‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’

Mayer kachhe jaiউইমেন চ্যাপ্টার: এবছর ঈদ আর পুজা মিলিয়ে বেশ লম্বা ছুটিতে পড়েছে দেশ। ঢাকার মানুষেরা ছুটছে শেকড়ের সন্ধানে, কেউ ট্রেনে, কেউ বাসে, কেউ বা গাড়ি ভাড়া করে, কেউ নিজের গাড়িতে। সবারই গন্তব্য এক, আপন ঠিকানা, আপন নিবাস, মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন। পুজা-পার্বনে সবাই এক হতে পারার আনন্দই আলাদা। জায়গা নেই কোথাও, না ট্রেনে, না বাসে। তারপরও জীবনে ঝুঁকি নিয়ে সবাই রওনা হয়েছেন। চার ঘন্টার রাস্তা পাড়ি দিচ্ছেন ১৮ ঘন্টায়। সাথে নেওয়া খাবার শেষ, নারী-শিশুর প্রাণ ওষ্ঠাগত, তবুও নাড়ীর টান, যেতেই হবে।

ঈদ বা পুজায় বাড়ি যাওয়া বা না যাওয়া মানুষ মোটামুটি তিন ধরনের হয়। একটা পক্ষ, যারা পথের দু:সহ যন্ত্রণা জেনেও রওনা হন, একসময় ঠিকই পৌঁছে যান গন্তব্যে, পেছনে ফেলে যান ক্লান্তি-অবসাদ। দ্বিতীয় পক্ষ, যারা যান না যান্ত্রিক এই শহরটি ছেড়ে, নানা কাজের ব্যস্ততায় ফুরসৎটুকু নাই মিলতে পারে সবার, হয়তো তারা পরে যাবেন, তারা উপভোগ করেন ফাঁকা ঢাকায় চলার আনন্দ।

তৃতীয় আরেকটি পক্ষ থেকে, যাদের আসলে কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। না বাড়ি, না স্বজন, না মা, না বাবা। কোথাও কেউ নেই। কেউ নেই বলার, ‘ছুটিতে বাড়ি আসিস কিন্তু, কতদিন দেখি না চাঁদপানা মুখখানা’। অথচ এই কথাটি শোনার জন্য তারা জীবনভর প্রতীক্ষায় থাকেন। নাড়ীর টান এখানে উপেক্ষিত। আছে শুধু বঞ্চনা আর একরাশ যন্ত্রণার দীর্ঘ ইতিহাস। তবুও তারা খুশি থাকে ঘনিষ্ঠজনের হাসিমুখ দেখে, তাদের গল্প শোনে।

এবারও ঢাকা থেকে বেরুবার সবগুলো রাস্তাই প্রায় ঠাসা, গাড়ি নড়ছে না। এরই মাঝে একটি গাড়ি ছুটে চলেছে কুষ্টিয়ার দিকে। তাতে দুই পরিচিত জন, বন্ধু-স্বজন, ছোট ভাই-বড় ভাই। যাচ্ছে মায়ের কাছে। গাড়ির পিছনে লেখা ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’। অভিনব, দারুণ আইডিয়া। আমি নিশ্চিত, রাস্তায় যারই চোখ পড়বে এই লেখায়, তারই মনটা দুলে উঠবে, নাড়া দেবেই দেবে। চোখ আটকে যায় তিনটি শব্দে, অজান্তেই গাল বেয়ে নেমে আসে কয়েক ফোঁটা জল, এ আনন্দের, নাকি কষ্টের, বুঝা যায় না। মন থমকে যায় শব্দ তিনটি শব্দের গূঢ়ভাবে।

‘মায়ের কাছে যাচ্ছি, মায়ের কাছে যাবো, মায়ের কাছে যেতে চাই’। তিনটি বাক্য লিখতে গিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, মনটা ভারী হয়ে আসে। কতদিন যাওয়া হয় না মায়ের কাছে, কতদিন দেখা হয় না মায়ের মুখ, সেই পান খাওয়া দাঁতের হাসিমাখা মুখখানি, কতদিন শোনা হয় না মায়ের কণ্ঠ।

গাড়িতে এই স্টিকার লাগিয়ে যাচ্ছে আমাদেরই দুই সাংবাদিক ভাই বোরহানুল হক সম্রাট আর রেজোয়ান হক রাজা ভাই। পথে যেতে যেতে সম্রাট তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দিচ্ছে গাড়িটার ছবি আর লিখছে, মাত্র তো আর কয়েক ঘন্টা বা পদ্মা পেরুলেই মায়ের মুখ, মা, তোমার কাছে আসছি, আর কিছুক্ষণ। আর কিছু সময় পরই ছেলেরা পাবে মায়ের উষ্ণ সান্নিধ্য। বুকের ভেতরটা চিন চিন করে উঠে ওর এই কথায়। প্রতিটি শব্দ বড় বেশি বাজে।

তাদের এই যাত্রা নির্বিঘ্ন হোক, শান্তি পাক মায়ের আত্মা ছেলেদের কাছে পেয়ে। আমাদের যাদের যাওয়া হয় না কোথাও, তারাও শরীক হই তাদেরই আনন্দে। সবার যাত্রা শান্তিপূর্ণ হোক, উৎসব হয়ে উঠুক সত্যিকারের প্রাণের উৎসব।

শুভ বিজয়া এবং ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা সবাইকে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.