স্মরণীয় তুমি, বরণীয় তুমি

0

Pritilotaউইমেন চ্যাপ্টার: আজ ২৪শে সেপ্টেম্বর, মাস্টারদা সূর্যসেনের অন্যতম সহযোগী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের প্রয়াণ দিবস। ১৯৩২ সালের আজকের এই দিনে তিনি সহযোগীদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে ব্রিটিশদের হাতে ধরা না দিয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মত্যাগ করেন। আজকের এই দিনে মহান এই বিপ্লবীর প্রতি লাল সালাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলী।

মাতৃভূমিকে ইংরেজ শাসকদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্যে যারা জীবন দিয়েছিলেন, প্রীতিলতা তাদেঁর অন্যতম, প্রথম নারী শহীদ। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামে জন্ম নেন তিনি।

প্রথম জীবনে তৃতীয় শ্রেণীতে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল নিজ শহরের ডাক্তার খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে। প্রতিটি ক্লাসেই অদম্য মেধার পরিচয় দেন তিনি। এখান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা শেষে ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি করা হয় তাঁকে। ১৯২৯ সালে আইএ পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে কুড়ি টাকার বৃত্তি পান। এরপর কলকাতার বেথুন কলেজ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিস্টিংশনসহ পাস করেন বিএ পরীক্ষায়। পাসের পরই তিনি ঢুকে যান কর্মজীবনে। যোগ দেন নন্দনকানন অপর্ণাচরণ মধ্য ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে।

তবে আন্দোলনের সাথে হাতেখড়ি ঢাকার ইডেন কলেজে থাকতেই। এসময় তিনি বিপ্লবী সংগঠন ‘দিপালী সংঘ’ এর সাথে যুক্ত হোন। এই সংগঠনই তাঁকে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যায় যুগপত আন্দোলনের মাঠে, গড়ে তোলে অসম সাহসী ও বিপ্লবী হিসেবে। বেথুন কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্রী সংঘের সদস্য হন। এরপর বিপ্লবী চারজন মেয়ে ও অন্য আরও কয়েকজনকে নিয়ে একটি চক্র গঠন করেন।

১৯৩০ সালে বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্ব চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরিকল্পনা হলে কলকাতার গোপন কারখানা থেকে বোমা বানানোর খোল আনানোর জন্য প্রীতিলতার ওই চক্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়। বেশ সাফল্যের সাথেই প্রীতিলতা সেই কাজটি করেন। এসময় প্রীতিলতার সামনে কেবলই একের পর এক ঘটনা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, জালালাবাদ সংঘর্ষ এবং এতে নিহত হন তাঁর খুব কাছের একজন দাদা। বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে ফাঁসি দেয় ইংরেজরা। এসব ঘটনা প্রীতিলতাকে দেশের প্রতি আরও বেশি সাহসী, ঋজু, দৃঢ়চেতা করে তোলে। তিনি মরীয়া হলে সরাসরি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

বিএ পরীক্ষা দিয়ে চট্টগ্রামে ফিরে এসে সাক্ষাত হয় মাস্টারদার সাথে। দিনটি ছিল ১৯৩২ সালের ১৩ জুন। স্থানটি ছিল বিপ্লবীতেদর অন্যতম কেন্দ্র ধলঘাটের গোপন ঘাঁটি। সেখানে প্রীতিলতা তার ইচ্ছার কথা জানান মাস্টারদাকে। কিন্তু পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ধলঘাট ঘিরে ফেললে প্রীতিলতা ও মাস্টারদা কোনরকমে পালিয়ে বাঁচেন। কিন্তু ধরা পড়ে যান বিপ্লবী নির্মল সেন। তবে মরার আগে তিনিও একজন ইংরেজকে মেরে যান।

এই ঘটনার পর প্রীতিলতা চট্টগ্রাম ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করার নির্দেশ পান। ওই ক্লাবের গেটের পাশে রেখা ছিল, ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’।

আক্রমণের তারিখ নির্ধারণ হয় ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বেশ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন তিনি। নিজের হাতে একটি বিবৃতি লিখে পোশাকের পকেটে রাখেন, আরও ছিল পটাশিয়াম সায়ানাইড, জান দেবো, তবুও শত্রুর হাতে ধরা পড়বো না, এই ছিল তখনকার বিপ্লবীদের মূলমন্ত্র।

রাত ১০টার দিকে সব ঠিকঠাক। খাকি পোশাকে শুরু হয় অভিযান। সফলভাবে অভিযান শেষ করে হতাহত ও বিপন্ন ইংরেজ নর-নারীদের আর্তনাদে ক্লাব যখন ভারী, তখন পাশের এক রেললাইনের বড় সড়কে এসে আরও পাঁজ বিপ্লবীর সাথে দাঁড়ান প্রীতিলতা। কিন্ত বিধিবাম! প্রাণভয়ে নালার মধ্যে আশ্রয় নেওয়া একজন ইংরেজ তখন গুলি ছুঁড়লে সেই গুলি লাগে প্রীতিলতার বুকে। কিন্তু জ্ঞান হারাননি। এও জানতেন যে, কিছুতেই ধরা পড়া যাবে না। পকেটে রাখা পটাশিয়াম সায়োনাইড খেয়ে মারা যান কিংবদন্তীতূল্য এই মহান নেত্রী।

একমাত্র পোস্টমর্টেম করতে গিয়েই ধরা পড়ে তিনি একজন নারী ছিলেন। আর সাথে থাকা বিবৃতিটিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়েছ যে, আমার দেশের ভগিনীরা আজ নিজেকে দুর্বল মনে করিবেন না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন, এই আশা লইয়াই আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম’।

প্রীতিলতা মারা যাওয়ার আগে মায়ের কাছে লিখেছিলেন, ‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উত্সর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?’

প্রীতিলতা যুগ-যুগান্তর বেঁচে থাকবেন আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন-সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে। স্যালুট সংগ্রামী এই নারীকে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.