নারী নির্যাতনের দর্শন, বিপন্ন পৌরুষ

nirসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাতকার পড়ছিলাম পরমা পত্রিকায়। সুনীলের সাথে তার জীবনের নানা সময়ের স্মৃতিচারণ করছিলেন। বলছিলেন সুনীলের সাথে তার সম্পর্ক কিভাবে হলো, তা নিয়ে।

বিয়ের আগে থেকেই সুনীলের সাথে তার উঠাবসা। এখানে-সেখানে যাওয়া। সেকথাই তিনি বলছিলেন। বললেন সুনীল একদিন তাকে বলেছিলেন, “স্বাতী, তুমি এতো বোকা, এইভাবে আমার কাছে চলে এলে, আমার সঙ্গে থাকছ, সব জায়গায় যাচ্ছ… আমি যদি বাজে লোক হতাম, তোমার কী হতো বলতো?”

স্বাতী উত্তরে বলেছিলেন, “যে পরিবারে আমি জন্মেছি, যেভাবে বড় হয়েছি মানুষকে আমরা কখনো খারাপ ভাবতে শিখিনি”।

এই যে, মানুষকে খারাপ ভাবতে না শেখা, নিজে খারাপ কাজের সাথে না থাকা তার একটা বড় শিক্ষা আসে পরিবার থেকে। বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় ইডেন কলেজের যে মেয়েটিকে প্রথমে ছুরিকাঘাত, পরে এসিডে ঝলসে দেয়া হয়েছে, সেই মেয়েটিও হয়তো কোনদিন মানুষকে খারাপ ভাবতে শেখেনি। কিন্তু মানুষের ভয়াবহ রুপটি সে দেখলো। এমন একজন এই কাজটি করেছে, যাকে সে চিনতো। দু’একটা কথাও বলেছে। কিন্তু কোনদিন কি ভাবতে পেরেছে, যে মানুষটি তাকে বিয়ে করতে চায়, সেই মানুষটিই তাকে এমনভাবে ঝলসে দিতে পারে?

সেই ছেলে কোন পরিবার থেকে এসেছে? পরিবার এমন ছেলেদের কেমন শিক্ষা দেয়? কিংবা পরিবার খোঁজ রাখে কেমনভাবে বেড়ে উঠছে তারা?

যারা ধর্ষণ করে, যারা এসিড ছুঁড়ে মারে, তাদের মনস্তত্ব কেমন হয়? এক কথায় খুব ভয়ংকর মানসিকতার। অন্যথায় এমনটা কেউ করতে পারেনা। এরা খুবই হিংসায় ভুগে। মনস্তত্ববিদরা বলেন, যেসব মানুষ, অন্য কারো প্রতি সংবেদনশীল থাকে না, তারাই ধর্ষণ করে, নারী নির্যাতন করে, হত্যা, সন্ত্রাস করে।

ব্যক্তি-পুরুষ যখন হিংস্র হয় তখন সে ভয়ংকর। হিংস্রতার এই কারণ কি বিপন্ন পৌরুষ? হয়তো বা তাই। অনেক পুরুষ আছে যারা ধর্ষণে সায় না দিলেও, মেয়েরা বেশি আধুনিক হয়ে উঠলে ধর্ষণ যে হতে পারে সেই চিন্তায় মানসিক সমর্থন দেয়। এবং দুর্ভাগ্য এই যে, সমাজটা এমনই।

দিল্লির গণধর্ষণের ঘটনার পর সেখানকার মানুষ বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা যেভাবে লাগাতার আন্দোলন করলো, এখনো করছে, তা খুবই বিরল। রাজধানীতে ধর্ষণ করে চিকিৎসক হত্যা, টাঙ্গাইলের গণধর্ষণের ঘটনা, রংপুরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা খুবই মর্মস্পর্শী। কিন্তু এমন একটি লাগাতার প্রতিবাদ আমরা করতে পারিনি।

একটা বিষয় খুবই পরিষ্কার যে, আমাদের নাগরিক সমাজ সামাজিক ঘটনাবলী সম্পর্কে বড় উদাসীন। টাঙ্গাইলের ঘটনার পর দু’একটি প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। দাবি উঠেছে ধর্ষণকারীর দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির।

ইডেনের ছাত্রীটির বেলায়ও তাই। দাবি একই। ন্যায়বিচার। কিন্তু সেই ন্যায়, সেই বিচার করার দায়িত্ব যে ব্যবস্থার উপরে তার উপর মানুষের আস্থা কমে গিয়েছে সেই কবে। এই ব্যবস্থাকে যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা ক্ষমতাধর। তাদের দখলে রাজনীতি, প্রশাসন এবং অর্থ। এবং এদের কারণে জনসমষ্টি শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদটাও ঠিকমতো করতে পারেনা।

পরিবর্তন দরকার সংস্কৃতিতে। যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের এখানে চর্চা হয়, তাতো কেবল সম্পদ আর অর্থ দখলের জন্য। রাজনীতি যদি হৃদয়বান, অনুভূতিপ্রবণ মানুষের হাতে না যায়, হিংস্র পৌরুষের ধারণা থেকে পুরুষকে বের করে আনা সম্ভব হবে না। রাস্তাঘাটে, বাসে, গাড়িতে এমনকি বাড়িতে নারী ধর্ষণ, নির্যাতন রোধ করাও সম্ভব হবে না।

[divider]

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাreza

পরিচালক (বার্তা), একাত্তর টেলিভিশন

[email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.