কার্বন ফুট প্রিন্ট!

0

sundarban pixতানিয়া মোর্শেদ: আমি হচ্ছি এক মেছো বাংগালী। মানে মাংস না খেয়ে অনেক দিন থাকতে পারি, কিন্তু মাছ ছাড়া থাকা কঠিন। কয়েক দিন হয়ত নিরামিষভোজী হয়ে থাকতে পারি। কিন্তু এক সময় মাছের জন্য প্রাণ কাঁদে! তাই চেষ্টা করেও তা হতে পারিনি! প্রায় একুশ বৎসরের প্রবাস জীবনে বেশ কয়েক জায়গায় থাকা হয়েছে।

জাপানের দেড় বৎসরের প্রবাস জীবনে যেদিন জানলাম যে, বাংলাদেশের মাছ পাওয়া যায় এক জায়গায়, কী যে আনন্দ হয়েছিল! বিদেশী বন্ধুদের ইলিশ ভাজা খাইয়েছিলাম! দেখিয়ে দিয়েছিলাম কাঁটা চামচ দিয়ে কিভাবে কাঁটা বাছতে হয়!

তারপর ইন্ডিয়ানাতে থাকবার সময় মাছ খোঁজা শুরু করতে জানলাম যে, এশিয়ান কয়েকটা দোকানে মাছ পাওয়া যায় (এখানকার, বাংলাদেশী নয়), তবে না কেনাই ভালো। নদীর মাছ! নদীর মাছ কেন কেনা যাবে না?! যাবে না কারণ এদেশের নদীগুলোর মাছ কেউ খায় না, দূষণের জন্য! মাছ খাওয়া মানে প্রধানত সমুদ্রের মাছ। আর ফার্মের মাছ। একবার পূর্ণদা বেড়াতে আসলে শিকাগো নিয়ে গেলেন বেড়াতে। বাংলাদেশী দোকান থেকে মাছ কিনে কী খুশী!

কিছুদিন পর এক মালয়েশিয়ান দোকানে ইলিশ আনা শুরু করলো! কী আনন্দ! স্টুডেন্ট মানুষের সংসারে এ তো বিলাসিতা! মাঝে মাঝে তবুও কেনা হতো! তারপর বরের চাকরির সুবাদে ক্যালিফোর্নিয়া। তখনো সিলিকন ভ্যালীতে বাংলাদেশী দোকান হয়নি! একবার নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে (না কী দু’বার) পাকিস্তানী দোকান থেকে ইলিশ কিনলাম! পরে আর যাইনি। কিছু সময় পর বাংলাদেশী দোকান হওয়াতে বাঁচলাম!

এখন যেখানে বাস, এক দোকানে বাংলাদেশী মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু কেনা হয় খুব কম। কারণ মাছে ফরমালিন থাকে যদি! ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আরও সচেতন হয়েছি। তাই অনেক দিন পর পর কিনি। সমুদ্রের স্যামনই ভরসা! মাঝে মাঝে ফার্মের ক্যাট ফিস আর তেলাপিয়া। ফার্মের নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফার্মের মুরগি, মাছ, মাংস সব সব খাবার আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। যে পদ্ধতিতে গ্রোথ হরমোন দিয়ে এদের পালন করা হয়, যে খাবার দেওয়া হয় তা আজ আর প্রশ্নাতীত নয়। বেশ অনেক বৎসর ধরেই তাই অরগানিক খাবারের বিষয়টা চলে এসেছে। অনেকেই সব অরগানিক খাবার কিনছেন। বাড়িতে আর কিছু অরগানিক না হলেও মিল্ক অরগানিক, যখন থেকে দীপ্ত (আমার ছেলে) তা পান করছে।

গ্রোথ হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক ইত্যাদি ব্যবহারের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আজ গবেষণার বিষয়। এক জায়গায় পড়েছিলাম যে, আজ যে কর্ন খাওয়া হয় তা আদৌ মানুষের খাদ্যের পর্যায়ে আছে কি না! এটা সত্যি যে ফার্ম, জেনেটিক মডিফিকেশন ইত্যাদির কারণে খাদ্যের পর্যাপ্ততা বেড়েছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য, সবার খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য এগুলো দরকার। কিন্তু এগুলো প্রশ্নাতীত বিষয় নয়। আজ যত মানুষের যত ধরনের ক্যান্সার, কিডনি, লিভারের সমস্যা এর সাথে খাদ্যের সরাসরি সম্পর্ক আছে, তা অস্বীকার করবার উপায় নেই। শুধু খাদ্য নয়, নিত্য ব্যবহার্য সব জিনিস নিয়েই চিন্তা করবার বিষয় আছে। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করবার জন্য যে কেমিক্যালস ব্যবহার করা হয় তা থেকে শুরু করে মেইক আপের জিনিস সবকিছুতেই ক্ষতিকর পদার্থ আছে। মাত্রার তীব্রতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে তবে উপস্থিতি নিয়ে নয়।

আর যে কল-কারখানায় এগুলো উৎপাদিত হয় তার যে বর্জ্য যা মাটি, পানি, বাতাসে যায় তা কী পরিমাণ ক্ষতিকর তা জানবার জন্য পরিবেশ বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্লাস্টিকের জিনিস ছাড়া আজ জীবন কল্পনা করা যায় না। কিন্তু তা পরিবেশের জন্য কী পরিমাণ ক্ষতিকর! পরিবেশের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর জন্য রিইউজ (পুনর্ব্যবহার), রিসাইকেল আজ অবশ্য প্রয়োজন। আর যে সব প্লাস্টিক জিনিসের বিকল্প আছে তা ব্যবহার করতে হবে। যে টয়লেট পেইপার ব্যবহার করা হয় তা সাদা না হয়ে রঙ্গিন হলেই অনেকটা বায়ু দূষণ কমানো যায়। রঙ্গিন থেকে সাদা করবার জন্য যে একস্ট্রা প্রসেসের (অতিরিক্ত প্রক্রিয়া) মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা বাদ দিলেই অনেক ক্ষতি কমানো যায়। কিন্তু “রঙ” সচেতন (!?) মানুষ কী রঙ্গিন টয়লেট পেইপার ব্যবহার করবে?!

শিল্প কারখানার কাছে মানুষের বসতি না থাকা সবার কাম্য। একইভাবে কাম্য এমন কোনো জায়গায় শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠা যা সেই জায়গায় এমন ক্ষতি করে যা ইররিভার্সেভল। আজ পর্যন্ত কোনো দেশে এমন কোনো শিল্প কারখানা (তা যে জিনিসেরই হোক) গড়ে ওঠেনি যা পরিবেশের উপর কোনোই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। যত উন্নত ধনী দেশই হোক না কেন। পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা আজ প্রতিটি নাগরিকের, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের অবশ্য কর্তব্য। শুধু নিজের জন্য নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরের জন্য, এই পৃথিবীর টিকে থাকবার জন্য। দ্বিতীয়বারের মত ব্যানফ, লেইক লুইস, জ্যাসপার (অ্যালবার্টা, কানাডা) বেড়াতে যেয়ে অ্যাথাবাস্কা গ্লেসিয়ারে গিয়েছিলাম, ২০০৭-এ। কিছুদিন আগে এক বন্ধু সেখানে গিয়েছিল। ছবি দেখেই বুঝলাম এই ছয় বৎসরেই গ্লেসিয়ারের আয়তন কমে গেছে! খালি চোখেই দৃশ্যমান তা! এরকম আরো অনেক জায়গার পরিবর্তন দেখছি!

ছোট্ট এক টুকরো কাগজও রিসাইক্লিনিং -এ দেই বলে অনেকেই হাসলেও আমার কথা হচ্ছে যে, বিন্দু বিন্দু জলেই সাগর হয়। ছোট্ট ছোট্ট কাগজ একসাথে করলেই অনেক কাগজ। আর আমি প্রতিদিন সচেতন থাকলে একাই কিছুটা করছি, এভাবে সবাই যদি করি তবে নিশ্চয় তা অনেক হবে! আমি থাকবো না, কিন্তু পৃথিবীকে তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য করে রাখা আমার দ্বায়িত্ব, কর্তব্য। আর শুধুই কী মানুষের জন্যই পৃথিবী! সব প্রাণী, উদ্ভিদের জন্যই বাসযোগ্য রাখতে হবে। মানুষ হয়ে জন্মেছি যখন তখন পৃথিবীতে আর কিছু রেখে না গেলেও কার্বন ফুট প্রিন্ট রেখেই যাবো, তবে তা যতটা কম হয় ততই মংগলজনক।

বাংলাদেশের গর্ব সুন্দরবন। বৃহৎ অর্থে পৃথিবীর গর্ব। এখন কথা হচ্ছে তার পরিবেশ নিয়ে আমরা কে কতটা সচেতন। কিছুদিন ধরেই দু’ দিকের (রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে) লেখালেখি দেখছি। পক্ষের লোকদের কাছে প্রশ্ন, কোনোই ক্ষতি হবে না বিশ্বাস করেন কি ভাবে? বিজ্ঞানের সামান্য জ্ঞান থাকলে বোঝার কথা যে, কোনো শিল্প কারখানায়ই পরিবেশের উপর কোনোই ক্ষতি করে না, এটা যুক্তিহীন। আর কয়লা-নির্ভর শিল্প কারখানা কী পরিমাণ ক্ষতিকর তা জানা না থাকলে একটু পড়াশোনা করেন। বর্তমানে অনলাইনেই সব থাকে।

হ্যাঁ কি পরিমাণ ক্ষতি হবে (রামপালে) তা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন, তর্ক করতে পারেন। কিন্তু কথা হচ্ছে যে, যে ক্ষতি হবে তা ইররিভার্সেভল হবার সম্ভাবনাই বেশী। তা হলে কেন ঝুঁকি নেওয়া? সামান্য সম্ভাবনা থাকলেই তা নেওয়া উচিৎ নয়। পৃথিবীতে সুন্দরবন একটাই। বর্তমানে মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে সুন্দরবনকে যেভাবে ব্যবহার করছে, তা নিয়েই ভাবনা আছে। অনেক আগেই ভাবা উচিৎ ছিল। সেদিকে বরং কিছু করেন। উল্টো আরো ক্ষতির কারণ কেন হবেন? রামপালে না করে অন্য জায়গায় করুন।

লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৬৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.