেবে খাড়া করানোর চেষ্টা করা হলেও কোরানে এ ধরনের শাস্তির কোন নির্দ্দিষ্ট উল্লেখ নেই। আরও ভাল করে বলতে গেলে, অনেক বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ আছেন যারা বেশ খোলামেলাভাবেই এর বিরোধিতা করে আসছেন, সেইসাথে একে ‘ইসলামের আইনে অযৌক্তিক এবং সর্বসম্মত নয়’ বলেও উল্লেখ করছেন। ইরানের বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ আয়াতুল্লাহ ইউসেফ সানেই পাথর ছুড়ে মারার বিরুদ্ধে ফতোয়াই জারি করেছেন।

কিন্তু তারপরও থামছে কি এর অনুশীলন? মাঝে-মধ্যেই তো খবর চলে আসছে গণমাধ্যমের বদৌলতে। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই বা এর বিরুদ্ধে কি করছে? এ ধরনের শাস্তি যে অমানবিক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তা নিয়ে দ্বিমত নেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে। জাতিসংঘের সমস্ত চুক্তিও লঙ্ঘন হয় এর মধ্য দিয়ে। তারপরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর বিরুদ্ধে তেমন জোরালো কোন তৎপরতা আজতক চোখে পড়েনি।

আর এসব কারণেই পাথর ছুড়ে মারার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা মানবাধিকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে আজও সমাজে বিরাজমান। কোন আন্তর্জাতিক আইনই নেই একে নিন্দা জানানোর মতো, একে নিষিদ্ধ করার মতোন। এটাই সত্য।

ফলে আমরা যারা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষ, আমাদের কোন ধারণাই নেই, এর বিরুদ্ধে কি করে সোচ্চার হওয়া যায়? কি করে নারীদের এই গেঁড়াকল থেকে মুক্ত করে আনা যায়? শুধু এটুকুই বলা যায় ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের তাবৎ নারী-পুরুষকে এ ধরনের শাস্তি রহিতের লক্ষ্যে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, আমরা তাতে যোগ দিতে পারি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির অন্যতম লঙ্ঘন হচ্ছে পাথর ছুড়ে মারার মতো অপরাধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর তীব্র বিরোধিতা এবং সমালোচনাও করে আসছে বেশ অনেক আগে থেকেই। নতুন এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর বিরুদ্ধে আইনগত পরিবর্তন এনে একে চিরতরে নিষিদ্ধ করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেই জানাচ্ছেন আন্দোলনের উদ্যোক্তারা।

Women Living Under Muslim Laws সংস্থাটি এখন স্বাক্ষর সংগ্রহ করছে যাতে করে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার হাই কমিশনারের কাছে এ ধরনের শাস্তি নিষিদ্ধ ঘোষণার জন্য আহ্বান জানানো যায়। জাতিসংঘ যদি একটা উদ্যোগ নেয়, তবে নিশ্চিত ধরে নেওয়া যায় যে, আইনগত উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

তবে আর দেরি নয়, এখনই স্বাক্ষর করুন। আর বিস্তারিত জানতে চাইলে ইরান এবং নাইজেরিয়ার কিছু ঘটনার বিশ্লেষণ দেখে নেওয়া যেতে পারে। তাহলে বোঝা যাবে, আজকের এই যুগে কেন এ ধরনের বর্বরতম শাস্তি নিষিদ্ধ করা আশু প্রয়োজন।

Women Living Under Muslim Laws সংস্থাটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক সলিডারিটি নেটওয়ার্ক। যেসব নারী আইনের দ্বারা নির্মমভাবে শাস্তি-শোষিত, যাদের জীবন পরাধীন হয়ে আছে বিভিন্ন প্রথার মধ্যে তাদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে এই সংস্থাটি। শুধু তাই নয়, এটি সবধরনের সহায়তাও দিয়ে থাকে এবং আলোচনার একটি পথ প্রশস্ত করে। গত ২০ বছরে সংস্থাটির নেটওয়ার্ক ৭০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত হয়েছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.