‘শোনেন বলি নতুন করে পুরান ঘটনা….’

Gowher Nayeem Waraগওহার নঈম ওয়ারা: যারা নারী-পুরুষ দু’ধরনের রোগী দেখে থাকেন, তারা বলতে পারবেন কোন লিঙ্গের রোগী বেশি আসে। অস্বস্তিকর প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচার জন্যই হোক অথবা ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্যই হোক সরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে নারী-পুরুষের শয্যা সংখ্যা নিয়ে তেমন কোন বৈষম্য নেই। তবে নারী চিকিৎসকের ঘাটতি থাকায় জেলার নিচে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে নারী রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম চোখে পরে। আবার যেখানে নারী চিকিৎসক আছেন, সেখানে অন্যান্য উপজেলার নারী রোগীরা এসে ভিড় করতেই পারেন।

তবে হাসপাতালে শিশুদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে গেলে দেশব্যাপী নারী-পুরুষের সংখ্যা সাম্যতা ‘কখনো ভবিষ্যৎ’ চোখে পড়বে। সদ্যজাত শিশু ছাড়া অন্য শিশুদের দেখলে মনে হবে কেবল ছেলে শিশুরাই অসুস্থ্ হয়। মেয়েদের রোগবালাইয়ে তেমন একটা ধরে না।

ওয়ার্ড থেকে বেড়িয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে একবার আদমশুমারি করতেই মনে হলো ঘোরের মধ্যে ভুল গুনছি। ফিরে গিয়ে আবার গুনলেও ফলাফল একই থাকে। শিশু ছেলে রোগীর সংখ্যা শিশু মেয়ে রোগীর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। সাধারণভাবে মানুষ ছেলে শিশুই কামনা করে। ভ্রুণ হত্যার বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন হলেও ভারতের পথে-ঘাটে এসব ঘটেই চলেছে। এটা কোন ভারত বিরোধী প্রচারণা নয়, ভারতের সংবাদ মাধ্যম অনেক সোচ্চার বলেই এসব নিয়ে বিস্তর লেখা-লেখি আর গবেষণা স্টাডি জারী আছে, তথ্য পাওয়া যায়। আমরাও ধোয়া তুলসী পাতা না হলেও তথ্যের অভাবে সেসব ঘটনা চাপাই থেকে যাচ্ছে।

এশিয়ায় চীন আর উত্তর কোরিয়ার পরে নারী ভ্রুণ  হত্যায় দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ পাকিস্তান, ভারত, নেপাল আর বাংলাদেশ পরস্পরের সাথে পাল্লা দিয়ে না-কি হাত ধরাধরি করে এগিয়ে (আসলে পিছিয়ে) চলেছে।

এই রোগ মধ্যপ্রাচ্যেও আছে আগে তারা কন্যা শিশুকে কবর দিত, এখন প্রযুক্তির উন্নতি হওয়ায় আলজেরিয়া, মিশর, জর্ডান, লিবিয়া, মরক্কো, সিরিয়া, তিউনিশিয়া এমনকি প্রায় ইউরোপ তুরস্কেও নারী ভ্রুণ  হত্যায় বেশ ভালোই নম্বর অর্জন করেছে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ক্যামেরুন, লাইবেরিয়া, দ্বীপ দেশ মাদাগাস্কার, সেনেগাল আর নাইজেরিয়া- আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের দৌরাত্ম্যে মত্ত হয়ে উঠেছে।

এতো সবের পরেও যেসব মেয়ে শিশু শেষ পর্যন্ত জন্ম নিচ্ছে তারা কি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে? তারা কি তাদের পরিবারে ছেলে শিশুদের সমান নজর কাড়তে পারছে চিকিৎসা আর পুষ্টির জন্য? পরিবার কি ছেলে শিশু আর মেয়ে শিশুদের মধ্যে ফারাক বৈষম্য করে না? – এসব নিয়ে অনেক গবেষণা, ওয়ার্কশপ, সেমিনার হয়েছে আবার আগামী শীত মওসুমে আরও হবে।

আমার গণনায় ভুল হতে পারে মায়েরা মেয়ে শিশুকে ছেলে বলে পরিচয় করে দিতে পারেন। আমার ওয়াক অন মেথডলজি নিয়ে ভ্রু কুঁচকাতে পারেন গবেষণা বিশেষজ্ঞরা, তবে এটা আমার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে বসে বসে ‘‘টাইম পাস’’ উদ্ভাবন নয়।

একটা নয় একাধিক হাসপাতালে এ ছবি খুবই সাধারণ, সদ্যজাত শিশু ছাড়া শিশু ওয়ার্ডে ছেলে শিশুর সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বেশ। আদমশুমারীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এদেশে নারী-পুরুষে সমতার খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। তবে হাসপাতালের ছবিটা এমন কেন? তবে কি শিশু মেয়ে অসুস্থ্ হলে বাড়িতেই থাকে? শুধু ছেলে শিশুদের জন্যই অভিভাবকরা দৌঁড়ঝাপ করে ? হাসপাতালে ছোটে ? আমরা এক হাসপাতালে গুনে দেখি  ৭৪ জন ছেলের শিশুর বিপরীতে মাত্র ৪৭ জন মেয়ে শিশু।

সামাজিক আর পারিবারিক সাম্য বজায় রাখার জন্য এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুবই দরকার।

গভীর রাতে রোগী যখন আহা-উহু আহাজারী করে, তখন পুরুষ ওয়ার্ড থেকে কেবলই মা  মা  রব ভেসে আসে আর নারী ওয়ার্ডে দীর্ঘশ্বাসে থাকে বাবা ! বাবা গো ! বাবা ? এও এক মহা গবেষণার ব্যাপার। বাবার এতো জ্বালা সওয়ার পরে মেয়ে তার বাপকেই ডাকছে রোগীর বিছানায় শুয়ে শুয়ে। আর চিরকাল মেয়েদের শাসনের হাত পাকিয়ে পুরুষ ডাকে মাকে একান্তই কাতর স্বরে।

ওয়ার্ডে মেয়ে শিশু বেশি, না ছেলে শিশু বেশি এই তর্কে জল ঢালার ব্যবস্থা করেছে এক ওষুধ কোম্পানি। তারা এক ক্যালেন্ডার বের করেছে বিতরণের জন্য। ওখানে শিশুদের ডাক্তার আর রোগী হিসাবে মডেল করা হয়েছে। ডাক্তারও শিশু রোগীও শিশু আপাত:দৃষ্টে মজার ক্যালেন্ডার!! বিশেষ করে যে দেশে বেশির ভাগ বাবা-মা তাদের সন্তানকে ডাক্তার দেখতে চান আর এই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা শিশুর মধ্যে চালান করে দেন। তারপর তার শিশুরা তাদের শিশুদের- চলতে থাকে পরস্পর।

খালি চোখে বিখ্যাত ওষুধ কোম্পানির ঐ ক্যালেন্ডার খুবই নির্মল সুন্দর- ফুট ফুটে শিশুদের স্বপ্নের জগতে ভাসিয়ে দিয়েছে। তবে ক্যালেন্ডারটা দেখে একটা মেয়ে শিশু আমাকে মস্ত বড় একটা প্রশ্ন করেছে- ক্যালেন্ডারে কি শুধু মেয়ে শিশুদেরই অসুখ করে? একটা ছেলে শিশুকেও রোগী হিসাবে দেখায়নি ওষুধ কোম্পানি! বড়ই আশ্চর্য্যের কথা। কি কারণ থাকতে পারে? শিশুটির প্রশ্ন শোনার আগে বিষয়টি আমার চোখেও পড়েনি। বড়ই ভয়ংকর বিষয়।

 লেখক পরিচিতি: শিশু অধিকার কর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

শেয়ার করুন:
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.