বাড়তি ঝুল!

0
tania morrshed

তানিয়া মোর্শেদ

তানিয়া মোর্শেদ: বাংলাদেশে কোরবানীর ঈদ নামে পরিচিত ঈদ-উল-আযহা’র শুরুর ঘটনাটা ছোট্টবেলায় জানবার পর মনে প্রশ্ন ছিল, এও কি সম্ভব? ঘটনাটি যে কোন ছোট মানুষের মনে কিন্তু এক ধরণের আতংকও জাগাতে পারে।

এখানে একটি ছেলে সানডে স্কুলে যাবার পর বই-এ যখন কাহিনীটি পড়েছিল, তার মনেও প্রশ্ন ছিল, কি করে বাবা তার সন্তানকে এমন করতে পারে? সে তার বাবাকে প্রশ্ন করে বিপদে ফেলেছিল। সেই বাবা আমাদের (আমাকে ও মিজানকে) তা বলেছিলেন। শুনে আমি শুধু বলেছিলাম যে, এই দেশে এই যুগে এই প্রশ্ন করাই স্বাভাবিক। চল্লিশ+ বৎসর আগে বাংলাদেশে একটি ছোট্ট মেয়ের মনেও এই প্রশ্ন ছিল। মেয়েটির প্রশ্ন করবার অভ্যেস ছোট্টবেলা থেকেই, আজও যায়নি! যাক এ নিয়ে আর কথা না বাড়াই!

সদ্য পাশ করা তথ্য প্রযুক্তি আইনের আওতায় না আবার ফেঁসে যাই! (বাক স্বাধীনতায় চির বিশ্বাসী এবং এমন দেশে বাস করা যেখানে এই অধিকার সাংঘাতিকভাবে রক্ষিত (এখনও) মানুষের মহাবিপদ! কথা বলা/লেখা বন্ধ করতে হবে মনে হয়!)

সহজভাবে এই ঈদের মূল কথা হচ্ছে, ত্যাগ। আসলে কি এই ত্যাগের মাহাত্ম্য আর চোখে পড়ে? কোরবানী দেওয়া কিন্তু ফরজ (অবশ্য কর্তব্য) নয়, আমার স্বল্প বিদ্যা তাই বলে। অথচ কোরবানী দেবার জন্য মানুষ মহা ব্যস্ত। আর যাদের সামর্থ্যে অনেক, তারা তো প্রতিযোগিতায় নামেন! একবারও কি ভাবেন তারা যে কি করছেন! আসলে ধর্মের আনুষ্ঠানিকতায় মানুষ ব্যস্ত এখন, মূল বিষয়ের থেকে। রোযার সময়ও তাই। সারাদিন না খেয়ে দেহের রোযা করে সন্ধ্যার পর ছোটেন শপিং মলে! না আমি বলছি না যে সবাই কেনাকাটা বন্ধ করে দেবেন। আমার প্রশ্ন সংযম আর অসংযমের বিষয়ে। অসংযম কি ধর্মের সাথে যায়? না বাংগালী সংস্কৃতির সাথে যায়?

অংকুরের (অংকুর ইন্টারন্যাশনাল-স্বেচ্ছাসেবী দাতব্য প্রতিষ্ঠান) অনেক প্রজেক্টের মধ্যে রাজশাহীর একটি গ্রামে একটি এতিমখানায় সহযোগিতা করা হয়। এতিমখানাটি একজন মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীন হবার পর নিজের বাড়ীতে শুরু করেন। এই প্রজেক্টটি আমার দেখবার বিষয়। বাংলাদেশে অংকুরের শাখা নেই। নিজেদের চেনা মানুষ দিয়ে আমরা কাজ করি, স্বচ্ছতাই এর মূল কারণ। আমরা সবাই (এখানে ও দেশে) স্বেচ্ছাসেবক। আমার মা এই প্রজেক্ট দেখেন বাংলাদেশের বিষয়ে। গত রোযার ঈদের আগ দিয়ে আমি বরাবরের মত ঈদের দিনের খাবারের খরচ পাঠানোর বিষয়ে কথা বলবার সময় মা জানালেন যে, বাচ্চাগুলোর জন্য (১৪৭ জন) ঈদের কাপড়ের কথা বলছিলেন সেই মুক্তিযোদ্ধা মানুষটি। খরচ ৫০,০০০ টাকা! আমি শুধু বললাম যে, এখনো পুরো বৎসরের খাবারের ব্যবস্থা করে উঠতে পারিনি আমরা। (অল্প সরকারী অনুদান আর অন্য জায়গা থেকে কিছু পান, অংকুরের সহযোগিতাই প্রধান)।

বিভিন্ন ভাবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, ইনকাম জেনারেটিং প্রজেক্টের মাধ্যমে, বাচ্চাগুলোর পুরো বৎসরের খাবারের ব্যবস্থা করতে। কখনো কখনো বাচ্চা বেড়ে ১৬৭ জনও হয়। এ বৎসরের হিসাব অনুযায়ী পাঁচ মাস তাদের ধার করে খাবারের খরচ চালাতে হয়েছে! সামনের আরও কয়েকটি বৎসর লাগবে শুধু খাবারের নিরাপত্তা দিতেই, আর সেখানে ঈদের জামার আমি কিভাবে ব্যবস্থা করবো? হতাশার চোটে মা’কে কথা শুনালাম কিছুক্ষণ! বললাম যে এবারও যে টাকা জোগাড় করা হয়েছে তা দিয়ে আরো কিছুদিনের খাবারের ব্যবস্থার জন্য টাকা পাঠাচ্ছি, কোনো কাপড় নেই ঈদে! আগে জেনে নিয়েছিলাম যে, পরবার কাপড়-চোপড় আছে কি না। হ্যাঁ আছে। এটা ঈদের জন্য চাওয়া।

তার কিছুদিন আগে ভেবেছিলাম যে ঈদের দিন অল্প দু’ একটা পদ রাঁধবো। জানি না পরের ঈদে কেমন থাকি না থাকি। ছেলে যেন ভবিষ্যতে মনে করতে পারে, মা কী রেঁধেছিল! আমাদের বাড়ীতে যে কোনো উৎসব হয় অত্যন্ত পরিমিতির মধ্যে। ঈদে দাওয়াত থাকে বলে কিছুই রাঁধি না। (এবার কোনো দাওয়াত নেই!)।

ঈদের কিছু আগ দিয়ে ছেলের জন্য একটা নূতন শার্ট কিনতাম। আর যদি পাঞ্জাবী থাকে (দেশ থেকে ঘুরে আসলে থাকে, না হলে দেখা যায় আগেরগুলো গায়ে হচ্ছে না, লম্বা হবার দরুণ)।

পছন্দের গেইম কিনলে শার্ট কেনা হয় না। শার্টের চেয়ে গেইমই পছন্দ স্বাভাবিকভাবে! (ইচ্ছে করেই এসব করি, ছোট বয়স থেকে পরিমিতি বোধ না থাকলে তা আর হয় না)।

১৪৭-টি এতিম বাচ্চার ঈদের কাপড় দিতে পারিনি, আমি কীভাবে আর নিজের ছেলের শার্ট কিনি ঈদে! ভাগ্যিস পাঞ্জাবী গায়ে হয়েছিল! না সে কোনো অনুযোগ করতো না, ঈদে নূতন কাপড় পরা না পরা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না, জানেও না। কিন্তু আমি যে মরছি বিবেকের দংশনে! রোযার ঈদেও পারিনি। এই ঈদেও পারলাম না! শুধুই খাবারের খরচ পাঠাতে পারি!

রোযার ঈদের আগ দিয়ে টিভিতে দেখছিলাম বাংলাদেশের মানুষের কাপড়-চোপড়ের মহোৎসব! ইদানীং আবার লম্বা কামিজের যুগ! পাকিস্তানী আর ভারতীয় কাপড়ে দেশ ছেঁয়ে গেছে! নারীদের কামিজের অতিরিক্ত কারুকার্য্যের কথা বাদ দিলাম, অতিরিক্ত যে অংশটুকু (বাড়তি যে ঝুল, যার কোনো প্রয়োজন নেই) দেখছিলাম আর ভাবছিলাম তা দিয়ে কতগুলো বাচ্চার জামা-কাপড় করা যেত!

লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.