জাগো মহাশ্রমণ বাংলার অতীশ দীপঙ্কর

ramuঐ চলে মহা শ্রমণের দল, পার্বত্য মহানৈঃশ্বব্দ পথে, বৃক্ষের ছায়ায়-ছায়ায় অহিংসার মহাজাগতিক আলোকবর্তিকা ছড়াতে ছড়াতে। তাঁদের পেছন পেছন চলেন হিংসাশ্রয়ী আর্যবীর সম্রাট অশোক। গৌতমের ধর্ম গ্রহণ করে, আজ সে অহিংসার প্রতিভূ। মহামতি বুদ্ধের  মহিমায় তাঁর হিংসাশ্রয়ী হৃদয়ে লেগেছে প্রেমের শীতল চন্দনের প্রলেপ।
ঐ চলে জ্ঞানী ভিক্ষুর দল, তালের পাতায় পাতায় বর্ণনা করেন মানুষের দুঃখের কারণ, কিংবা জানান দিয়ে চলেন অজানা কোনো জগতের খবর। জন্মেই দুঃখি মানুষকে দুঃখমুক্ত আলোময় জগতের সন্ধান দেওয়াই তাঁদের মহাজাগতিক পরিভ্রমণের উদ্দেশ্য। সেখানে আছেন মহাশ্রমণা সুজাতা, দুগ্ধ আর ধান্য বীজের সংমিশ্রণে, সংযমের অগ্নিতাপে তিনি তৈরি করেন পবিত্র পায়েসান্ন, যা ভক্ষণে নির্বাণ লাভের মাধ্যমে দুঃখকে জয় করা যায়।
ঐ চলেন মহাশ্রমণ বাংলার অতীশ দীপঙ্কর। দুঃখ-মুক্তির জ্ঞানভাণ্ডার বুকে নিয়ে, পর্বত থেকে পর্বতে। প্রতিটি বৃক্ষ-লতা, কীট-পতঙ্গ, জীব-জন্তুকে সাক্ষী রেখে, মানুষ নামক প্রাণীর অন্তরে আলোক রশ্মি ছুঁইয়ে দেবার মানসে।
ঐ চলেন শান্ত-সৌম্য শ্রমণের দল, তাঁদের ঘামের গন্ধ পরিণত হয় প্রেমময় চন্দনের সুবাসে। হৃদয়ের প্রেম ভর করে তাঁদের হাতের বাটালি ও কুঠারে। পরম যতেœ, পরম নিষ্ঠায়, পরম প্রেমে, রাত্রি-দিন পরম অধ্যাবসায় তাঁরা নির্মাণ করেন মহামতির বিগ্রহ। ধ্যানস্ত সেই বিগ্রহ, আননন্দময় করে তোলে তাঁদের শ্রমময় দিন-রাত্রিকে। কালে-কালে নিরবে নিভৃতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় মহামতির বিগ্রহে…আলোকিত হয় মানবাত্মা।
কিন্তু হায়, সে আলো আজ কোথায় হারালো! আমাদের অন্তরের নিজস্ব অন্ধকার, যে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে, সে আঁধারের উন্মত্ততায়, চাঁদের আলোয় হিংস্রতায়, আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছি অহিংস আলোকিত মহামতি বুদ্ধের উপর। এই নিজস্ব অন্ধকার, ক্রোধ ও হিংসা থেকে আমাদের, কে রক্ষা করবেন ? জ্বলে যায় তাল পাতার পুঁথি আমাদের পূর্ব পরুষের ভাষা, আমাদের সভ্যতার ইতিহাস, মহাপৃথিবীর অহিংসার প্রতিক মহামতির বিগ্রহ। কোথায় মহাশ্রমণ সম্রাট অশোক, তুমি কি শুনতে পাওনা.. বুদ্ধের ধর থেকে মস্তক ছিঁড়ে চূর্ণ করার শব্দ ? কোথায় তোমার তরবারি, তুমি জাগো, আমার তরবারিতে আমাদের হিংসাকে হত্যা করে আমাদের পবিত্র করো, আমাদের মুক্তি দাও।
আমরা আজ আশ্রয়হীন অসহায়, আমরা কোথায় যাবো মানবতা ভিক্ষার তরে ? আমাদের প্রশাসন অন্ধ ও বধির। আমার শান্তির ধর্মের মানুষ, হিংস্র ,ক্রদ্ধ, ধর্মান্ধ, দাবার গুটি হয়ে এক মহান্ধকারে নিমজ্জিত। আর আমাদের রাজনীতি, আদিম হিংস্রতায় একদল আরেক দলের দিকে উদ্যত, শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ার একে অপরের দিকে ছুঁড়ে মারার মহা উল্লাসে মত্ত। নিজেদের মানবিক দায়টুকুও তারা আজ বিস্মৃত। রাতের অন্ধকারে আক্রান্ত, প্রাণভয়ে ভীত অসহায় মানুষের আর্তনাদ, তাদের কাছে পৌঁছুবে কেমন করে !
এমন অহম তমসায়, বাংলার মহাজ্ঞানী অতীশ দীপঙ্কর কোথায় তুমি… জাগো, দেখো, তোমার বাংলার জ্ঞানভাণ্ডার আজ দুর্বৃত্তের হিংসায় খাক হয়ে যায়। বাংলার হৃদয় আজ শতখণ্ডিত অন্ধকারাচ্ছন্ন, এই অন্ধকারের গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসে শ্বাপদ-ন্যায় মানুষরুপি জানোয়ার। তারা অবলীলায় ধবংস করে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, মানবিকতা। তাদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করো। আজ এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে, তোমাদের কে আহ্বান করা ছাড়া আর কীই বা করতে পারি আমরা? আমরা আজ অসহায়, আশ্রয়হীন। তোমরা জাগো, আমাদের নিজস্ব অন্ধকার, লোভ, ক্রোধ, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতা থেকে আমাদের রক্ষা করো। মহামতি বুদ্ধের দোহাই, তোমাদের আলোয় আবার আমাদের আলোকিত করো, পবিত্র করো, আমাদের ক্ষমা করো, আমাদের পথ দেখাও, আমাদের মানবজন্ম মানবিক হোক….
[divider]
৪ অক্টোবর ২০১২
লেখক পরিচয়:sadhona
সাধনা  আহমেদ
নাট্যকার

(২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার প্রতিক্রিয়ায়)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.