শকুন!

Konkalতানিয়া মোর্শেদ: বেশ কিছুদিন ধরে একটি ছবি মনের মাঝে, মাথার মধ্যে ঘুরে ঘুরে আসছে! বেশ কয়েক বৎসর আগে দেখা বিখ্যাত ছবিটি। ফটোগ্রাফারের নাম জানা না থাকায় আজকে গুগলে “ফেইমাস পিকচার” টাইপ করতেই লিঙ্ক চলে আসলো! লিখতে হয়নি “অব চাইল্ড অ্যান্ড ভালচার” শব্দগুলো। ফটোগ্রাফারের নাম কেভিন কার্টার। ১৯৯৩-এ সুদানের দূর্ভিক্ষের সময় তোলা। একটি কংকালসার চলৎশক্তিহীন শিশু আর অনতি দূরে একটি শকুন! ছবিটি দেখবার পর মাথা খারাপ ছিল! কখনোই ভুলবার মত নয়!

যেমন নয় ভুলবার ১৯৭১-এর ছবিগুলো, বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইহুদী নির্যাতনের, হত্যার ছবি! আরও অনেক অনেক ছবি! প্রতিদিনই ছবির সংখ্যা বাড়ছে! কবে থামবে দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, হত্যা, মৃতদেহ, অন্যায়, অত্যাচারের ছবি? আজ ফেসবুকে একটি ছবি এক ঝলকের জন্য দেখা হয়েছে! পোড়া কংকাল! আগুনে পোড়া গার্মেন্টস শ্রমিকের! আর কত?

আরেকটি ছবি কিছুদিন ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে! অনাহার ক্লিষ্ট, ক্ষত বিক্ষত দশ বৎসরের একটি মেয়ে! আদুরী! দূর্ভিক্ষের ছবিটির শকুনটি প্রাকৃতিক নিয়মেই এসেছে, যদিও তা অসহ্য! বাচ্চাটিকে শকুনটি হয়ত মৃত ভেবেছে! যেমন ভেবেছিল নদী নামের ঢাকা শহরের নারীটি, আদুরীকে! কে বেশী নিকৃষ্ট! শকুনটি না নদী!? শকুনদের সংখ্যা অনেক জায়গায় আগের থেকে কমছে। যদিও পরিবেশের ভারসাম্যের জন্যই তাদের প্রয়োজন, তবে তা ছবিটির মত ঘটনার জন্য নয়। আর নদীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে! গৃহকর্মী বাংলাদেশ সহ কিছু দেশে এখনো চালু আছে। দাসপ্রথা “দাসপ্রথা’ নামে আর চালু নেই। কিন্তু অনেক জায়গাতেই গৃহকর্মীদের দাসের মতই ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে এখনো গৃহকর্মীদের কাজের সময়ের হিসাব রাখা হয় না, নুন্যতম বেতনও নির্দিষ্ট নয়। (ব্যতিক্রম নিয়ে কথা হচ্ছে না)।

ছোট্টবেলা থেকেই অধিকাংশ শিশুই গৃহকর্মীদের নীচু স্তরের মানুষ হিসাবে দেখা শেখে, বাড়ীর বড়দের কাছ থেকেই। বয়সে অনেক বড়কেও তুমি বলাই স্বাভাবিক! তুইও চলে। আর ব্যবহার দিয়েই বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে গৃহকর্মী মানে কী! অনেক বাড়ীতে আবার মৌখিক খারাপ ব্যবহার থেকে শারিরীক আঘাত করাও “স্বাভাবিক” হয়! একবারো মনে হয় না যে, ওরা যেমন দু’ মুঠো খাবারের জন্য আসে, আমাদেরও ওদের না হলে চলে না! চলে কি?

কোনো কোনো নামীদামী মানুষ বলে থাকন যে, দেশ কী, দেশপ্রেম কী তা বুঝবার জন্য প্রবাসে কিছুদিন থাকা প্রয়োজন। আমি যোগ করি, মানুষের মর্যাদা, কর্মের মর্যাদা শিখবার জন্য প্রতিটা বাংলাদেশীর (মধ্যবিত্ত কী উচ্চবিত্ত) কিছুদিন প্রবাসী হওয়া প্রয়োজন। প্রবাসী হলে রান্না থেকে শুরু করে বাথরুম পরিষ্কার সবই করতে হয়। বাড়ীর প্রতিটা কাজ, বাইরের প্রতিটা কাজ সব সব কিছুই করতে হয়। সন্তান লালন পালনও একা (বর বা স্ত্রী বাদে আর কেউ কাছে না থাকলে এরাই সব) করতে হয়। ছোট্ট বাচ্চার মা (ক্ষেত্র বিশেষে বাবা) কতদিন সময়মত বাথরুমে পর্যন্ত যেতে পারেন না! আর কেউ অসুস্থ হলে কি ঘটে তা জানি আমি আর আমার বাড়ীর মানুষ! বাংলাদেশের মানুষের জীবনের চ্যালেঞ্জ এক ধরণের, প্রবাসীদের এক ধরনের।

কারোটাই তুলনা করবার মত নয়। কিন্তু দেশে বাস করা মানুষদের কিছু শেখবার, চিন্তা করবার আছে। অনেক মানুষ এখনো নিজের অফিসের কাজ বা পড়ালেখা বাদে আর কিছুই না করে জীবন পার করছেন। এখনো পানি চেয়ে পান করেন অন্যের কাছে থেকে! প্রবাসে হাজার অসুস্থ হলেও পানি তো পানি অনেক সময় শরীর অনেক খারাপ হলেও অনেক কিছুই করতে হয় যা বাংলাদেশ বাস করা অনেকে কল্পনাই করতে পারবেন না! আর যারা এদেশে অফিসের ক্লিনার কি বাসায় ক্লিন করে দিয়ে যাবেন তাদের সাথে অফিসের কলিগের মতই ব্যবহার করতে হবে। বাড়ীর কিছু নষ্ট হলে সারাবার জন্য যে মানুষকে ডাকা হবে তার সাথে কলিগের মতই ব্যবহার করতে হবে। পেশা দিয়ে নয় পরিচয়। মানুষকে মানুষ ভাবতে হবে। কর্মের মর্যাদা দিতে হবে। এদেশে একজন প্লাম্বার, ইলেক্ট্রীক টেকনিশিয়ান, গার্ডেনার, মটর মেকানিক এবং আরো অনেক পেশের মানুষের চাহিদা কত! আর খরচ! অনেকেই অনেক বাড়তি দক্ষতা প্রয়োজনেই অর্জন করেন। আর যে কোনো সময় ডাকলেই চলে আসবে? ভোর সকালে বা মাঝ রাতে! এত সহজ নয়! বাড়ীতে কাজের জন্য মেইড রাখবেন, সময় বাঁধা। নূন্যতম মজুরী তো অবশ্যই। আর ব্যবহার? ঐ যে কলিগের মত!

আকাশ সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশে বাস করে অনেকে অনেক কিছুই চাইলে এদেশের কারো আগেই জেনে যান, শিখে যান। এবার কি দয়া করে শ্রমের মর্যাদা, মানুষের মর্যাদা শেখায় মন দেবেন! নিজে না শিখলে সন্তানদের কি ভাবে শেখানো হবে! আর কতকাল নদীরা শকুনদের মত আচরণ করবে??

বাংলাদেশে গৃহকর্মীরা নিমিষেই বুঝে যায় কোন মানুষটা প্রবাসী আর কোন মানুষটা নয়! ব্যক্তিগত অনেক অনেক অভিংগতা আছে যা শেয়ার করলে মানুষ ভাবতে পারেন যে, ঢাক পিটাচ্ছে! এটুকু বলি, প্রবাসীদের অনেকের কাছেই শুনেছি যে, বাচ্চারা দেশে যেয়ে যেমন আহত হয় রাস্তার ভিক্ষুক দেখে তেমনই আহত হয় গৃহকর্মীদের সাথে আচরণ দেখে!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.