প্রথম সিঁদুর খেললেন কলকাতার যৌনকর্মীরা

Kolkata sex workers
সিঁদুর খেলার পর আরতি দিচ্ছেন একজন

উইমেন চ্যাপ্টার: যৌনকর্মীর দরজার মাটি ছাড়া দুর্গা পূজাই হয় না। দরজার ভিতরের মানুষগুলো সমাজের চোখে অচ্ছুৎ হলেও, তাদের পাড়ানো মাটি আবার দেবতুল্য। কলকাতার যৌনকর্মীরা এতো বছর ধরে কেবল দূর থেকেই দুর্গা পূজা দেখে এসেছেন, কাছে যাওয়ার অধিকার তাদের ছিল না।

কিন্তু আন্দোলন-লড়াই করে এবার হাইকোর্টের নির্দেশ নিজেদের পক্ষে আনায় এবার মাকেও তারা ঘরে পেয়েছেন। মনের মতো করে সাজিয়ে পূজা করেছেন এবার। জীবনের সিংহভাগ অপূর্ণতা যেন কেটে গেছে এই অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে। পূজার পাঁচ-ছটি দিন তারা ভুলেই গিয়েছিলেন জাগতিক সব দীনতার কথা।

শাঁখা-পলা পরিয়ে সাধ মিটিয়ে সাজিয়েছেন দুর্গামাকে। আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, পূজা শুরুর সময় সেখানকার বাসিন্দা পূর্ণিমাদি-মিনতিদি-ভারতীদি-শিখাদিরা ধরা গলায় বলেছিলেন, “লোকে এত দিন পুজোর সময় আমাদের কাছে ফুর্তি করে পয়সা ছুড়ে দিয়ে চলে যেত। আজ পর্যন্ত জীবনে কখনও সিঁদুর খেলিনি। এ বার খেলব। ভোগ রাঁধব। ফল কাটব। অঞ্জলি দেব”। এসবই তারা করেছেন শেষ পর্যন্ত।

তিন মাস আগেও এই মেয়েরা ভাবতে পারেননি, পূজাটা হবে।  প্রতিমা যখন এলো, প্রথমটা নিজেরাও যেন সঙ্কোচ কাটাতে পারছিলেন না। আজন্মলালিত পাপ-পুণ্যবোধ মনের ভিতর গেঁথে ছিল, “আমরা মায়ের শরীর স্পর্শ করব?” তারপরই হঠাৎ নিজেকে ফিরে পেলেন তারা। এই অধিকার চেয়েই তো এত কিছু। কোর্ট-কাছারি। কীসের পাপ? কীসের অপবিত্রতা? “মা এসেছে আমাদের কাছে। আসার ছিলই।”

থালার উপর পানপাতার পাশে রাখা রুপোর কৌটো থেকে এক মুঠো সিঁদুর তুলে দুর্গাপ্রতিমার কপালে-গালে লাগিয়ে দিলেন পূর্ণিমাদি। তার পর ডান হাতে প্রতিমা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব পূর্ণিমাদিকে উঁচু কাঠের বেঞ্চ থেকে ধরাধরি করে নামানোর পরেও সামলানো যাচ্ছিল না। টুকটুকে ফর্সা মুখ কান্নার দমকে লাল হয়ে গিয়েছে। কাঁদতে-কাঁদতেই বলছিলেন, “মা চলে যাওয়ার আগে আমাদের সিঁদুর পরার অধিকার দিয়ে গেলেন। ভাবিনি এ জীবনে এই সম্মান কখনও পাব।”

এই প্রথম দশমীতে সিঁদুর খেলল সোনাগাছি। প্রতিমার কপাল থেকে নেওয়া সিঁদুর একে-অন্যের মাথায় লাগিয়ে সামাজিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অনেকটা পথ যেন এগিয়ে গেলেন যৌনকর্মীরা। দুর্গাপূজার প্রতীকী মাতৃশক্তির আরাধনার সঙ্গে শুরু হল প্রান্তিক যৌনকর্মীদের অধিকার লাভের নতুন অধ্যায়।

সোনাগাছিতেই জীবনের প্রায় তিরিশ বছর কাটিয়ে দেওয়া ভারতীদি, স্বপ্নাদি, মালতীদি, অনিমাদিদের কথায়, তাঁরা এতদিন ছিলেন আত্মপরিচয়হীন ত্রিশঙ্কুর মতো। না সধবা, না বিধবা। বাবুদের সঙ্গে সম্পর্ক  এবং সংসারকে স্বীকৃতি দেয়নি বাইরের সমাজ। তথাকথিত ভদ্রলোকেদের পূজায়য় সিঁদুর খেলতে গেলে প্রাপ্য ছিল ব্যঙ্গ আর কটূক্তি। সোনাগাছিতে এই প্রথম তাঁদের দুর্গাপূজা বাবুদের সঙ্গে তাঁদেরই স্বীকৃতিহীন সম্পর্ককে কার্যত প্রতিষ্ঠা করে গেল।

 তাইতো এবছর খুব ছোট করে পূজা হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। সুচারু ভাবে সবকিছু সম্পন্ন করার দায়িত্ব ছিল যৌনকর্মীদের কাঁধে। পঞ্চমীর দিন অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিটের দুর্বার ক্লিনিকে প্রতিমা আসার পর থেকে দু’চোখের পাতা বন্ধ করার সময় ছিল না তাঁদের। এক দিকে পুজোর সময়ে বাড়তি খদ্দের সামলানো, অতিরিক্ত চার পয়সা রোজগারের ব্যবস্থা করা।

Durga Shonagachhiঅন্যদিকে, পুজোর যাবতীয় আয়োজন। সপ্তমীর দুপুরে পুজোমণ্ডপে গিয়ে হইহই করে প্রসাদ নিয়ে এলেন সকলে। বেশিরভাগ লালপেড়ে সাদা শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ। কাজের তোড়ে এলোমেলো চুল কিন্তু মুখ আলো করা জিতে যাওয়ার হাসি।

ছোট্ট পূজা ঘরের সামনে একের পর এক গাড়ি এসে থামছে। বৌ-বাচ্চা-বয়স্ক বাবা-মা নিয়ে যৌনকর্মীদের ঠাকুর দেখতে আসছেন মধ্যবিত্ত বাঙালি। ভক্তিভরে নমস্কার করছেন। হাত পেতে প্রসাদ খাচ্ছেন। জোর করে চাঁদা দিচ্ছেন। দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না মেয়েগুলো। এঁরাই তো অন্য সময় তাঁদের পাড়ার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কপাল কুঁচকে, নাক সিঁটকে অচ্ছুতের মতো এড়িয়ে যায়।

‘তা হলে কি সামাজিক ছুঁৎমার্গ অনেকটা কাটল?” জিজ্ঞাসা করছিলেন ভারতীদি। অষ্টমীর দুপুরে খিচুড়ি-লাবড়া-পায়েসের ভোগ হাতে পেয়ে যেমন কল্যাণাদি, রিনাদিরা ছলছলে চোখে বলছিলেন, “আমাদের মতো মেয়েদের বাড়ি দুর্গাপূজার ভোগ আসবে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। আজ থেকে আর নিজেকে নিচু ভাববো না’।

 পুজোমণ্ডপের মাইকে তখন গমগম করে বাজছে, “যা খুশি ওরা বলে বলুক, ওদের কথায় কী আসে যায়, ওরাই রাতের ভ্রমর হয়ে নিশিপদ্মের মধু যে খায়….।”

ক্রমে দশমী আসে। বেলা বারোটার আগেই পুজো ঘরের সামনে বরণডালা নিয়ে যৌনকর্মীদের লম্বা লাইন। শুরু হয় সিঁদুরখেলা। ভক্তিমেশানো বাঁধনহীন, রঙিন উচ্ছ্বাসের উৎসব। তাতে মিশে যায় হাসি-কান্না। লরিতে মূর্তি, সামনে তাসাপার্টি-ঢাক নিয়ে শুরু হয় যৌনকর্মী মেয়েদের এলাকা পরিক্রমা। যোগ দেন কালীঘাট, বৌবাজার, খিদিরপুরের মতো বিভিন্ন এলাকার যৌনকর্মী এবং আগ্রাওয়ালি বাঈজিরা। গন্তব্য, নিমতলা ঘাট। আর এক প্রস্ত সিঁদুর খেলা। লালে লাল ঘাট, নদীর জল। ওঁদের অস্তিত্বকে রাঙিয়ে জলে মিশে গেল প্রতিমাও।

 (লেখাটি আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে নেয়া। ঈষৎ পরিবর্তিত।)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.