নারী আন্দোলন, নারী উন্নয়ন সবই ব্যবসা

সুপ্রীতি ধর:

‘নারী আন্দোলন, নারীবাদ বা নারী উন্নয়ন যাই বলেন না কেন, এসবই হলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নারীদের জন্য এরা কিছুই করে না। আর ওই যে কীসব সংস্থা আছে না, মানবাধিকার না কী যেন, ওরা তো অসহায় মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করছে, নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। এতো বছর পর দেশে ফিরলাম, এখনও নারীরা এসে নানান অভিযোগ করে’।

কথাগুলো বলছিলেন একসময়ের দাপুটে ভাস্কর শামীম সিকদার। দাপট তার এখনও আছে, চোখে-মুখে-আচরণে-কাজের নিষ্ঠায় দাপুটে ভাব ষোলআনা।

ষাট আর সত্তরের দশকের সেই নারী, যিনি ঢাকার রাস্তায় বেপরোয়া সাইকেল চালাতেন, পরনে থাকতো প্যান্ট-শার্ট, আর কোমরে অস্ত্র, হিতে-বিপরীত হলেই যিনি একের পর এক ধরাশায়ী করতেন যেমন রাস্তার মাস্তানদের, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও, সেই তিনি শামীম সিকদার। সেদিনের মারকুটে মেয়েটি আজ পূর্ণাঙ্গ নারী, বয়সে টান পড়েছে ঠিকই, কিন্তু দুদণ্ড বসার মানুষ নন তিনি। কাজ করেই চলেছেন।

ইস্কাটনে তাঁর বাসায় যখন পৌঁছাই, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। গেট থেকে একটু ভিতরেই সারি সারি আবক্ষ ভাস্কর, বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে অনেকের। আলো-আঁধারিতে তা ঠাহর করা গেল না। অসংখ্য গাছ-পাখ-পাখালিতে ভরে আছে পুরো জায়গাটি। গ্যারেজের মতো একটি জায়গায় টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরনে, চুলগুলোতে মুখে ঢেকে আছে, বুঝতে অসুবিধা হয় না, ইনিই তিনি। এঁর কাছেই আমাদের আগমন। আমার আর বন্ধু নাহিদ সুলতানার সাথে চলচ্চিত্র পরিচালক শামীম আখতারও আছেন। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দুই শামীমকে মুখোমুখি করানোর।

samim sikdar (1)কিন্তু কিসের কী! এই পাগলাটে ভাস্করের সাথে তাল মেলানোই দু:সাধ্য রীতিমতো। রবীন্দ্রনাথ বানাচ্ছেন, ওপরে সুতোয় ঝুলে আছে মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, বিদ্রোহী কবি নজরুল, নেলসন ম্যান্ডেলাসহ আরও কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, সামনের দিনগুলোতে এঁদের ভাস্কর্যও তৈরি করবেন শামীম। আমাদের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তাঁর, একটা সোফা দেখিয়ে বললেন, বসেন, ভাঙাচোরা আছে, দেইখ্যা নিয়েন। শামীম (আখতার) আপাকে বসতে দিলাম, একটা প্লাস্টিকের মোড়া পেয়ে তা টেনে নিলাম আমি, আর নাহিদের জন্য বাগান থেকে উদ্ধার করা একটা চেয়ার বন্দোবস্ত হলো। ভাস্কর শামীমও বসলেন এক কোণায়।

জিজ্ঞাসা করলাম, আপা কি এখন বিখ্যাত লোকজনের ভাস্কর্য বানাচ্ছেন? উত্তর নেই।

তারপর মৃদু হেসে বললেন, হমম, বানাই আর কী!

এরপর কথা আর এগোয় না, কোন কথা যে জিজ্ঞ্যেস করবো, বুঝে উঠতে পারি না। সময় নিই তাঁকে বুঝতে। তিনি সিগারেট ধরান। চুলগুলো সরান কপালের ওপর থেকে। মুখে মৃদু হাসি দেখে মনে মনে বল পাই। এবার তাহলে কথা হবে।

শামীম (আখতার) আপাই বলেন, আপা, আপনি কি সেসময়কার কথা কিছু শোনাবেন আমাদের?

উদাস দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক তাকিয়ে বললেন, শুনবেন আপনারা? কী শুনবেন? কোন কথাটা বলুম? সে তো অনেক কাহিনী।

তিনি তখন বললেন,

“সেই পাকিস্তান পিরিয়ড থেকে সাইকেল চালাই, জুডো-কারাত শিখি, মারপিট করি এখানে-সেখানে, সবাই আমাকে তখন ‘শামীম ভাই’ বলতো। ঊনসত্তরের আন্দোলন, পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলাম। যুদ্ধের পরপরই রাজশাহীর সরদহ ক্যাডেট কলেজের এক শিক্ষকের স্ত্রী খুকুর (শিক্ষক নিহত হন যুদ্ধে) ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছেলেপিলেরাই তখন তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। খুকুর তিন বাচ্চা তখন পাবনায় শাশুড়ির কাছে। মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়েছে ক্যাম্পাসে। তখন ডাক পড়ে আমার। ঢাকা থেকে ওখানে পৌঁছানোর পর ব্যারিকেড দিল ছাত্ররা। একজনকে এমনভাবে পিটাইলাম যে, ওরা পিছু হটলো। খুকুকে উদ্ধার করে নিয়ে যাই রংপুরে। কিন্তু সে আমার সাথে ঢাকায় আসতে চায়। নিয়ে আসি সাথে করে, বাচ্চাদের রেখে আসি খুকুর মায়ের কাছে। এনে ঢাকায় একটি হোস্টেলে তুলি। বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলে তার টাকার ব্যবস্থা করি। বঙ্গবন্ধু খুকুকে ২০ হাজার টাকা দেন। খুকুর অনুরোধে সেই টাকা নিয়ে কিছু কাপড়চোপড় কিনতে নিয়ে যাই। সেখানে নেমে আসে আরও বিপদ। কিছু ছেলে পিছু নেয়। খুকুকে একটা দোকানে নিরাপদে রেখে একাই মোকাবিলা করি। রাতে হোস্টেলে ফেরার পর প্রভোস্ট বিচার নিয়ে আসেন, ‘এই শামীম, তুমি বেটাছেলেদের সাথে মারামারি করো?’ আমি বলি, ‘আপনি তো মাইর খাইয়া আসেন, আমি দিয়া আইছি। আপনি নারী সমাজের কলংক’।

একটু দম নিয়ে শামীম সিকদার বলেন, নারী বলেই অত্যাচার করবে তার ওপর এইটা তো হইতে পারে না। আমিই তো পথ দেখাইলাম, সাইকেল চালাও, পোশাক বদলাও।

samim sikdar (3)ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত ছিলেন ভাস্কর শামীম। বাসায় এ নিয়ে ব্যাপক মারধর করা হতো তাকে, তাই বাসায় খুব কম সময়ই থাকা হতো বলে জানান। বিশেষ করে পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগিতাই পরিবারের সবার অসন্তোষের কারণ ছিল। লেখাপড়ার বদলে উনি ছবি আঁকতেন, মাটি দিয়ে নানান জিনিস বানাতেন। ছয় ভাই-দুই বোনের অন্য সবাই তখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। আর তিনি ঘরে-স্কুলে মার খাচ্ছেন। ফলে স্কুল পালানোও নৈমিত্তিক হয়ে যায়।

একাত্তরের কথা বলেন। “২৫শে মার্চ রাতের ভয়াবহতার পর সকালবেলা চারুকলা থেকে প্রথম মিছিলটা বের করি আমরাই। এরপর সাইকেল নিয়ে বের হই পরিচিত জনদের সতর্ক করতে। চোখের সামনেই ওইদিন বিকেল বেলা ফার্মগেটে বিহারীরা হামলা চালায়। আমি তখন সাইকেল নিয়ে দ্রুত নিউমার্কেটে এসে সাইকেলটা রেখে বাসায় চলে যাই। একাত্তরে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, কিন্তু সব মিটিংয়েই যেতাম। মাওলানা ভাসানীর মিটিংয়ে যেমন গেছি, তেমনি বঙ্গবন্ধুর মিটিংয়েও”।

তবে এও বলেন, মাত্র নয় মাসে দেশে স্বাধীন হয়ে গেছিল বলে বাঙালী মুক্তিযুদ্ধের মর্ম বুঝে নাই। হইতো ভিয়েতনামের মতো যুদ্ধ, টের পাইতো।

একদিনের একটি ঘটনা পাল্টে দেয় পুরো জীবন। সালোয়ার-কামিজ পরেই চারুকলায় আসতাম। একদিন কয়েকটা ছেলে হোন্ডা দিয়ে এসে টেনে নিয়ে যায় ওড়না। সেই রাতেই তিনি প্যান্ট-শার্ট বানিয়ে পরা শুরু করেন। শামীম সিকদারের ভাষায়, ‘ওড়না হইল মরণফাঁদ’। বন্ধুরা তখন বিমুখ হলেও ‘আমি তো ড্যামকেয়ার’।

কথা বলছেন আমাদের সাথে আর রবীন্দ্রনাথের ওপর একের পর এক প্রলেপ দিচ্ছেন। বলে উঠেন, ‘আমার অত সময় নাই কথা বলার। দেখেন না কাজ করতেছি’।

আমরা হেসে উঠি, আমাদের ফিরিয়েও দেন না তিনি। কাজ করতে করতেই ছবি তোলার অনুরোধ রাখেন, মাপ মতোন হাসি দেন। এও বলেন, এই ছবিটা ভাল হবে।

কাজ করছেন, আর সমানে গালি-গালাজ করছেন তার সহযোগী দুইটা ছেলেকে। ওদের মুখ দেখে মনে হলো, এতে অভ্যস্ত তারা। যেন কিছুই বলছেন না। পুরুষ জাতিকে গালি দিয়ে চলেছেন ওদের অকর্মণ্যতায়।

বলেন, ‘পুরুষরা দুর্বল হয়ে গেছে, এনার্জি নাই কোনো, কাজ করে খা, ঘুমাইয়া জীবন নষ্ট করিস না’।

হঠাৎই প্রশ্ন করি, আপনি এতোকিছু বানান, দুর্গা প্রতিমা বানান নাই কখনও?

না, দুর্গারে তো ফেলে দেওয়া হয় জলে। তবে মহাদেবরে বানাইছি।

বললাম, আপনি মহাদেবরে বানালেন কেন? সে তো পুরুষ!

বাচ্চাদের মতোন হেসে উঠে বলেন, ‘ঠিক আছে, একটা দুর্গা বানাবো, সেখানে মুখটা আমার লাগিয়ে দেবো, আর হাত দেবো ১২টা। দেখেন না, কত হাতে কাজ করি। ১০টা তো সামান্য’।

১২ বছর পর দেশে ফিরলেন। পরিবর্তন হয়েছে কী?
না, তেমন পরিবর্তন নাই। মেয়েদের তো কোন পরিবর্তনই হয় নাই। মেয়েরা এসে দু:খ করে পারসেন্টেজের কথা বলে, কোটার কথা বলে। পারসেন্টেজ কেন হবে? হবে সমান-সমান।

কেমন আছেন আপনি?
-’নিন্দুকেরে আমি বাসি, সবচেয়ে ভাল’- এই যে কাজ করি, কতজন যে হিংসা করে। আমি আমার কাজ করেই যাচ্ছি। মানুষের কথা শোনার ধৈর্য্যও নাই, শুনিও না। আমার নিজের মুভমেন্ট একাই চালাচ্ছি। বেগম রোকেয়া যেমন নারীশিক্ষার আন্দোলন চালিয়েছিলেন একাই, আমিও তেমনি নারীদের সামনে আনার জন্য লড়াই করেছি। কারও সাতে-পাঁচে নাই।

আর প্রেম?
-প্রেম কখন হবে? ভাস্কর্যের প্রেমে পড়েছিলাম, সেই প্রেমেই আছি। নারী-পুরুষের প্রেমে পড়ার মতো সময়ই তো ছিল না। তাছাড়া এতো মারপিট করতাম যে, সবাই ভয় পাইতো। তাই প্রেম হয় নাই। (হাসি)

আপনার জীবনে আদর্শ নারী কে?
-উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এইদেশে মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু, হিংসা করে, উঠতে দেয় না। আর এর সুযোগ নেয় ছেলেরা। বাইরে এমন হয় না। ছেলেরা দেখবেন সহজেই বন্ধু হতে পারে, মেয়েরা পারে না। শেয়ারিংটা নেই এখানে।

ধর্ম-আস্তিক-নাস্তিক নিয়ে দেশে এতোকিছু হচ্ছে, আপনি কি ভেবেছেন এ নিয়ে?
-অত সময় কই ধর্ম নিয়ে ভাবার? কাজের ক্ষতি হবে এসব করতে গেলে। তবে এটা বুঝি যে, মানুষের বিশ্বাসের ওপর আঘাত না করাই ভাল। আমার ভিতরে আছে স্পিরিচ্যুয়ালিটি, এটা নিজেই অর্জন করা সম্ভব মেডিটেশনের মাধ্যমে। আসলে মানুষ হওয়া বড় কঠিন। এজন্য নিজের ইচ্ছা-প্রেরণা থাকতে হবে। চাকরি করবো-বেতন পাবো, এই মানসিকতা থাকলে সত্যিকারের মানুষ হওয়া যাবে না। নিজস্ব সত্ত্বা থাকতে হবে।

২০০১ এ দেশ ছেড়েছিলেন কেন?
-ছাড়বো নাই বা কেন? আমি একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ, এতো ডিস্টার্বের মধ্যে থাকা যায় না। আমি নব্বইয়ের দশকেই বলা শুরু করলাম মোল্লাদের বিষয়গুলো, কেউ কানে নেয়নি। তার ফল তো এখন ফলছে, সবাই দেখছেন আপনারা। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ খুব শান্তিপ্রিয় দেশ। সব ধর্মের মানুষ এখানে একসাথে থাকে, তারা শান্তি চায়, কাজেই মোল্লারা যতই চেষ্টা করুক না কেন, কিছুই করতে পারবে না।

আপনার তো একটা অটোবায়োগ্রাফি আছে। সেটা কি ছাপানো হয়েছে?
-না, ওটা ছাপাতে ২০ লাখ নাকি টাকা লাগবে। এতো টাকা কই আমার? খাওয়ার টাকাই নাই। সব টাকা আমার ভাস্কর্য বানাতেই যায়। এই দেশে শিল্পকলার দাম নেই, কষ্ট করে জীবনটাই টেনে নিয়ে যাচ্ছি। প্রচার চাই না, বরাবরই প্রচারবিমুখ আমি। নিজের মতোন করে কাজ করি, থাকি’। ২৫ বছর চারুকলায় শিক্ষকতা করার পর উনি এখন অবসরে আছেন। কিন্তু কাজ থেমে নেই।

কথা বলতে বলতেই প্লাস্টারের কাজও শেষ হয় রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্যে। অস্থির-চঞ্চলা কিশোরীর মতোন বসছেন-উঠছেন-ভাস্কর্যে হাত লাগাচ্ছেন-হাত ধুচ্ছেন, সিগারেটও চলছে ফাঁকে ফাঁকে। কথা বলছেন, হু-হা উত্তর দিচ্ছেন কখনও কখনও। আমাদের চিন্তা একটাই, এই মানুষকে খেপানো যাবে না, ‘ডিস্টার্ব’ করা যাবে না। বার বার আসতে হবে তাঁর কাছে যদি তাঁকে সত্যিকার অর্থেই বুঝতে চাই।

আমাদের তিন জোড়া মুগ্ধচোখ উনাকে ঘিরে আবর্তিত হয়, অনুভব করার চেষ্টা করি উনার ভিতরের শক্তিটুকুকে। একজন মানুষ, একজন নারী কতটা শক্তির আধার, কী মননে, কী চেতনায়! কতই বা বয়স, বড়জোর ৬১-৬২। এই বয়সেও উনি সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে চলেছেন নিরলস। কতটা শক্তি থাকলেই না উনার মতো করে বলা যায়, ‘খারাপ মানুষের কাছ থেকে যত দূরে থাকবেন, আত্মাটাও শান্তি পাবে’।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.