ইলা মিত্রের প্রয়ান দিবস আজ

Ila Mitraউইমেন চ্যাপ্টার: ইলা মিত্র-একটি ইতিহাসের নাম…একটি সংগ্রামের নাম। আজ ১৩ অক্টোবর নাচোলের রানী মা’র ১১ তম মহাপ্রয়ান দিবস। ২০০২ সালের এইদিনে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতাতেই জন্ম নিয়েছিলেন এই নেত্রী।

দুই বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তী নেত্রী ইলা মিত্র তৃণমূল পর্যায়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। আর এর মাশুলও তাঁকে দিতে হয়েছিল অত্যন্ত নৃশংসভাবে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সালে রাজশাহী, মালদাহ, চন্ডী রামপুর অঞ্চলের কৃষকদের নিয়ে তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ইতিহাসের পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি।

তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন বাগোতিয়া’র, যার বর্তমান নাম বাংলাদেশের ঝিনাইদহ। তাঁর বাবা নগেন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন বাংলার একাউন্টেট জেনারেল। কলকাতার বেথুন কলেজে পড়ার সময় থেকে ইলা মিত্র জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির সাথে। ১৯৪২ সালে তিনি আইএ পাশ করেন এবং ১৯৪৪ সালে বিএ অনার্স। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট শিক্ষার্থী হিসেবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এমএ করেন আরও অনেক পরের দিকে ১৯৫৭ সালে। তিনি কলকাতা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এবং সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন।

১৯৪৫ সালে ইলা মিত্রের বিয়ে হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের জমিদার পরিবারের ছেলে রমেন্দ্র মিত্রের সাথে এবং তিনিও কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। স্বামী সাথে শ্বশুরবাড়িতে এসে ইলা মিত্র নিজেদেরই প্রতিষ্ঠিত একটি বালিকা বিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষক নিযুক্ত হন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ভূমি রাজস্ব কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং নেতৃত্ব দেন। এছাড়া তিনি নাচোল বিদ্রোহ এবং সাঁওতাল বিদ্রোহ সংগঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। সময়টা ছিল ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত।

১৯৪৬ সালে ইলা মিত্র এবং অন্যান্য স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা প্রতিহত করতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেসময় মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালী সফরে এলে ইলা মিত্র দাঙ্গা-বিধ্বস্ত গ্রাম হাসনাবাদে যান।

১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি নাচোলে কৃষক এবং পুলিশের সংঘর্ষের জের ধরে সেখানে প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র পুলিশ পাঠানো হয়। কিন্তু শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে তাদের পাঠানো হলেও তারা বেশ কয়েকটি গ্রাম পুড়িয়ে দেয় এবং বহু গ্রামবাসীকে হত্যা করে। তারা ইলা মিত্রকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। তাঁকে ২১ জানুয়ারি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। ইলা মিত্রকে তখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে তৎকালীন সরকার।

কিন্তু কারাগারে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন ইলা মিত্র এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে কলকাতায় পাঠায় চিকিত্সার জন্য। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি আর দেশে ফেরেননি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন আন্দোলন-তত্পরতায় সক্রিয় হয়ে উঠেন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত চার বার তিনি বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারতে জনমত গড়ে তুলতে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইলা মিত্র।

রাজনীতির পাশাপাশি ইলা মিত্র সাহিত্যের অনুরাগীও ছিলেন। তাঁর অনুবাদের কাজের জন্য ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু’ সম্মানে ভূষিত করা হয় তাঁকে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে ‘তাম্রপত্র’ পুরস্কার দেয়।

উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে বিপ্লবী এই মহান নেত্রীকে স্যালুট। তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.