দেবীপক্ষের শুরু-আজ মহালয়া

Mahalayaপ্রভাতী দাস: শরত এসেছে আজ বেশ কিছুদিন। শরত মানেই হাল্কা হিমহিম, আড়মোড়া ভেঙ্গে বাইরে তাকিয়ে ঘাসের গায়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ শিশিরের কোহিনূরে উদ্ভাসিত অপ্রতিম সব সকাল, দোয়েল-শ্যামার ডাক, শিশিরে ভেজা অমৃত গন্ধা কমলা বোটার সাদা শেফালি, কুল কুল ধ্বনিতে বয়ে যাওয়া বর্ষায় ভরা নদী, দুই পাড়ে তার সফেদ শুভ্র কাশের  গুচ্ছ, আর ঘন নীল আকাশ জুড়ে জলশূন্য সাদা মেঘের ভেলা, প্রকৃতি যেন তার বরণ ডালা নিয়ে প্রস্তুত।

সেই ছোট্ট বেলা থেকে জেনে এসেছি, প্রকৃতির অপরূপ রূপে এই যে সাজ-সজ্জা সে শারদীয় উৎসবের সাজ, প্রকৃতি ব্যস্ত আরাধনায়। শরতে জগজ্জননী দুর্গার আরাধনা হয়, সবার অন্তরে অন্তরে মায়ের আগমনীর সুর বেজে উঠে। কাশের দেশ, শেফালীর দেশ অনেক আগে ছেড়ে এলে কি হবে, এই সময়টা এলেই নিজের অজান্তেই কখন যেন গুন গুন শুরু করি;

 “ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ,

দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ।

ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে!

তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে ।

তোমার মুক্তকেশের পুঞ্জ মেঘে লুকায় অশনি,

তোমার আঁচল ঝোলে আকাশতলে রৌদ্রবসনী!

ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!

তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।”

….ছোট্ট বেলায় শরত শুরু হলেই শুরু হতো পুজোর অপেক্ষা, দিন গোনা দিনে রাতে, আর কত দেরী, আর কত……! এই সময় টা কাটত মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা তৈরি দেখে দেখে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের বাগান বাড়ি, মধ্যবাজার, উত্তরবাজার সব পুজোর বাড়িতেই এই সময় প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ, খড়ের কাঠামোতে মাটির শেষ প্রলেপটুকুও লাগানো হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও হয়তো মূর্তি শুকিয়েই গেছে। আয়োজকরা মহা ব্যস্ত, কেউ ছুটছেন দর্জি পাড়ায়, মা আর মেয়েদের জমকালো বেনারসি,কার্ত্তিকের রাজবেশ আর গণেশের নকশাদার ধুতি বানানোর কাজে তাড়া দিতে। কেউবা ছুটছেন কামার পাড়ায়, দেবীর হাতের চক্র, গদা, তীর-ধনুক ও খড়গ-ত্রিশূল বানিয়ে আনতে। দু’এক দিনের মধ্যেই বাহারি রং চড়বে প্রতিমার গায়। নিপুণ কারিগর তার তুলির আলতো ছোঁয়ায় জাগিয়ে তুলবেন মা দুর্গাকে। জেগে উঠবেন মায়ের কন্যাদ্বয় বিদ্যাদাত্রী সরস্বতী আর ধনদাত্রী লক্ষ্মী। বড় ছেলে কার্ত্তিক সাজবেন রাজপুতের বেশে আর ছোট ছেলে গণেশের পড়বেন দুধসাদা নকশাদার কুচানো ধুতি। ষষ্ঠী পূজার দিন বোধনের মধ্য দিয়ে খুলে যাবে মা দুর্গার তৃতীয় নয়ন, জেগে উঠবেন দশভুজা…………।

অপেক্ষা অনন্ত ব্যাপী মনে হত এই পর্যন্ত এসে। প্রতি ভোরে সাথিদের সাথে নিয়ে এ টি আই, গৌরীপুর কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শেফালি আর স্থলপদ্ম তুলে ফিরতি পথে বাগানবাড়ির মন্দিরের পর্দার আড়াল সরিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে প্রতিমার মুখ একবার অন্তত দেখে এলেও স্কুল থেকে ফিরবার সময় ভাইকে নিয়ে আরেকবার থামতেই হত প্রতিমা দেখতে। মাকে সকাল সন্ধ্যা নতুন জামা তাড়াতাড়ি বানিয়ে শেষ করবার তাড়া যেমন চলত, তেমনি ঠাম্মার কাছে চলত মুড়ি-নাড়ু-খই এর বায়না। এরই মধ্যে একদিন শেষ রাতে ঘুম ভাঙত, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীপাঠের শব্দে,

 “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরুপেন সংস্থিতা

নমস্থস্যই নমস্থস্যই নমস্থস্যই নমো নম:

যা দেবী সর্বভূতেষু শান্তিরুপেন সংস্থিতা

নমস্থস্যই নমস্থস্যই নমস্থস্যই নমো নম:

যা দেবী সর্বভূতেষু জাতিরুপেন সংস্থিতা

নমস্থস্যই নমস্থস্যই নমস্থস্যই নমো নম:”।”

…আকাশবাণীর ‘মহিষাসুর-মর্দিনী” শুনতে শুনতে সেই সকালেই জেনে যেতাম, সেদিন মহালয়া। মা আজ পা রেখেছেন মর্ত্যলোকে, পূজোর আর মাত্র ছয়দিন বাকি। বছর ঘুরে উমা দেবী আসছেন তার বাপের বাড়ি, ঢাকের কাঠি ঢেম কুড় কুড়, ঘণ্টা- কাঁসার ঢং ঢং-টিং টিং, মঙ্গল শাঁখ ও উলু ধ্বনি। মায়ের আগমনে চারদিকে আনন্দ আয়োজন সম্পন্ন করবার তাড়া এবার আর শুধু আমার নয়, তাড়া এবার লেগে যাবে ঘরে ঘরে, মন্দিরে মন্দিরে।

….আজ সেই মহালয়া। আজ চণ্ডী পাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে মর্ত্যলোকে,আবাহন ঘটেছে দেবী দুর্গার। দেবী দুর্গার আবাহনই ‘মহালয়া’ হিসেবে পরিচিত। ষষ্ঠী পুজোর মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মূলত আজ থেকেই পূজারীরা দুর্গা মায়ের আগমন ধ্বনি শুনতে পান।

শাস্ত্রীয় বিধান মতে, মহালয়ার দুটি পর্ব রয়েছে, একটি হলো পিতৃপক্ষ, অন্যটি দেবীপক্ষ। অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের শেষ হয়, আর প্রতিপদ তিথিতে শুরু হয় দেবী পক্ষের। আজ মহালয়া দিয়ে আরম্ভ হয়ে গেছে সেই দেবীপক্ষ। এদিন গঙ্গাতীরে প্রার্থনা করে ভক্তরা মৃত আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার মঙ্গল কামনা করেন। মহালয়া দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তকালে তিনি এই পুজোর আয়োজন করায় দেবীর এ পুজোকে বাসন্তী পুজোও বলা হয়। শ্রী রামচন্দ্র রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন। তাই শরৎকালের এই পুজোকে হিন্দুমতে ‘অকালবোধন’ও বলা হয়। ধর্মমতে, এই দিনে দেব-দেবীকুল দুর্গাপুজোর জন্য নিজেদের জাগ্রত করেন। মহালয়ার দিন ভোরে মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খের ধ্বনি ও শ্রীশ্রী চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন জানানো হয়, দেবীর আরাধনা সূচিত হয় মহালয়ার মাধ্যমে।

 “ওঁ সর্বব মঙ্গঁল মঙ্গঁল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে ।

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণি নমোহস্তুতে।।

ওঁ শরণাগতদীনাত পরিত্রাণ পরায়নে ।

সব্বস্যাত্তিহরে দেবী নারায়ণি নমোহস্তুতে ।।

ওঁ সৃষ্টি স্থিতি বিনাশানাং শক্তিভুতে সনাতনি

গুনাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোহস্তুতে ।”

এই কাশহীন, শেফালীহীন দেশে বেড়ে উঠা সন্তানদের কাছে মহালয়া কোন বিশেষ উৎসবের আগমনী বার্তা বয়ে আনে না, কারো আবদার নেই নতুন জামার, নেই বায়না নাড়ু-মোয়ার। তবু এই দিনটি প্রতিবছরই আসে; তবু এই দিনটা এলেই মনের ভেতরে আজো সেই ঢাকের ঢেম কুড় কুড়, ঘণ্টা- কাঁসার ঢং ঢং-টিং টিং, মঙ্গল শাঁখ ও উলু ধ্বনি, মা আজ পা রেখেছেন মর্তলোকে।

সবাইকে মহালয়ার শুভেচ্ছা।।Ritu

লেখক পরিচিতি: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.