টিন-এজার মেয়ে ও মায়ের সমস্যা

সেদিনের ছোট্ট খুকু আজ টিন-এজার। মায়ের সঙ্গে আজকাল প্রায়ই তার মনোমালিন্য হয়। কিংবা হয় না, কিন্তু মা টের পান তাদের সম্পর্কে জমে উঠছে অনেক না-বলা জটিলতা।

সম্পর্ক-১

শ্রাবন্তির সমস্যাটার শুরু বয়ঃসন্ধি পেরুনোর পর। তার ক্লাসের মেয়েরা কেমন প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা, খুশিতে উজ্জ্বল! সে কিন্তু একেবারে মুখচোরা, ম্রিয়মাণ। তার শ্রীহীন কালো চেহারা নিয়ে সে লুকিয়ে পড়তে পারলে বাঁচে, বিশেষত যখনই সে তার মায়ের সামনাসামনি হয়। কারণ শ্রাবন্তির সুন্দরী মা তার থেকে পঁচিশ বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও তার রূপ যৌবন ব্যক্তিত্ব এখনো রীতিমতো চোখ ধাঁধানো। সেখানে শ্রাবন্তি এই টিন-এজেও নেহাতই ম্যাড়মেড়ে। প্রিয়াঙ্কাও মনোকষ্টে ভোগে, তবে তার সমস্যাটা আলাদা। ছাত্রী হিসেবে সে মাঝারি। তার সমস্যা জোরদার হয়ে ওঠে সে যখন তার অবসম্ভব সফল ডাক্তার মায়ের নিরিখে নিজেকে মাপে। অস্থিরতা বেড়ে যায়, যখন ভাবে তাকেও কি এই শিখর ছুঁতে হবে?

সম্পর্ক-২

মহিমার ইদানীং প্রায়ই মনে হয় সে যেন খাঁচায় আটকানো পাখি। তার মা চিরকালই স্কুলে ছাড়তে যেত, নিয়ে আসত। নাচ শেখার সময় বাইরে অপেক্ষা করে থাকত। এসব দেখেশুনে বুরা সর্বদাই হাসাহাসি করত। অনেক রাগারাগি, মনকষাকষি করে অবশেষে মহিমা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আজকাল যেন বাড়াবাড়ি করছে মা। মাঝে মাঝেই পড়ার সময় হঠাৎ করে ঢুকে পড়ে ঘরে, বুকে টেলিফোন করার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, রাতেও কখনো কখনো কোনো কারণ ছাড়াই তার ঘরে এসে ঘুরে যায়। মহিমা পরিষ্কার বুঝতে পারে, মা তার ওপর কড়া নজর রাখছে। সে ভেবে পায় না কেন?

সম্পর্ক-৩

তানিয়া যত বড় হচ্ছে ততই তার একাকীত্ব বাড়ছে। ছোটবেলা থেকেই সে আয়ামাসির কাছে বড় হয়েছে, মাকে বলতে গেলে পায়নি। বুক দিয়ে আগলে রাখে মাসি, কিন্তু সে তো আয়ামাসিই, মা তো নয়! জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মাকে একটানা কতক্ষণ একসঙ্গে দেখেছে তা হাতে গুনে বলতে পারে তানিয়া। চেষ্টা করেছে স্কুলের বুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, তাদের বাড়ির লোকদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে, কিন্তু তাতে তানিয়ার সমস্যা বেড়েছে বৈ কমেনি। সে আরো বেশি একা হয়েছে, মাকে আরো বেশি মিস করেছে। বার বার মনে হয়েছে সেও কেন এই রকম একটা ভরপুর পরিবারের সদস্য নয়!

সমস্যার সুরাহা

মা ও মেয়ের মধ্যে কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়! কিন্তু তা সত্ত্বেও হয়! কারণ মানবিক সম্পর্ক মানেই মানসিক অবস্থার নানা জটিলতা। আর এ সম্পর্কের জটিলতা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা পেতে থাকে জীবনের আধুনিকতার ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে। কোনো একটি সাধারণ নিয়ম বা সমাধান এর জন্য কার্যকরী নয়। মানুষ যেহেতু প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা তাই তাদের সম্পর্কের চরিত্রও ভিন্ন। আর এ কারণেই তা মোড় নেয় অজানা সব বাঁকে।

যেমন শ্রাবন্তীর হীনমমন্যতার কারণ রূপসী মায়ের ঠিকরানো সৌন্দর্য। প্রতিটা মুহূর্তে তাকে শুনতে-শুনতে বড় হতে হলো যে তার মার রূপের ছিটেফোঁটাও সে পায়নি! আত্মীয়স্বজনদের এই কাণ্ডজ্ঞানহীনতা যে শিশুর কোমল মনে কতটা আঘাত হানে তা তারা কোনো দিনই বুঝবেন না। তা বুঝতে হবে প্রধানত তার মাকেই। যখনই মেয়ের সামনে কেউ মায়ের স্তুতি গাইতে বসবে মা যেন তখনই তা মেয়ের সামনে নস্যাৎ করে দেন বা প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। সেই সঙ্গে প্রয়োজন মেয়েকে বোঝানো যে, বাইরের চেহারার তারতম্যটা নয়, বড় কথা হলো গুণ আর স্বভাবের সৌন্দর্য। মেয়ের গুণের প্রশংসা করে মা একই সঙ্গে তার আত্মবিশ্বাস যেমন ফিরিয়ে আনতে পারেন, তেমনই পারেন মেয়ের মন থেকে এই হীনমমন্যতা এবং তা থেকে তৈরি হওয়া যাবতীয় জটিলতা মুছে দিতে। তবে তার জন্য মাকে বিসর্জন দিতে হবে স্তুতির মোহ, অন্তত সন্তানের সুস্থ মানসিক স্থিতির স্বার্থে। নইলে এ জন্য পরে অনেক বড় মাশুল গুনতে হতে পারে।

কেবল চেহারা নয়, জনপ্রিয়তা, সাফল্যও মা-মেয়ের মধ্যে বহু ক্ষেত্রেই বড় বিভেদ রচনা করে। প্রিয়াঙ্কার মতো আরো অনেকের জীবনেই তার মা যে যোগ্যতর, তা বারবার নানাভাবে উচ্চারিত হয়। মায়ের সমান সফল হওয়াটা যেন একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় তাদের সামনে। এক্ষেত্রেও মাকেই তার মেয়েকে বোঝাতে হবে যে সফলতাটাই জীবনে সব থেকে মূল্যবান নয়। ভালো মানুষ হওয়াটাই জীবনের শেষ কথা।

আমাদের দেশে অভিভাবকরা সন্তান সম্পর্কে একটু বেশিই প্রোটেকটিভ হন। সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তো মা-বাবারই কিন্তু ওভার প্রোটেকটিভনেস বা পজেসিভনেস অনেক সময়ই স্বাভাবিক সম্পর্কের পথে হয়ে ওঠে অন্তরায়। দুটি গাছের মধ্যে যেমন আলো-হাওয়ার জন্য যথেষ্ট সেপস দরকার মা-মেয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। মা বা অভিভাবক হিসেবে সর্বদাই চেষ্টা করা দরকার বাড়ন্ত মেয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর দূরত্বটা বজায় রাখা। অনেক মা এ ব্যাপারে একেবারেই অপারগ হন, সেক্ষেত্রে নিজেকে পুরোদস্তুর পাল্টাতে হবে। প্রয়োজনে কাউন্সিলিংও নিতে পারেন।

আবার এর ঠিক উল্টোদিকেই আছে ব্যস্ততার জন্য মায়ের মেয়েকে সময় না দিতে পারা। মা ব্যস্ত থাকতে পারেন, কিন্তু দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। কেবল সন্তানের জন্ম দেয়া মানেই মা হওয়া নয়। মা হওয়ার অন্যতম প্রধানত শর্ত সন্তানকে মানসিক নিরাপত্তা জোগানো। আর এই নিরাপদ আশ্রয়ের আধারটি তো স্নেহময় সান্নিধ্য দিয়েই তৈরি হয়। মেয়েকে আপনি কতটা সময় দিচ্ছেন, তার পরিমাপ ঘড়ির কাঁটা দিয়ে হবে না। মেয়ে যেন অনুভব করে, ব্যস্ততার মধ্যেও মায়ের সবটুকু মনোযোগ, স্নেহ তার দিকেই। তা হলেই সে তার মায়ের ব্যস্ততাকেও সমমান করতে শিখবে, একই সঙ্গে নিজেকেও অবহেলিত, অনাদৃত মনে করবে না। মা-মেয়ের মধ্যে বুত্ব তৈরি হলেই দুজনের সম্পর্কে অবাঞ্ছিত জটিলতা প্রবেশাধিকার পাবে না।

(মনোজগৎ থেকে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.