অবনীর দিনকাল

diary-001সুমন্দভাষিণী
প্রতিদিনের মতো আজও ঘুমাতে যাওয়ার আগে হাতব্যাগটা দেখতে ভুললো না অবনী। টাকাগুলো গুণে রাখা তার অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে আজকাল। দিন যত যাচ্ছে, ব্যাগটার ওজন ক্রমেই কমছে। শীর্ণ থেকে শীর্ণকায় হচ্ছে ব্যাগের আয়তন।
‘কীভাবে যে চলবো?’ ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। হেঁটে পাশের ঘরে গিয়ে দেখে আসে তার টিনএজ ছেলেকে। এবছরই তার ও লেভেল পরীক্ষা দেওয়ার কথা। কিন্তু ইন্টারনেট গেম নিয়ে সারাদিন-রাত মেতে থাকে বলে পরীক্ষার কথা মনে হলেই অবনীর হাত-পা অবশ হয়ে আসে। প্রতি রাতের মতো আজও সে তাগাদা দিয়ে আসে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে, কাল সকালে কোচিং আছে।
শূন্য বিছানায় ফিরতে ফিরতে অবনী ভাবে, ছেলেটা কি কোনদিন মানুষ হবে না? কোনদিন কি সে তার এই একাকি মায়ের কষ্ট বুঝতে পারবে না? এই মাসেই কোচিংয়ের টাকা শোধ করা সম্ভব হয়নি, আগামী মাস থেকে তো টিচাররাই ওকে ক্লাশে যেতে না করে দেবে। তখন? ছেলেটার মন কি তখন ভেঙে যাবে আবারও?
ছেলের ক্লাশ সেভেন থেকে এইটে ওঠার সময়ও এমন একটি পরিস্থিতি হয়েছিল অবনীর, চাকরি ছিল না। ফলে পুরো ছয় মাস বাসায় বসে থাকতে হয়েছিল ছেলেকে। সেই থেকে ছেলের মন থেকে পড়ার আগ্রহ একেবারেই উবে গেছে, অবনী বুঝতে পারে। কিন্তু কীই বা করার ছিল তার? মেয়ে তখন এ লেভেল দেবে। তার পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে গিয়ে অনেকটা নিরুপায় হয়েই ছেলেকে বসিয়ে দিতে হয়েছিল। সেইসময় যে টাকা ঋণ হয়েছিল, এখনও তা পুরোপুরি শোধ করা হয়নি।
তিন বছর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আবারও একই অবস্থা, ব্যাগ খালি হচ্ছে প্রতিদিন। বাজারের তালিকা ছোট থেকে ছোট হচ্ছে। কোনরকমে ছেলের পছন্দের খাবারটা রান্না সম্ভব হয় এখনও। কদিন পর কী হবে তা ভাবতে গেলেই মাথা ঘুরিয়ে যায় অবনীর। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। পরীক্ষায় বরাবর প্রথম-দ্বিতীয় হওয়া অবনী বিদেশ থেকে পড়া শেষ করে এসে আপাদমস্তক সাংবাদিক হতে চেয়েছিল বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, এটাই কি তার অপরাধ ছিল?
পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, এই অবনী আসলে কে? ধরে নিন, অবনী একজন নারী, যার বয়স ৪৫ বছর। বাংলাদেশে বলা হয়ে থাকে, বয়স হলে মেয়েরা অকেজো হয়, আর পুরুষরা অভিজ্ঞ হয়। তাহলে কি অবনী এই বয়সের গেঁড়াকলে পড়ে গেল? কিন্তু নাতো।
আরেকটু পিছনে তাকাই। আজ থেকে ১৬ বছর আগে অবনী বিদেশ থেকে ফিরে যখন কাজ শুরু করে, তখন কম মেয়েই সাংবাদিকতার পেশায় ছিল। একটি স্বনামধন্য পত্রিকায় কাজ শুরু করে সে। কিন্তু দুটি বাচ্চা নিয়ে একাকি মায়ের পক্ষে পত্রিকার সামান্য বেতনে সংসার চালানো সম্ভব হয় না। অবনী তখন অন্য কাজের খোঁজ করে। পেয়েও যায় আশাতিরিক্ত কিছু। একটি আন্তর্জাতিক রেডিওতে পার্ট টাইম কাজের সুযোগ হয়।
জীবনের চাকা দ্রুত বদলায়। সেইসাথে বদলায় দৈনন্দিন রুটিন। সকাল ছয়টায় বাসা থেকে বেরিয়ে রেডিও অফিস, পত্রিকা অফিসের কাজ সেরে বাসায় ফেরে রাত ১২টায়। বাচ্চা দুটোর বয়সের ব্যবধান পাঁচ বছর। সকালে বের হওয়ার সময় তাদের শুয়ে থাকতে দেখে, রাতে ফিরেও একই অবস্থানে তাদের দেখতে পায় অবনী। বাসার কাজে সহায়তাকারীরাই তখন অবনীর জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ। সন্তান বাৎসল্যে ভরপুর অবনী মাঝে মাঝেই বাথরুমে ঢুকে পানি ছেড়ে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদে। কেউ শুনতে পায় না সেই কান্না। কেউ দেখতেও পায় না।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনটাও সে পায় না। আগের দিন পত্রিকা অফিসে সকালে ডিউটি নেয় সে। বিকেলে কাজ শেষ করে রাতের বাস ধরে ঢাকার বাইরে যাওয়া, পরদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রেডিও’র জন্য রিপোর্টিং করা, তারপর আবার রাতের বাস ধরে ঢাকায় ফেরা….এভাবেই চলে পাঁচ-ছয় বছর। দিন গড়িয়ে যায়। বাচ্চারা নিজের মতো করেই বড় হয়ে উঠে, তবে শারীরিকভাবে, মানসিক নয়। মনের জগতে তাদের ঘাটতি সহজেই চোখে পড়ে অবনীর। এজন্য দীর্ঘ নি:শ্বাসই হয় একমাত্র সম্বল।
তারপরও পেশাগত জীবনের স্বস্তি, আনন্দ অবনীকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে সবসময়। এই দুই কাজের ফাঁকে আরও দু-চারটে নানান ধরনের কাজ চেয়ে-চিন্তে আনে বিভিন্ন সংস্থা থেকে। তাতে কিছু বাড়তি রোজগার হয়। অবনী বিলাসী মেয়ে নয়। কষ্টের আয়ের সবটুকুই সে ব্যয় করে  বাচ্চাদের পিছনে। এতোকিছু করেও মাস শেষে হাতে জমে না তেমন একটা।
বরাবরই স্বাধীনচেতা অবনী জীবনে পোড় খেতে খেতে আরও অনমনীয় হয়ে উঠে। তার এই চলাফেরা, ঘরে-বাইরের সাফল্য সহকর্মীদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে। আসে বিশাল একটা আঘাত, পেশাগত জীবনে। ক্রমেই তারা সম্পাদকের কান ভারী করে, ব্যবস্থা করে বাইরের কাজগুলো ছাটিয়ে দিতে। হঠাৎ কাজ হারিয়ে সংসার অচল হয়ে পড়ে তার, খুব অসহায় বোধ করে। একসময় সহকর্মীদের ঈর্ষা আরও বাড়ে, অবনী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়।
সেই থেকেই শুরু হয় অবনীর ছন্দোময় জীবনে ছন্দপতনের পালা। এই চাকরি থেকে ওই চাকরি, আজ এই কাজ তো, কাল সেই কাজ, কোথাও থিতু হতে পারে না। অনলাইন, ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া হয়ে টেলিভিশনের সাথে যুক্ত হয়। খুব সহজেই সে আয়ত্ত করে নেয় ভিজ্যুয়াল মিডিয়াকে। কিছুদিন ভালো থাকে। কিন্তু এখানেও দীর্ঘস্থায়ী হয় না এই ভালো থাকা। কিছু মানুষ তার পিছনে লাগে, তাকে যোগ্য স্থানটি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন কর্তৃপক্ষ।
জীবনের প্রতিটি ধাপে বার বার হোঁচট খেয়ে খেয়ে অবনী ক্ষুব্ধ হয়, প্রতিবাদী হয় তার মন। সমাজ-রাষ্ট্রের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এসবকিছু নিয়েও ভাবে সে। অবনী যখন ভাবে দেশ নিয়ে, দেশের মঙ্গল নিয়ে, তখন সে জানে না তারই অজান্তে শাণিত হচ্ছে তার প্রতিপক্ষরা। আবারও ছিটকে পড়ে সে। এবার আর কোথাও জায়গা হয় না তার। কারণ এতোদিনে সবাই জেনে গেছে, অবনী কোনো গ্রুপের না। গ্রুপিং-লবিং ছাড়া যে সমাজ অচল, সেখানে অবনীর মতো মানুষের বিচরণ ক্ষেত্র কেটে ছোট করা হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

আস্তিক বা নাস্তিক কোনোটাই নয় অবনী। তারপরও সে একটা ঠিকানা খোঁজে জীবনের এই প্রান্তে এসে। জীবনভর অসম্ভব রকমের লড়াই চালিয়ে যাওয়া অবনী স্রষ্টার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেদিনের মতোন বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। স্বপ্ন দেখে একটি সুন্দর-নতুন ভোরের, কর্মময় জীবনের।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.