রোজ নামচা

Leena Haq
লীনা হক

লীনা হক: আমাকে ঘরের কাজে সাহায্য করে মেয়েটি তার নাম সাহেরা । তার বয়স ২৫-২৬ হবে। ছিপছিপে শ্যামলা মেয়েটি বড় সরল । রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ী ইউনিয়নে তার বাড়ী । ঢাকায় থাকে স্বামীর সাথে করাইল বস্তিতে । স্বামী রিকশা চালায় । আমার বাসা ছাড়াও সাহেরা আরো একটি বাসায় কাজ করে । দুটি মেয়ে তার । বড়টির বয়স ১২ হবে, সাহেরার মায়ের কাছে গ্রামে থাকে – স্কুলে যায় । পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে । ছোট মেয়েটি তার সাথে থাকে, বস্তিতে ব্র্যাকের স্কুলে পড়ে প্রথম শ্রেণীতে । দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠলে এই মেয়েটিকেও সে গ্রামে পাঠিয়ে দিবে, বস্তির পরিবেশ ভালো না । সাহেরা মেয়ের পড়ালেখা আর খাওয়া ও অন্যান্য খরচ বাবদ গ্রামে টাকা পাঠায় । স্বপ্ন দেখে মেয়েগুলিকে অনেকদূর সে পড়াবে , ছোট বেলায় বিয়ে দিবে না যেমন তার হয়েছিল বিয়ে ১২ বছর বয়সে ।

তার স্বামীকে সে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল বুঝিয়ে বলার জন্য যেন ‘ছেলে ‘ সন্তানের জন্য সাহেরাকে জোর করে আবার গর্ভধারণ না করায় , ছেলে মেয়ের মধ্যে কোনো তফাত নাই তা বুঝিয়ে বলার জন্য । আমি বলেছি সাহেরার স্বামীকে, কথা সে আমার মন দিয়েই শুনলো , কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতদিন মানবে সেটাই দেখার বিষয় । তবে এসবের মধ্যেও সাহেরা স্বপ্ন দেখে, মেয়েদেরকে নিয়ে স্বপ্নের কথা বলতে বলতে সাহেরার চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সাহেরাকে একটি একাউন্ট খুলে দিয়েছি – অল্প করে নিয়মিত টাকা জমায় সে – স্বামীর অগোচরে । পাস বই রাখে আমার কাছে । ঠিক কি বেঠিক হয়েছে ব্যাপারটি বুঝতে পারি না তবে একটু হলেও মনে হয় সাহেরার এই স্বপ্ন পূরণের প্রক্রিয়ায় সামান্য ভূমিকা আমারও আছে । আমি যেন সাহেরার বেঁচে থাকার আনন্দের উত্সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাই ।

তো প্রতিদিন সকালে ৭ টার দিকে এসে তার প্রথম কাজ চা বানানো – দুই কাপ চা সে বানায় , আমার টা দুধ চিনি ছাড়া আর তার জন্য দুধ চিনিতে পরিপূর্ণ। আমার রুম লাগোয়া বারান্দার দিকের বিশাল ফ্রেন্চ দরজা খুলে দিয়ে আমি আর সাহেরা টোস্ট বিস্কুট ডুবিয়ে চা পান করি । আমি বারান্দায় একটা বেতের মোড়ায় বসি আমার গাছেদের পাশে আর সাহেরা দরজার উপরে পা মেলে বসে । অনেক বলার পরেও সে মোড়া বা টুলে বসে না । মিনিট দশেকের এই প্রভাতী চা পানের অধিবেশনটি আমার ভাড়াটে বাড়ীর জীবনে নুতন মাত্রা যোগ করেছে । জগত সংসারের যাবতীয় আলাপ আমরা করে ফেলি এই সময়ে – আজকে কি রান্না হবে, কাপড় কাচবে কিনা, তার স্বামী গত এক সপ্তাহের মধ্যে আর গায়ে হাত তুলে নাই, একটা শো কেসের তার বড় শখ – কাঁচের জিনিসপত্র রাখবে, আমি এবার যেন নেপাল থেকে তার জন্য একটা রানী কালারের শাল আনি ইত্যাদি অতন্ত্য পারিবারিক বিষয় থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি যেমন ভোট হবে কিনা, ভোটে কে জিততে পারে, হাজার হলেও ‘অংপুরের ‘ বেটা – এক সময়ের ‘পিসিডেন ( প্রেসিডেন্ট )’ হোমো এরশাদকেই ভোট টি তারা দেবে , যদিও সাহেরার বড় ইচ্ছা একবার সে ভোটটা কোনো একজন নারী নেতা কে দেয়; কেমন ফকফকা সোন্দর বেটিছাওয়া খান ‘ , কিন্তু সেত আর স্বামীর আদেশের বাইরে যেতে পারে না, স্বামী আবার এলাকার হুজুরের হুকুম ছাড়া ভোট দেবে না !

তো আজকের অধিবেশনের বিস্কুট শেষ হয়, চা ও তলানিতে, শেষ চুমুক দিয়ে উঠে কাপ পিরিচ গুছিয়ে তুলতে তুলতে সাহেরা আচমকা মন্তব্য করে -‘ আফা, জীবনটা এমা করিই কাটি দেবেন তোমরা ?’ ‘ জীবনটা এমন করেই কাটিয়ে দেবে ? তার প্রায় দার্শনিক বক্তব্য বুঝে নিয়ে বলি , ‘ ভালই তো আছি অনেকের চেয়ে, কি বল তুমি ‘ সাহেরা মাথা ঝাঁকায় ‘ কতা খান তোমার ঠিকই আছে আফা, মুই তো সগায়গুলাক (সবাইকে) কই মোর ম্যাডাম পাঁচ জনা পুরুষ পোলার সমান ‘ মুহুর্তের জন্য নিজেকে পাঁচ জন মধ্যবয়সী পুরুষের অবয়বে চিন্তা করে কেমন যেন বেকুব লাগে ! এর এরমধ্যেই সাহেরার মন্তব্য ‘ তবে হাজার হলিও জীবনে পুরুষ মাইনষের দরকার আছে – এই যেমন তোমার বাজার সদাই করা কত কষ্ট ! জ্বরে পড়লে ওষুধপাতি আনা নাগে !’ জীবনে পুরুষের উপস্থিতির ব্যাপক প্রয়োজনীয়তার এই গভীর বিশ্লেষণে কথা হারিয়ে যায় আমার ! আমি আর কোনো তর্কে যাই না !

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.