শাহবাগ আন্দোলন ও কালা আইনের গেঁড়াকল

sahbaghaসুপ্রীতি ধর: আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, শাহবাগ আন্দোলন থেকে আমরা কি পেলাম? এখন কোথায় সবাই? কি করার পরিকল্পনা? অনেক প্রশ্ন। উত্তরটাও খুব সোজা। যা পেয়েছি তা লিখে শেষ করা যাবে না। এটা অনুভবের বিষয়। কারণ এই এক আন্দোলনের ফলে আমরা কত মানুষকে চিনলাম-জানলাম। কত মানুষ জীবন থেকে বিয়োগ হয়ে গেল, যোগ হওয়ার সংখ্যাও কম না।

….একটা আন্দোলনের কারণে দেশে গত পাঁচ-ছয় মাসে যা ঘটলো, তা কিন্তু পুঞ্জীভূত সমস্যারই বহি:প্রকাশ। দেশে এতোবছর ধরে যে কালসাপ দুধ-কলা দিয়ে পুষে রাখা হয়েছিল সেই শাহবাগের কারণে তার বিষদাঁত বের করেছে কেবল। এটা নিয়েও অনেকে বলেন, কী দরকার ছিল? ওরা তো শান্তিমতোই ছিল, কাউকে কিছু করছিল না। শুধু শুধু জামায়াতের বিরুদ্ধে গিয়ে এই সর্বনাশ নাকি শাহবাগই ডেকে এনেছে। আমি তাদেরকে বলি, আজ হোক, কাল হোক, এই সর্বনাশ হতোই। শাহবাগ কাজটাকে এগিয়ে দিয়েছে, এইটুকুই। যে সর্বনাশের বীজ বপন করা হয়েছে গত ৪২ বছরে, তা আজ মহীরুহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে, ঘরে-ঘরে, এমনকি বিদেশ-বিভূঁইয়েও। সেই গাছটাকে উপড়ানো কি এতোই সহজ, এমন প্রশ্নও অনেকের। সহজ নয় জানি, কিন্তু তাই বলে চেষ্টাও করবো না? এরইমধ্যে তো উপড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েই গেছে, দেখা যাক না! মহীরুহ যদি নিজে থেকেই শেকড়-বাকড় ছাড়াতে শুরু করে, তাহলে তো সোনায়-সোহাগা।

…এই যে আরিফ নূর আজ শিবিরের চাপাতির কোপ খেয়ে হাসপাতালে, সেটাও তো এই আন্দোলনেরই ফল। যারা বলেন, আন্দোলন তো সেই কবেই শেষ, আমি তাদের বলবো, যদি শেষই হবে, তাহলে আরিফ-তন্ময় কেন চাপাতির কোপ খায়? কেন ছেলেরা বাড়িতে ফিরতে ভয় পায়, বাড়িতে গিয়েও দুদণ্ড শান্তি পায় না, জিডি করতে হয়? এই যে, শুভ-রাসেল-আসিফরা কেন শান্তি পেল না? কেন তাদের জন্য নতুন আইন বানাতে হলো? কেনই বা তাদের হয়রানির চরম রূপ দেখতে হচ্ছে? ওরা তো কাউকে মারেনি, ধরেনি, একটা আঁচড়ও দেয়নি। তবে কেন? শাহবাগকে এতোই ভয় সবার?

…একটা অহিংস আন্দোলন কেন এতোগুলো মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুললো? আন্দোলন যখন চাঙ্গা, তখন লাখ লাখ মানুষ এসেছে, জমায়েত হয়েছে, মনের ক্ষোভ ঝেড়েছে, প্রতিবাদ জানাতে পেরে শান্তি পেয়েছে, একসময় ফিরেও গেছে। তারাই আজ হতাশার সুর ছড়াচ্ছে বেশি করে। আর যেসব ছেলেরা সেইসময় এই আন্দোলনটাকে জোরদার করলো, তারা আজ এতোদিন পরও প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্বাভাবিক-স্বচ্ছন্দ জীবন তাদের আজ নেই।

…কতজনের চাকরি গেল, কতজনের চাকরি আর কখনও হবেই না এই আন্দোলনে থাকার কারণে, কেউ বলতে পারে? জীবনের মানেটাই তো বদলে দিয়েছে এই আন্দোলন। অথচ আমরা যারা শুরু থেকে আজও আছি, আমরা জানি এর নাড়ি-নক্ষত্র। কোথাকার জল কোথায় গড়িয়েছে বা গড়াচ্ছে, সবই আমাদের নখদর্পণে। এই এক আন্দোলনের কারণে আমরা মেয়েরা যারা শাহবাগে যাই বা গেছি, সেই মেয়েদের হেয় করতেও ছাড়েনি তথাকথিত সুশীল-কুশীলেরা। লেখা হয়েছে গল্প, যে গল্পের শেষ এখনও দেখলাম না। অথচ আমরা এতোটাই অহিংস আর নীতিবান যে, সেই গল্পকার-প্রকাশকদেরও ছেড়ে দিয়েছি। তারা কিন্তু ছাড়েনি, বলে দিচ্ছি, সময়মতো আবারও তাদের দাঁত বের হবে, আবারও ছিন্নভিন্ন হবে আমাদের দেহ-মন। আমাদের কৌশলে ভুল ছিল, নইলে প্রতিপক্ষ চিহ্নিত হওয়ার পরও কি করে সুশীলের লেবাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়, খায়-দায়, মৌজ করে! অথচ আমরা থাকি অশান্তিতে, রীতিমতো কলংকিত হয়ে!

কোন কোন সময় মনে হয়, আমরা নিজেরাই আসলে চিহ্নিত হয়ে গেলাম সংখ্যাগুরু প্রতিপক্ষের কাছে, তাই একের পর এক খড়্গ নেমে আসছে আমাদেরই ওপর, অথচ যাদের আমরা চিহ্নিত করে দিলাম, তারা এখন তলে তলে তাল মেলায়। তাদের খুশি করতে সরকারি-বিরোধী দল সবাই ব্যতিব্যস্ত। হেফাজতের উত্থান, ঢাকায় তাদের মহাঅবস্থান, জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা-নিধন এতো সবকিছুর পরও তারা বহাল তবিয়তে থাকে। কোরআন শরিফ পুড়িয়েও তারা পার পেয়ে যায়। আর আমরা এতো সবকিছুর ধারে-কাছে না গিয়েও লোহার গরাদে থাকি, অনিশ্চয়তায় কেটে যায় একেকটি জীবন। যে জীবনে স্বপ্ন ধরা দেয় না, সুখ হয়ে উঠে কুষ্ঠ রোগের মতোন অস্পৃশ্য।

four_blogger…বলছিলাম, রাসেল-শুভ-বিপ্লব ও আসিফদের কথা। ওদেরকে শাস্তি দিতে একটা কালা আইন বানানো হয়েছে। কিছুই লেখেনি বা কিছু লিখেছে, সেই দ্বন্দ্বে থেকেও সরকার একটা গোষ্ঠীকে খুশি করতে ওদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। তথ্য ও প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এর ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে-‘১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্যকোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে , দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎপথে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে , আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভবনা সৃষ্টি হয় , রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয় , তাহলে তার এই কার্য হবে একটি অপরাধ । ২) কোন ব্যক্তি এরূপ অপরাধ করলে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন ।’….এই যে একটা খড়গ ওদের ঝুলিয়ে দিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এই সরকার, ওরা পার পাবে তো? ওদের মুখের দিকে আজকাল তাকানো যায় না। কী এমন লিখেছে তারা? আমরাও তো অল্পবিস্তর লেখাপড়া জানি, পড়তে পারি। তারাও পড়েছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যা পড়ে তাদেরকে গরাদের ভেতর রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন, সেই তাদের পড়ার সাথে আমাদের পড়ার এতো গরমিল কেন? দেশের আপামর মানুষ যখন বলে, তারা আকথা-কুকথা লিখেছে, আমরা কেন তখন ওদের লেখায় শুধুই সাহিত্যমান খুঁজে পাই? এই পার্থক্যটা তৈরি করে দিয়েছে কোন শিক্ষা ব্যবস্থা? যারা এদেশের সবকিছু (ভাল-মন্দ) থেকে গা বাঁচিয়ে চলে, আখের গোছায়, তারাও তো ওই সংশ্লিষ্টদেরই দোসর। আমাদের সাথে তাদেরও যে যোজন যোজন দূরত্ব!

….সংশোধিত তথ্য প্রযুক্তি আইনকে বলবৎ হতে দেওয়া যাবে না। আজই যদি আমরা কেউ এই আইনের প্রতিবাদ না করি, তবে ভবিষ্যতে এটিই আমাদের জন্য বুমেরাং হয়ে আসবে। আমি-তুমি-আপনি কেউ বাদ যাবো না। একটা সময় হয়তো আসবে, আমরা কেবলই বোবা হয়ে ঘুরে বেড়াবো তাসের দেশের মতোন, আমাদের কোন বক্তব্য থাকবে না, আমাদের রক্ত আর গরম হবে না, প্রতিবাদ-অন্যায় কি জিনিস তাও ভুলে যাবো।

…তবে আশার কথা যে, শাহবাগের আন্দোলন আর শাহবাগে নেই, তা ছড়িয়ে গেছে ঘরে ঘরে। আমরা না হয় এক ধরনের অস্বস্তি আর অশান্তিতে আছি, যাদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন, সেই তারাও কি শান্তিতে আছে? যতোই কেউ তাদের পক্ষ নিক না কেন, আমি নিশ্চিত, তাদের ঘরও জ্বলছে। একদিন এই আগুনে পুড়েই শেষ হবে সবকিছু।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.