অবশ্যই বিদ্যুত কেন্দ্র চাই, তবে রামপালে নয়

Rampal Mapসুপ্রীতি ধর: বাগেরহাটের রামপালে বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। একদল এর বিরোধিতা করে বলছেন, রামপালে এটি গড়ে তোলা হলে স্বভাবতই এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে দেশের ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর। বিরোধিতাকারীদের বিরোধিতা বিদ্যুত কেন্দ্র নিয়ে নয়, এটা কেন বুঝতে সবাই ভুল করছে? তারা বলছেন, দেশে বিদ্যুত ঘাটতি মেটাতে অবশ্যই বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রয়োজন আছে, কিন্তু প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে নয়। সুন্দরবনকে ধ্বংস করে নয়।

আমার কথাও সবার কথা। সুন্দরবন আমাদের একটাই, এটি ধ্বংস হলে কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, একে আবার গড়ে তোলা। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতেই সুন্দরবনের সৃষ্টি। আমরা নিকট অতীতেও প্রমাণ পেয়েছি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কিভাবে নিজে বুক আগলে আমাদের রক্ষা করেছে এই প্রকৃতি মা – সুন্দরবন। আবার নিজে থেকেই সেই ধ্বংস কাটিয়ে উঠেছে। যতোই আমরা বিজ্ঞান বিজ্ঞান করি না কেন, প্রকৃতিকে রুখতে পেরেছি কি? প্রকৃতি নিজেই যদি সহায় না হয়, তবে কোনো আধুনিকতাই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। প্রতি বছর খোদ যুক্তরাষ্ট্র, জাপানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। কই, তারা পারছে তা ঠেকাতে? হয়তো তাদের জনসংখ্যা কম বলে, প্রস্তুতি নিতে পারে হাজার গুণ বেশি আমাদের চাইতে, কিন্তু প্রকৃতি তার ভয়াবহ প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না কোথাও।

NTPC
দিল্লির এনটিপিসি’র ভিতরে এমনই সবুজের সমারোহ

বাগেরহাটের রামপালে এই বিদ্যুত কেন্দ্র নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই কথাবার্তা চলছে। মাত্র দুবছর আগেও দেশে এ নিয়ে তেমন একটা আলোচনা ছিল না। ২০১১ সালের মে মাসে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সফরে গিয়ে জানা গেল এই প্রকল্পের কথা। তারা সাংবাদিকদের ডেকেই নিয়েছিলেন এই বলে যে, প্রকল্পের কাজটা এগোতে গিয়েও এগোচ্ছে না। তারা তখন দিল্লির কাছে নইডাতে গড়ে উঠা সেদেশের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুত কেন্দ্রটি (NTPC Limited (formerly National Thermal Power Corporation) দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। দিল্লির একেবারে কাছেই এমন বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখে যে কারোরই মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা। আমারও ঘুরেছিল। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে একই সাথে ১৬টি কয়লা ও সাতটি গ্যাস ভিত্তিক স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে এই কেন্দ্র থেকে। যেগুলোর অবস্থান পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে। এনটিপিসির সর্বমোট ক্ষমতা হচ্ছে ৪১ হাজার ১৮৪ মেগাওয়াট। শুধু তাই নয়, জয়েন্ট ভেনচারের অধীনে ছয়টি কয়লাভিত্তিক স্টেশন এবং আরেকটি স্টেশন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে নাফথাল/এলএনজি। ২০১৭ সাল নাগাদ প্রকল্পটি লক্ষ্য হচ্ছে কয়লা-ভিত্তিক ফুয়েল মিক্স এর মাধ্যমে প্রায় ৩১ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট, ৩,৯৫৫ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক, ১৩২৮ মেগাওয়াট হাইড্রো ভিত্তিক, প্রায় ১৪০০ মেগাওয়াট পরমাণু সোর্স থেকে এবং প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট নবায়ণযোগ্য জ্বালানি সোর্স থেকে বিদ্যুত যোগ করা জাতীয় চাহিদায়। পরিবেশের যাতে কোন ক্ষতি না হয়, সেজন্য ফ্লোরা এন্ড ফাউনার ওপরও গুরুত্ব ততোধিক। তারা গড়ে তুলেছে বিশাল গ্রিন ফিল্ড প্রজেক্ট। যেখানে চুল্লি থেকে নি:সৃত কালো ধোঁয়াগুলোকেও তারা রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে কাজে লাগাচ্ছে, গড়ে তুলেছে বিশাল বনায়ন। বিদ্যুত উৎপাদনকে আরও বাড়াতে তারা নিত্যনতুন স্টেশনগুলোর বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে, যাচ্ছে যৌথ অংশীদারিত্বে, এমন নানাকিছু। এক এনটিপিসিতেই কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল টাউনশিপ। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ কি সুবিধা নেই সেখানে। দিল্লি পাবলিক স্কুলের মতোন স্কুলও সেখানে আছে, যেখানে বিশ্বমানের পাঠদান পদ্ধতিতে চলছে কর্মচারিদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা।

কেন এতো কথা বলছি? বলছি এ কারণেই যে, যখন দুবছর আগে এই প্রকল্পটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল (আমার সৌভাগ্য হয়েছে ভারতের আরও অনেক সফল প্রকল্প ঘুরে দেখার), তখন একবুক দীর্ঘশ্বাসই কেবল বেরিয়ে এসেছিল নিজের অজান্তে। আমি নিশ্চিত জানি, এ ধরনের একটি প্রকল্প বাংলাদেশে (নিজের দেশ হলেও) কিছুতেই গড়ে তোলা সম্ভব না। এইদেশের দুর্নীতিবাজ প্রশাসন, ততোধিক দেশপ্রেমহীন এই আমরাই একে সফল হতে দেবো না। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমরা একে লুটেপুটে খেয়ে ছোবড়া ফেলে রাখবো ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

দিনাজপুরের ফুলবাড়ি কয়লা প্রকল্প নিয়েও যে আন্দোলন-বিতর্ক চলছে, এর পিছনেও একই কারণ। জার্মানি-অস্ট্রেলিয়ার উন্মুক্ত কয়লা খনিগুলোও আমাদের দেশের সাংবাদিক-নাগরিক সমাজকে দেখানো হয়েছে। দেখানো হয়েছে কিভাবে তারা পরিবেশের ন্যূনতম ক্ষতি না করেই মাটির নিচে পড়ে থাকা অমূল্য সোনার সদ্ব্যবহার করে চলেছে। আমি এটাও বুঝি যে, মাটির নিচে সম্পদ রেখে দিয়ে গরীব দেশকে কোনক্রমেই ওপরে টেনে তোলা সম্ভব না। এর বিকল্প বের করতেই হবে। তবে তার আগে চাই উদাহরণযোগ্য কোন প্রমাণ। তাছাড়া মাটিকেন্দ্রিক জনমানুষকে মাটি থেকে উচ্ছেদ করে কোনো প্রকল্পই সফল হতে পারে না, পারবেও না।

অন্য অনেকের মতোনই আমিও চাই, দেশের কয়লাগুলোর সদ্ব্যবহার হোক, বিদ্যুত কেন্দ্র গড়ে উঠুক আরও অনেক, তবেই না দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু সর্বাত্মক ফিজিবিলিটি স্টাডি না করেই কেন রামপালে এই বিদ্যুত কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সরকারও মরীয়া হয়ে উঠেছে তা আমার বোধগম্য নয়। ভারত বলছে, তারা তাদের প্রকল্প অনুযায়ী সবরকম সুযোগ-সুবিধা এবং পরিবেশ রক্ষায় করণীয় সব ঠিক করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা যারা এই প্রকল্প চালাবো, আমরা কি এর ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট যোগ্য কিনা, সেই প্রশ্ন স্বভাবতই আসছে। নিয়ম অনুযায়ী এই সরকারের মেয়াদ হাতে গোণা কয়েক মাস। অতীতের কোন উদাহরণই আমাকে আশাবাদী করে তোলে না যে, এই প্রকল্পটা নিয়েও নয়ছয় হবে না। কেন জানি মনে হচ্ছে, সরকার অক্টোবরেই এই প্রকল্প উদ্বোধনের পর সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে, শেষ করে দিয়ে যাবে। আগামীতে নতুন সরকার এসে আবার নতুন করে নিজের আখের গোছাবে এই এক প্রকল্পকে ঘিরেই।

কথা হচ্ছে, বিদ্যুত কেন্দ্র হবে ভাল কথা, কিন্তু তা রামপালেই কেন? দেশের মানুষ যখন বিরোধিতা করছে, তখন রয়ে-সয়ে না এগিয়ে কেন মরীয়া হয়ে উঠেছে সরকার? এর পিছনে গূঢ় উদ্দেশ্যটা কি? দেশে অজস্র জায়গা পতিত পড়ে আছে, সেখানে হোক এই বিদ্যুত কেন্দ্র। ভারত যেভাবে তাদের বিদ্যুত কেন্দ্রগুলো গড়ে তুলেছে, যেভাবে সেগুলো মেইনটেইন করছে, আমরা সেটা পারবো না। ভারত যেখানে এই প্রকল্পটি গড়ে তুলতে পারেনি তাদের অংশের সুন্দরবন এলাকায়, সেখানে আমরা ঘাটের মরাকেই বা কেন আবার মারার জোর তৎপরতা? কেন?

তাই সবার সাথে গলা মিলিয়েই বলতে চাই, বিদ্যুত কেন্দ্র হোক, একটা নয়-দুইটা নয়, শয়ে শয়ে হোক, হাজারে-হাজার হোক, তবে তা রামপালে নয়। সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতোন, একে ধ্বংস করে কোন উন্নয়ন কোনদিন সম্ভব না। আর এটা যে ধ্বংস হবে না বিদ্যুত কেন্দ্র হলে সেকথাও তো কোন গবেষণায় কেউ সুস্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারেনি। আমাদের দুর্নীতিবাজ প্রশাসন, ততোধিক দুর্নীতিবাজ এই আমাদের কারণেই সেটা হতে পারবে না, সেই আত্মবিশ্বাস নেই বলেই তো আমাদের এই প্রতিবাদ।

একজন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘রামপাল নিয়ে সরকারের তথ্য অধিদপ্তরের প্রেস নোট প্রমান করেছে, এই সরকার জনগনের সেন্টিমেন্ট বোঝেনা | এই প্রেস নোট আরো প্রমান করেছে যে, সরকার বিদেশী কোম্পানির দালালিতে মেডেল পাওয়ার যোগ্যতা রাখে’…এ ধরনের কথা কেন তুলবে একজন নাগরিক? সরকারেরই সেই দায়বদ্ধতা এ ধরনের মনোভাব থেকে জনগণকে মুক্তি দেওয়া।

আমাদের দেশে কোন উদাহরণ নেই ভাল কিছু ধরে রাখার। তাই এর তীব্র বিরোধিতা করা ছাড়া আমাদের কোন গত্যন্তর নেই। সরকারের উচিত পাবলিক পালস পড়ে দেখা, তড়িঘড়ি করে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিলে আখেরে এর ফল ভাল হবে না, না আমাদের জন্য, না সরকারের জন্য। আশা করছি, এখনও সময় আছে, সরকার বিষয়টা বিবেচনা করে দেখবে। জনগণের সরকার জনগণের বিরুদ্ধে কি যেতে পারে? না যাওয়া উচিত?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.