শারদ বন্দনা

0
Ritu 2

প্রভাতী দাস

প্রভাতী দাস: কাল বিকেলের পর থেকেই আকাশ কাল করে কি ভীষণ বৃষ্টি, প্রায় ভিজতে ভিজতেই রাতের নেমতন্ন শেষ করে গাড়িতে উঠেছি। ঘুমুতে যাবার সময়-ও গুরু গুরু মেঘের গর্জন আর ঝমঝমিয়ে পরা মুষল ধারের বৃষ্টি। আরেকটি বৃষ্টি ভেজা সকালে লম্বা ড্রাইভের জন্য মনে মনে তৈরি হয়েই ঘুমিয়েছিলাম। অথচ সেখানে আজ ঘুম ভেঙে দেখি, কোমল সোনালি জরিতে বোনা আঙরাখা পরে সোনা রোদ্দুরের সকাল বাহিরে অপেক্ষমান। বুঝে নিলাম, আজ বিশেষ একটা দিন। মনে পড়ল আজ, আজ অটাম্নাল ইকুইনস্ক বা জল বিষুব, আজ ফল-এর প্রথম দিন। এই বর্ষাহীন গ্রীষ্মের দেশেও এবার ছিল অনিঃস্রিত ধারাপাতের ঘনঘটা। গতকাল শেষবারের মত রোদন শেষে জলদ গম্ভীর ঘনশ্যাম বর্ণী মেঘেরা আকাশের সালিয়ানা ফল-এর কাছে বুঝিয়ে দিয়ে দেশান্তরী হোল বুঝি ।

কাজের পথে ছুটছি, মনে মনে হাজারটা ভাবনা চিন্তা। গতকালের জমে যাওয়া কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে আবার আরেকটা নিচ্ছিদ্র কর্মময় সপ্তাহের জন্য তৈরি হতে হবে। রেডিওতে উপস্থাপকের কথায় নতুন করে মনে পড়ল, আজ পৃথিবীতে দিন আর রাতের দৈর্ঘ্য সমান। দিনরাতের দৈর্ঘ্যে কি বা যায় আসে, কিছুই তেমন না। কবেই বা সূর্যোদয়ে পৃথিবীর নতুন দিনকে স্বাগতম আর সূর্যাস্তে বিদায় জানাই! প্রায় কখনোই নয়। সকালের অনেকটা কেটে যায় ঘুমের ঘোরে আর রাতের প্রায় অর্ধেকটাই ব্যাপ্ত করে থাকে জীবন যাপন; পেশা, সংসার আর সমাজ। আজও সকালের প্রথম কয়েক প্রহর পার করেই ঘুমটা ভেঙেছিল। সামার শেষ হতে হতেই, গরমের তীব্রতা কমে গেছে অনেক। দেশে শরতের শুরু হয়েছে বেশ আগে, ভাদ্র চলে গিয়ে আশ্বিন এসেছে। যদিও জেনেছি সেখানে নীলাভ্র কাদম্বিনীই এখনও আশমানের অধিরাজ। আর আমি মনঃকষ্টে মরে যাই, শরত বলে কোন ঋতু নেই এদেশি ক্যালেন্ডারে, নেই হেমন্ত-ও।

provati

এতগুলো বছর এই বিভুয়ে কাঁটিয়েও আদিখ্যেতা কমে না আমার, প্রতি শরতে কি এক বিবর্ণ বেদনায় আর্দ্র হয় হৃদয়। হায়, এদেশে শরত নেই, নেই শেফালী, এখানে আকাশ আলো করে উঠেনা শরদিন্দু, নেই শারদীয়া। তমস্বিনী রাত্রির শেষ প্রহরে হঠাত হিমে ঘুমঘুমে চোখে পায়ের কাছে পরে থাকা চাদরে গা মুড়িয়ে নিতে নিতে সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিতে ইচ্ছে করে, শিশির স্নাত একটি শেফালিকার জন্যে। কিন্তু অলোকসুন্দর স্বপ্নময় সে ইচ্ছেটা আজো অসূর্যস্পশ্যা, তার ব্যাপ্তি কেবল মাত্র কয়েক পল। উষসীর আগমনে যে রথারোহী দিবাকরের গৃহ প্রবেশ তাঁর অধীরথ যে রুঢ় বাস্তবতা! তাই ইচ্ছেগুলো নিমেষেই কারাবন্দী হয় কোন এক নিরুদ্দেশে, চোখের ঘুমঘুম ভাবটুকু আবারও ফেরারি অষ্ট প্রহর। পরিণত মানবীর সুচিন্তিত পরিকল্পনায় বাঁধা আরেকটি দিনের সূচনা ঘটে। তবু কোন কোন দিন পরিকল্পনার সুগঠিত দেয়ালের গায়ে অগোচরে তৈরি হওয়া চুলের মত ক্ষীণকায় ফাঁকফোকর গলে ঢুকে পড়ে কিছু রং, কিছু ঘ্রাণ, কিছু কথা, কিছু সুর…………, সুতানলি সাপের মতো। স্মৃতির দংশনে নীল হয় বিক্ষত হৃদয়। অস্পষ্ট হৈমন্তী একটা সুর গুন গুন করে হৃদয়ের তারে তারে, শব্দে-সুরে উদাত্ত হয়না না যেন কিছুতেই। চারিধারের নিষেধের পাহাড় সমান আড়াল ডিঙিয়ে মন পালাতে চায়, তার আপন স্বাচ্ছন্দ্যের উঠোনে।

দ্রুতগতিতে চলতে থাকা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে কনক কান্তি পৃথিবী বুঝিয়ে দেয় সূর্যদেবের উত্তাপের তীব্রতা কমলেও দীপ্তির জৌলুস কমেনি। ফসলের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে দেখি, শস্য সংগ্রহের কাল এসেছে। ক্ষেতে ক্ষেতে পরিণত ফসলের সম্ভার, গম, মকাই, কুমড়ো, কলাই, বিউলি, বরবটি, তামাক। কারো কারো শস্য সংগ্রহের পালা শেষ হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই, মাঠ জুড়ে পড়ে আছে পিঙ্গল বর্ণা নাতিদীর্ঘ শস্যাবশেষ। উদয়াস্ত শস্য আরোহণে কিছুদিনের মধ্যেই পরিপূর্ণ হবে কৃষকের গোলাঘর। শুরু হবে হারভেস্ট উৎসবের উদ্যোগ, আয়োজন, আড়ম্বর; বিচিত্রবর্ণ ফুল, ফল আর শস্যের সমারোহে পথের ধারে বিকিকিনির মেলা জমবে ছোট ছোট। দেখলাম সকালে ঘাসের শীষে শীষে অগণন শিশিরের হীরকচূর্ণ দ্যুতি ছড়ালেও, এখনও পাতারা রঙ বদলের খেলায় মাতেনি ঠিক।

আজ আকাশ অনেক ঘন নীল, ফুরফুরে মেজাজের জলশূন্য সাদা মেঘেরা সেই নীলের অনেকটারই উদ্ধত ঠিকাদারিতে। ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে পেঁজা তুলার মত মেঘেরা হৃষ্ট চিত্তে আকাশের গায়ে কি অপরূপ এক রূপকথার রাজ্য নির্মাণে ব্যস্ত যেন। মনশ্চক্ষু একটু প্রশস্ত করলেই দেখা দেয় অচ্ছোদ এক অলকানন্দার অববাহিকায় উত্তুঙ্গ প্রাচীর ঘেরা সাত মহলা প্রাসাদ, তার উদগ্র সপ্তাশীতি গম্বুজের চুড়ায় চুড়ায় উড্ডয়মান শুভ্র কেতন, হাতিশালের হাতি, ঘোড়াশালের ঘোড়া, বন, মাঠ, প্রান্তর…………….., এমনকি স্ফটিক জলে পাল তুলে ভেসে যাওয়া সপ্ত ডিঙ্গায় আলসে আলুলায়িত অনিন্দ্যসুন্দর রাজকন্যাকে খুঁজে পাওয়াও খুব দুঃসাধ্য কিছু নয়। উষ্ণতার খোঁজে দক্ষিণের অভিযাত্রী উড়ে যাওয়া বুনোহাঁসেরাই শুধু সময় সময় উচ্ছল কুজনে অভ্রাধৃত এই আয়ত অসিতোপল ক্যানভাসের কিছুটা হলেও দখলে নেবার প্রচেষ্টা চালায়। আকাশের গায়ে মেঘের গড়া এই অনুপম কাঞ্চন মুলুকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবারো অনুভবে আসে সেই মন্থর হৈমন্তী সুরটা, এবার মুলতানি রাগে আলাপ শুরু হয় হৃদয় যন্ত্রিতে, কথাগুলো তার এখন যেন আরো অস্পষ্ট, আরো দুর্বোধ্য……………।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.