রোজ নামচা: সাহেরা কথা-২

Simple life-Piashলীনা হক: গত তিন সপ্তাহ ধরে কাজের চাপ আর ঘোরা ঘুরির ধকলে জেরবার  হয়ে আছি । আজকে বিজয়া দশমীর ছুটি । দেরীতে ঘুম  থেকে উঠলেও সমস্যা নাই । সাহেরাকে কাল বলে দিয়েছি আজ দেরীতে কাজে আসতে । সকালে ঘুম ভাঙ্গলো কল বেলের টুং টুং বাজনায় । ঘড়ি দেখি ৭ টা বাজে ! ঘুম চোখে দোর খুলে দেখি সাহেরা দাঁড়িয়ে। একটু অবাক হলেও ভাবলাম ঠিক আছে, অসুবিধা নাই, আমি আরেকটু ঘুমিয়ে নি আর সাহেরা  কাজ শেষ করুক। আমি  আবার বিছানায় ! কতক্ষণ ঘুমিয়েছি আবার, জেগে দেখি প্রায় সাড়ে ৯টা বাজে , সাহেরার কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না । বিছানায় থেকেই ডাকছি তাকে – চা কই ! সাহেরা এলো ধীর পায়ে , অন্য দিন সে দশভূজা দূর্গা  হয়ে সব কাজ সারে ।
তাকিয়ে দেখি মুখ চোখ ফোলা , মলিন চেহারা । হাতে শুধু আমার চায়ের মগ । তোমার চা কই ?  কি হয়েছে ? মগ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সাহেরা খাটের পাশে মেঝেতে বসে । আবার জিজ্ঞেস করি , কি হয়েছে ? হাঁটুতে মুখ গুঁজে সাহেরা কেঁদে ওঠে ! আমার কেমন  জানি মাথা কাজ করে না । কি হলো সাহেরার ? গতকাল তাকে ঈদের বোনাস দিয়েছি  আর একটা সালোয়ার কামিজও  দিয়েছি তারই পছন্দমত ফিরোজা রঙের ! কাঁধে হাত রেখে আবার জানতে চাই কি হয়েছে ! কান্নাভেজা গলায় যা সে বর্ণনা করে তাতে আমি নিজেকে এত অসহায় বোধ করি ।
স্বামীটি তার পেশায় রিকশাচালক , কিন্তু পেশার চেয়ে  নেশার পিছনেই সময় কাটে তার । সংসারের ঘানি সাহেরার কাঁধে । কিন্তু এসবতো আমি জানি । স্বামীটিকে ডেকে বুঝানোর অসার চেষ্টাও আমি করেছি শুধু সাহেরার প্রতি স্নেহের মায়ায় । সাহেরার স্বামী জুয়া আর গাঁজায় আসক্ত ।
সাহেরার ভাষায় , তাদের বস্তির বেশিরভাগ জুয়াড়ি গাঁজা দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে ‘হিরনচি’ ( হেরোইন আসক্ত) হয়ে যায় । সাহেরার স্বামী ‘ক্যারম’ নামের নির্দোষ খেলাটি টাকার বিনিময়ে খেলে । সোজা বাংলায় ‘জুয়া ‘। এই জুয়ার আড্ডা গুলি আবার বস্তির মালিক এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পালিতরা চালায় । পুলিশের সাথেও তাদের সমঝোতা আছে ! তো গতকাল  স্বামীটি  রিকশা চালায় নাই । হাতে যেটুকু টাকা ছিল জুয়াতে খুইয়েছে- প্রায়ই সে এটা করে। তারপরে ঘরের জিনিসপত্র (কিই বা  আছে ) বিক্রি করে । তো বোনাসের টাকাটা সাহেরা  আমার কাছেই রেখেছিল, টি এন্ড টি বাজারে একটা কাঁচের শো কেস তার  পছন্দ হয়েছে ।
সাহেরা মোট ৪ হাজার টাকা বোনাস পেয়েছে আর আমার কাছ থেকে সে ধার করেছে  আড়াই  হাজার টাকা , মোট সাড়ে ৬ হাজার দিয়ে সে শো কেসটি কিনবে, তার সস্তা মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় শো কেসের ছবি তুলে এনে আমাকে দেখিয়েছে । গতকালই সে ধারের টাকা সহ সব টাকা নিয়ে গেছে  বাসায় । টাকাটা সে রেখেছিল বালিশের তুলার ভিতরে, তার উপরে সেলাই । সন্ধায় সাহেরা গেছে বাজারে – তরি তরকারি জন্য । এর মাঝে স্বামীটি ঘরে এসে মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছে তার মা টাকা কোথায় রেখেছে , মেয়ে না বলাতে মেয়ের গলা টিপে ধরেছে, তো ছোট ৯ বছরের মেয়ে ভয়ে বলে দিয়েছে । বালিশ কেটে ৩ হাজার টাকা নিয়ে ( কি অসীম বিবেচনা যে পুরো টাকা নেয়  নাই !) স্বামী তার ফিরে গেছে জুয়ার আড্ডায় । ঘরে এসে  অবস্থা দেখে সাহেরার মাথায় আগুন জ্বলে – তার রক্ত জল করা টাকা – আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব পরিশ্রমের রোজগার । সে ক্যারম খেলার আড্ডায় গেছে এর একটা বিহিত করতে । তারপরের ঘটনাও নুতন কিছু নয় – আমরা  কম বেশী সবাই ধারণা করতে পারি ।
স্বামীর  বেধড়ক পিটুনি খেল সাহেরা ,  মেয়ে মানুষের এত বড় সাহস , স্বামীর কাজে বাধা দেয় , তার কাছে টাকা লুকিয়ে রাখে কৈফিয়ত চায় – ধারা ১২৪ এ – রাষ্ট্রদ্রোহ।  তাকে মারতে মারতে ঘরে আনলো স্বামী । শুধু মেরেই ক্ষান্ত হলো না , ঘরের জিনিসপত্র ভাঙ্গলো , আমার দেয়া নুতন জামাটা কুটি কুটি করলো , পড়শীরা ছাড়াতে এলে হুমকি দিল , ‘পুরুষ মাইনষের এট্টুখানি শখ ( !) যে ইস্তিরি সন্মান করতে পারে না , সেই ইস্তিরি না থাকলেই বা কি । ‘কালি কুষ্টি ( সাহেরা শ্যামলা) হারামজাদির ঢং  সে ভেঙ্গে দিবে , দুই পয়সা কি কামাই করে ( পুরো সংসার সাহেরার কাঁধে !) আর অমনি ‘দেওয়ানীগিরি’ ! সে যদি ঢাকা শহরে না নিয়ে আসতো তাহলে সাহেরা কি গুলশান বনানীর বাসায় কাজ করার সুযোগ পেতো ! টাকার গরম দেখায় স্বামীকে !  শুধু মাত্র মেয়ের দলা জন্ম দেয়া এই ‘নাকায়ম্যা বেটি ছাওয়া ‘ কে সে ইচ্ছে করলে ‘তালাক ‘ ও দিতে পারে ! হোক সে দু মেয়ের বাপ , ইচ্ছে করলেই সে এখনো যেকোনো ‘ অবিয়াত্ত্যা চেংড়ি ‘কে ঘরে তুলবার পারে !
তালাকের হুমকিতে কেউ কেউ সাহেরাকে বোঝালো এই ক্ষেপা কুকুরের সাথে এই মূহূর্তে তর্ক করে বরং সাহেরারই সর্বনাশ হতে পারে, যদি সবার সামনে তালাক উচ্চারণ করে ফেলে ! রাতটা কোনমতে কাটিয়ে সাহেরা যেন আমার সাথে পরামর্শ করে !
কি পরামর্শ দিব আমি সাহেরাকে ! সান্তনা দিলাম , কাল দুপুরের পরে আর খায়নি সে,  স্নান সেরে তাকে খেতে বললাম, ওষুধ দিলাম । আপত্কালীন অস্ত্র হিসেবে আমার পুলিশ কর্মকর্তা ভাইয়ের কথা তার স্বামীকে জানিয়ে দিতে বললাম । কিন্তু এই ঠেকা দিয়ে আর কতদিন ?
একটু  ধাতস্থ আর কিছুটা আশস্ত ( আমি তো জানি আমার উপরে সাহেরার এই নির্ভরশীলতার কোনো কোনো সমস্যার সমাধানই আমি করতে পারব না !) হয়ে সাহেরা চলে গেলো । আমিও পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বন্ধুদের সাথে  সময় কাটানোর জন্য মগবাজারে চলে গেলাম । সেখানে বন্ধু আবার বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছে ! কিন্তু সারাদিন সব হাসি আনন্দের মাঝেও সাহেরার কথা মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না ! কেন এমন হবে বাংলাদেশের মেয়েদের জীবন ! একটা ছোট্ট অন্য ভাষার শব্দের বিভীষিকায় আটকে কেন থাকবে তাদের জীবন ! আর কতদিন !
লেখক: উন্নয়নকর্মী।
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.