তালিবানের দেশে

0

Taliban-Sushmitaসুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়: ছেলেবেলার জুজু? অমানুষ? আমার কোনও ধারণাই ছিল না। বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে, প্রেমে পড়ে বিয়ে করেছি কাবুলিওয়ালাকে। সাহস? হ্যাঁ, তা একটু ছিল বইকী। ডাকাবুকো না হলে ভিন দেশের, ভিন্ন সংস্কৃতির জামবাজকে কি বিয়ে করতে পারতাম?  তা ছাড়া, কাবুলিওয়ালা সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই বিস্ময় এবং ভীতি আর পাঁচটা মেয়ের মতো আমারও যে একেবারেই ছিল না তা নয়। জামবাজ আফগানিস্তানের মানুষ। কলকাতাতে জামবাজের কয়েকজন বন্ধু ও কুটুমের সঙ্গে মেলামেশাও করেছি। যত মিশেছি, তত বুঝেছি এরা নেহাতই সরল সোজা ভালমানুষ। টাকা সুদে খাটানোর মধ্যে কোনও পাপ আছে বলে এরা বিশ্বাস করে না। এও আর পাঁচটা পেশার মতোই। কিন্তু, জামবাজরা তো আফগান, শুধুই আফগান। তালিবান নয়। কাজেই প্রথম যখন আফগানিস্তানের রুক্ষ মাটিতে ‘তালিবান’ শব্দটা শুনলাম, ভাল বা মন্দ কোনও প্রতিক্রিয়াই হয়নি।

বছর সাতেক আগের ঘটনা। জামবাজের দেশ কাবুলে এসে আটকা পড়েছি। আছি প্রায় বন্দিনী হয়ে। ক’দিন বাদেই শুরু হল রোজা। সেই সময় একদিন হঠাৎ শুনলাম, ‘‘মসজিদে তালিবানদের জন্য আজ আমাদের খাবার দেবার পালা।’’ এর আগে একটু কানাঘুষো শুনেছি, তালিবানরাই এখন দেশের হর্তাকর্তা হয়ে উঠেছে। তার যে কী মর্ম, তা অবশ্য জানতাম না। শুধু দেখলাম, হুকুম পেয়ে জামবাজদের বাড়ির সবাই একেবারে ভয়ে তটস্থ। যাতে পান থেকে চুন না খসে। মেনু নিয়ে তাই গবেষণার শেষ নেই। নিজেদের হাল যাই হোক, তালিবানরা যেন খেয়ে খুশি হয়।

স্বাধীন দেশের নাগরিক আমি, এ রকম একুশে আইনে গা পিত্তি জ্বলে গেল। শাশুড়ি আর ভাসুরকে বললাম, ‘‘আমি রাঁধব— মাংসের কোরমা।’’ এই সুযোগে একটু নিজের সুখ্যাতি করে নিই। পুত্রবধূ হিসেবে আমাকে পছন্দ হোক বা না হোক, হাতের রান্না দিয়ে গোটা পরিবারের মন ইতিমধ্যে আমি জয় করে নিয়েছি। তাই প্রস্তাব শোনা মাত্র ওরা লুফে নিল।

এখানে একটা কথা প্রকাশ থাকুক, তালিবানদের সম্পর্কে আমার মনে একটা ভরসাও কাজ করছিল। যেহেতু ওদের প্রবল প্রতাপের কথা শুনেছি, তাই হাতের রান্না দিয়ে একটু বশ করতে চাইছিলাম। সেই সময় আমার মনে একটাই স্বপ্ন— যেভাবেই হোক, আফগানিস্তান থেকে পালানো। পালিয়ে দেশে ফিরে আসা। যাঁরা আমার ‘কাবুলিওয়ালার বউ’ পড়েছেন, তাঁরা আমার বন্দিজীবন সম্পর্কে অবগত আছেন। মাংসের কোরমা রান্নার পিছনে আমার ষড়যন্ত্রটা ছিল এই— ও রান্না খেয়েই তালিবানরা বুঝবে এ কোনও আফগান মেয়ের হাতের রান্না নয়। তখন ওরা খোঁজ করতে পারে— মেয়েটা কে ?  আর আমিও একটা সুযোগ পেয়ে যাব জানানোর আমি কে, কী অবস্থায় আছি ইত্যাদি। আসলে, মরুভূমিতে মরূদ্যান খুঁজছিলাম আমি। তালিবানরাই আমার সেই মরূদ্যান। একবার যদি ওদের হৃদয় জয় করতে পারি, তা হলে আমার দেশে ফেরা ঠেকায় কে ?

হায়, হৃদয়! তখনও তো জানি না ওই বস্তুটি কঠোর পুরুষদের এই দলের কারওই নেই। আশ মিটিয়ে উদরপূর্তি করেছিল তারা। রাঁধুনিরও খুব প্রশংসা হয়েছিল। কিন্তু, ওই পর্যন্তই। রান্না যে একটা সংস্কৃতি, আর তাকে ঘিরে ভিন দেশি রাঁধুনির খোঁজ পড়বে, এমনটা আশা করাই ভুল হয়েছিল। অত সূক্ষ্ম কৌতূহলের ঠাঁই নেই তালিবান-মনে।

আমার উদ্ধার কার্যে যারা দেবদূতের ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে ভেবেছিলাম, অবশেষে তাদের দেখা পাওয়া গেল। সেই একবারের দর্শনেই কেটে গেল আমার সব ভুল। নিজের মনে নিজেকে ধিক্কার দিলাম— অজ্ঞতার জন্য, শয়তানকে দেবদূত ভাবার জন্য। গজনির সেই ভয়ঙ্কর সন্ধের কথা জীবনে ভুলতে পারব না। এখনও হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠি।

কী ঘটেছিল সেদিন ?  আমার খুড়তুতো দেওরের বিয়েতে বাড়িসুদ্ধ সবাই গিয়েছিলাম গজনিতে। রফিকচাচার ছেলের বিয়ে। মনে আছে, সেখানেই প্রথম দেখলাম হাতে গড়া রুটি কত বড় হতে পারে। দেখলাম ঘিয়ে ডোবানো ডিমের পদ, লস্যির মতো অদ্ভুত একটা পানীয়ও রয়েছে অতিথি আপ্যায়নের জন্য। বাড়িতে উৎসবের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা সেজেছে যে যেমন ভাবে পারে— তাতে রঙের একেবারে বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। কেউ একটা গান করছিল, মনে আছে। এমন সময় হঠাৎ হানা দিল তালিবান বাহিনী।

কী চায় তারা ?  আমি মনে মনে ভাবলাম, এখানেও হয়তো তারা এসেছে রসনা তৃপ্ত করতে। ভুল ভেবেছিলাম। তারা চিৎকার করে উঠল— ‘‘সিদ্দিক কোথায় ?  শিগগির বের করে দাও। না হলে ঘাড়ে মাথা রাখব না।’’

সবাই তো আকাশ থেকে পড়ল। রফিকচাচার মুখ ছাইয়ের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করার মতো সাহস নেই, কেন, সিদ্দিক কী করল?  ছেলেটা একটু একরোখা ঠিকই, কিন্তু সে তো ন্যায়-নীতির প্রশ্নে। জীবনে একটা পিঁপড়ে পর্যন্ত মারেনি সে। এ হেন সিদ্দিক কী করে তালিবানদের শত্রু হল ?  এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেশি পরিশ্রম করার দরকার নেই। তালিবানদের অভিধানে শত্রু শব্দটা বহু দূর প্রসারিত। শত্রু হওয়ার জন্য বিরোধিতারও দরকার হয় না। যে সমর্থন করছে না, সে-ই শত্রু, তালিবানি কাণ্ড-কারখানা সম্পর্কে নিস্পৃহ থাকাটাও যেন শত্রুতার মধ্যেই পড়ে।

সিদ্দিক একটু প্রগতিশীল টাইপের ছেলে। সে বিশ্বাস করে মেয়েদের লেখাপড়া করাটা দেশের স্বার্থেই খুব জরুরি। সে আরও বিশ্বাস করে যে, দেশে কল-কারখানা স্থাপন, চাষবাসের উন্নতিই সব চেয়ে জরুরি কাজ। ধর্মের নামে যা চলছে, আফগানরা তাতে শুধুই পিছিয়ে যাচ্ছে। হয়তো এই সব কথাবার্তা বন্ধুমহলে সে বলেও থাকবে। এটাই সিদ্দিকের অপরাধ। এ জন্যই তালিবানদের খুনের ফর্দে তার নাম উঠে গেছে।

উঠোনে আমাকে দেখে মারমুখী তালিবানরা তাজ্জব হয়ে গেল। সেটা অবশ্য এক মুহূর্তের ব্যাপার। ততদিনে কাবুলের লোকজন জেনে গেছে তালিবানদের অপছন্দের তালিকা। ঘরে-বাইরে কোথাওই বোরখা ছাড়া মেয়েদের চলবে না। বোরখা তো আমার নেইই, উলটে পোশাকটাও যেন কেমন। সালোয়ার, কামিজ আর দোপাট্টায় কে এই নারী ?  এই প্রশ্ন তাদের চোখে আঁকা ছিল। যদিও, প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কোনও চেষ্টাই তারা করল না। মুহূর্তে বুঝে গেল এ এক কাফের। কাফেরের সঙ্গে আবার ভদ্র ব্যবহার কী ?  ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর। টেনে ফর্দাফাঁই করে দিল কামিজ। কোনও রকমে দোপাট্টা দিয়ে আব্রু রক্ষার চেষ্টা করলাম। আর, বেধড়ক মার খেলাম। সেদিন বিপদ এর বেশি গড়ায়নি।

আফগানদের মুখে তালিবানদের সম্পর্কে টুকরো টুকরো অনেক গল্প শুনেছি। গুজব এবং রটনাও কম ছিল না— তার বেশির ভাগটাই এদের ছিদ্রহীন ক্ষমতা সম্পর্কে। এই বিশেষ সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৯২ সালে। একটি গ্রাম দখলের মধ্য দিয়ে। গজনি থেকে অনেকটা পশ্চিমে গিয়ে তার পর উত্তর দিকে এগোলে পড়বে উরগুন গ্রাম। এই গ্রামে বসবাস করত যুজবেক জাতি। দেড় হাজার মানুষের এই গ্রামে এক অন্ধকার রাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল সশস্ত্র তালিবানরা। যুজবেকদের জীবিকা হল মাটির বাড়ি বানানো। জীবনে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ধরেনি তারা। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গীদের সঙ্গে লড়াইয়ের কোনও প্রশ্নই ওঠে না তাই। প্রায় বিনা যুদ্ধে তালিবানরা দখল করে নিল এই গ্রাম।

আফগানিস্তানে যুজবেকই হল তালিবানদের প্রথম ঘাঁটি। ‘ধর্মযুদ্ধ’-র এই সৈনিকদের আঁতুড়ঘর যে পাকিস্তান, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তান থেকে অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে তালিবানদের এই দলটি উরগুন দখল করেই কিন্তু থেমে থাকল না। এবার ছোট ছোট দলে গজনিতে ঢোকার ব্যবস্থা করতে লাগল। গজনি শহরে নিজেদের সমর্থক বাড়ানোই হল প্রথম কাজ। আশ্চর্য হলেও এ কথা সত্য যে, এই যুদ্ধবাজরা প্রথমে কিন্তু মানুষজনকে শান্তির কথাই বোঝাতে চেয়েছিল।

প্রথমে একটি গ্রাম। তারপর তার পাশের গ্রাম। এই ভাবে তারা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল। আফগানদের বুঝিয়ে সুজিয়ে টেনে এনে বাড়িয়ে চলল দল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, প্রায় সব গ্রামেই তাদের সমর্থক বেড়ে চলল। শান্তির আশাই ছিল এর মূলে।

এরপর তালিবানরা মোক্ষম অস্ত্রটিতে শান দেওয়ার কথা ভাবল। ধর্মভীরু আফগানবাসীর কাছে মসজিদের গুরুত্ব অসীম। তারা এগোল সেই মসজিদ দখল করার দিকে। আশ্রয় নিল গ্রামের মসজিদে। অতিথিবৎসল আফগানরা ধর্মীয় এই শিক্ষাগুরুদের জন্য খাবার জোগানের দায়িত্ব পেয়ে তারা যেন বর্তেই গেল।

মসজিদের মেহমানরা শান্তির দূত। ফলে তারা বলতেই পারে— অস্ত্র পরিত্যাগ করো। যদিও তারা এটুকু বলেই ক্ষান্ত হয়নি, তার সঙ্গে যোগ করেছে, ‘‘সব অস্ত্র আমাদের হাতে তুলে দাও।’’ ভক্তির আধিক্যে আফগানরা এই নির্দেশকেও সন্দেহের চোখে দেখেনি।

এর পরের নির্দেশ— গ্রামের সব পুরুষকে মসজিদে এসে নামাজ পড়তে হবে। যে না আসবে, সে-ই শয়তানের সহচর। তার গর্দান যাবে। চাবুক পেটা করা হবে। এই ফতোয়াটির পিছনে ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্র। নামাজ পড়তে এলেই জানা যাবে গ্রামে কত জন পুরুষ আছে। কার কেমন শক্তি, কার মনে কী মতলব ঘুরঘুর করছে।

 যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানবাসী তখন শান্তির বাণী লুফে নেওয়ার জন্য একেবারে প্রস্তুত। প্রাক্তন শাসক নুর মহম্মদ তারাকি থেকে শুরু করে নজিবুল্লা পর্যন্ত কেউই তৃষিত আফগান মরুহৃদয়ে এক বিন্দু শান্তি দিতে পারেনি। শাসকদের বিরুদ্ধে ছিল স্বেচ্ছাচারিতার প্রবল অভিযোগ। প্রতিবাদ কম হয়নি। এই প্রতিবাদীদেরই একটা বড় অংশ হল মুজাহিদিন। দেশান্তরিতও হতে হয়েছে মুজাহিদদের। ধর্মের কথা বলে, শান্তি ও সুবিচারের কথা বলে গজনিতে প্রভাব বিস্তার করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না তালিবানদের। জমি তৈরি হওয়া মাত্র শত শত তালিবান ঢুকে পড়ল গজনি শহরে।

কঠোর শ্রম ও দারিদ্র দেশবাসীর নিত্য সঙ্গী। আর, তাদেরই চোখের সামনে তালিবানরা কাটাতে লাগল রাজকীয় জীবন। পাকিস্তান থেকে লরি-লরি খাবার, শীতের পোশাক আর অস্ত্র আসছে তাদের জন্য। অথচ, মোহ ভাঙলেও গ্রাম, শহর কোথাওই এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস হল না কারও। টানা যুদ্ধবিগ্রহের দরুন সাধারণ মানুষের হাতেও অস্ত্র জমা হয়েছিল। কী না ছিল তার মধ্যে— এ কে ৪৭, কালাশনিকভ, কারবাইন। তালিবানরা প্রথমেই সবাইকে বাধ্য করল অস্ত্র সমর্পণে। সশস্ত্র, মৌলবাদী, এই জঙ্গী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তো শূন্য হাতে লড়াই করা যায় না।

তালিবানরা অসীম ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার পর কারও আর টুঁ শব্দটি করার শক্তি রইল না। তবে, প্রতিবাদকে গুঁড়িয়ে দেওয়ারও একটা ইতিহাস আছে নিশ্চয়ই। আর, সেই গল্পও ছড়িয়ে আছে আফগানিস্তানের ছোটখাটো গ্রাম ও শহরে। এখানে এ রকমই একটা ঘটনার উল্লেখ করছি।

আমার পাতানো সই জারগুনার স্বামী ছিলেন নজিবপন্থী, মুজাহিদদের চলতি কথায় ‘খালকি’। খালকি মানে দেশদ্রোহী। জারগুনা মেয়েদের বিকাশের জন্য ১৯৮৬ সাল নাগাদ একটি সংগঠন গড়ে— নাম ‘তাফিকুল’। সংগঠনের মূল লক্ষ্য: নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটানো, সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, চাকরি সংরক্ষণ ইত্যাদি।

জারগুনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ইসলামাবাদের আলিপুরে। আমার স্বামী জামবাজের সঙ্গে ১৯৯০ সালে সেখানে যাই। জারগুনার মুখেই শুনলাম, বিয়ের পরে তার স্বামী নজিবপন্থী হয়ে যান। ফলে, আর দেশে থাকতে পারেননি মুজাহিদদের ভয়ে। পরে জারগুনা দিল্লি চলে যায়। ভিটে ছাড়লেও তালিবানদের রোষ কমল না। মাঝেমাঝেই জারগুনা আর তার স্বামীর খোঁজে তালিবানরা তার শ্বশুরের ভিটেতে হামলা চালায়।

শেষে ঘটল সেই মর্মান্তিক ঘটনা। জারগুনার বাপের বাড়িতে দল বেঁধে এল তারা। বলল, ‘‘জারগুনা কোথায় আছে বল ? ’’ বৃদ্ধ বাবা কেঁদেই আকুল। রাইফেলের বাঁটের খোঁচা খেতে খেতে সে একটিই শব্দের পুনরাবৃত্তি করে চলল— ‘‘জানি না। আমি জানি না।’’ বারকয়েক বৃদ্ধের এই একঘেয়ে গোঙানি শোনার পর দলের নেতা জারগুনার বাবার বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে হুকুম করল— ‘‘তবে কাট, তোর এই কচি ছেলেটার বুক কাট। কলজেটা বের করে ওই তারে ঝুলিয়ে দে।’’ সাত-আট বছরের বালকের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ মূর্চ্ছা যায় আর কী! তালিবান নেতা আবদুল মালিকের পায়ে লুটিয়ে পড়ে বৃদ্ধ বারবার ক্ষমা চাইল— ‘‘আমার ছেলেটাকে মেরো না।’’ আবদুল মালিক কোনও কথা শুনতে রাজি নয়। তার স্পষ্ট নির্দেশ, ছেলেকে কুরবানি হিসেবে না দিলে বাড়ির সবাইকে গুলি করে মারা হবে।

তারপর যা যা ঘটেছিল, তার বিশদ বিবরণ দিলে আঁতকে উঠবেন বাঙালি পাঠক। কচি ছেলেটাকে খুন করতে বাধ্য হয় তার বাবা। এখানেই শেষ নয়, বাড়িতে যে ক’টি মেয়ে ছিল, একে একে তাদের ধর্ষণ করল তালিবানরা।

ততদিনে গোটা আফগানিস্তানই তালিবানদের দখলে। স্থানীয় সাধারণ লোকদেরও টাকা আর ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে দলে টেনে নিয়েছে তারা। আর দখল করেছে ধর্মস্থানগুলো। ধর্মস্থানে বসেই চলেছে তালিবানি ফতোয়া জারি। তার মধ্যে দেশের শ্রীবৃদ্ধির কথা নেই, মানুষের সুখদুঃখের কথা নেই।

খুব বেশি দিনের ব্যাপার নয়, সোভিয়েত রাশিয়া হাত গুটিয়ে নেওয়ার পর, নজিবুল্লা রাজের পতন এবং তার পরে মুজাহিদিনদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও রক্তক্ষয়ী লড়াই আফগানভূমিকে শান্তির জন্য অধীর করে তুলেছিল। অর্থাৎ, যে বা যারা তখন শান্তির আশ্বাস নিয়ে সাধারণ আফগানদের

মাত্র বছর পাঁচেক আগে পাকিস্তানের শরণার্থী শিবির থেকে তরুণ ধর্মান্ধ জঙ্গী ছাত্রদের একটি দল পা রাখল আফগানিস্তানে। এরা এল ত্রাতা হিসাবে। বলল ধর্মের কথা, শান্তির কথা। সাধারণ মানুষকে কিছুটা মজিয়েও দিল। আর এখন সেই সাধারণ মানুষ দেখেন ত্রাতার মুখোশের আড়ালে এক নিষ্ঠুর লুণ্ঠনকারীকে। তালিবান মন্ত্রী ও পদস্থ অফিসারদের অন্তর থেকে ঘেন্না করেন তাঁরা।

 সব থেকে বেশি ক্ষোভ মেয়েদের। কারণ তারাই সব চেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে। তালিবান রাজের আগে দেশের অফিস-কাছারিতে কর্মরত ছিলেন অন্তত ৪০ শতাংশ মহিলা। আর আজ সেই মেয়েদের ঘরের বাইরে পা দেওয়া নিষিদ্ধ। এই ফতোয়া অবশ্য সব চেয়ে বেশি চাপানো হয়েছে শহরের মধ্যবিত্ত মেয়েদের ওপর। তালিবান জঙ্গীদের নারীবিদ্বেষের প্রথম শিকার তারাই। গ্রামের মেয়েদের ক্ষেতে কাজ করার স্বাধীনতা সে ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়নি।

 ধর্মের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত— এই যাদের দাবি, তাদের জীবনযাপনে কিন্তু ভোগ সর্বগ্রাসী। দামি গাড়ি, প্রাসাদোপম বাড়ি ও পাঁচ তারা হোটেলের বিলাসব্যসনে ডুবে আছে তালিবান নেতারা। আর, সাধারণ মানুষের দিন কাটছে অনাহারে। ব্যাঙ্ক নামে কোনও বস্তুর অস্তিত্ব নেই দেশে। সাধারণ চাকুরিজীবীদের নাভিঃশ্বাস উঠেছে। সরকারি কর্মচারীর গড় বেতন বড় জোর আড়াইশো থেকে দেড় হাজার টাকা (পাকিস্তানি টাকা)। দু’তিন রকমের কাজ কিংবা অন্য কোনও ধান্দা না করলে বাঁচার উপায় নেই। মানুষ অভাব সামাল দিতেই জেরবার।

এর ওপর আছে কারফিউর বিপদ। রাত দশটার পরই কাবুল প্রেতের শহর। প্রকাশ্যে নিশিযাপনের একচেটিয়া অধিকার আছে শুধু তালিবানদেরই। আর সেই অধিকারের যত রকমের প্রয়োগ হতে পারে, সবই তারা নির্বিচারে করে চলেছে। রোজ ভোর রাতে ডাকাতি হবেই। এখনও যে দু’চারজন সামান্য সম্পন্ন গৃহস্থ আছেন, ডাকাতরা চড়াও হয় তাঁদের বাড়িতেই। কারা এই ডাকাত ?  তালিবান ছাড়া কার সাহস হবে?  অপরাধ ও দণ্ড দুয়েরই নায়ক এই অস্ত্রধারী বাহিনী।

আমাদের গ্রাম সারামাতেও হানা দিল জনা পঁচিশেক তালিবান। সঙ্গে চার জন শিক্ষাগুরু। শিক্ষাগুরু আসার ফলে বেকার হয়ে গেলেন মসজিদের মৌলবীরা। বলা হল, মৌলবীরা পশ্চিমি বিলাসিতাই শিখিয়েছে শুধু। তাই ওদের দিয়ে চলবে না। একবার মসজিদগুলো দখল করে নেওয়ার পরে তালিবানি রাজ চালানো হতে লাগল ওই সব মসজিদ থেকেই। সংশ্লিষ্ট গ্রামের দায়িত্ব মসজিদে অবস্থানকারী তালিবানদের দুবেলা চর্ব-চোষ্য খাওয়ানো।

পরের ফতোয়া— ধর্মগ্রন্থ ছাড়া সব বই বাতিল করো। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান শয়তানের কেতাব, দোজখের রাস্তা। বাড়িতে টেপ রেকর্ডার, রেডিয়ো এসব রাখা চলবে না। কারণ, ওগুলো হল শয়তানি যন্ত্র। ওই সব যন্ত্রের মধ্য দিয়ে শয়তান ধর্মনিষ্ঠ মানুষদের মাথা চিবিয়ে খায়। আসল উদ্দেশ্য অবশ্যই অন্য। বিরুদ্ধ সমালোচনা, তত্ত্ব এসব যাতে মানুষের কানে না আসে। পৃথিবীটাকে ছোট করে দাও। অন্য জগৎ বলে যে কিছু আছে সেটা যেন কেউ টেরই না পায়। অর্থাৎ, সব রকম জ্ঞান ও তথ্য থেকে আফগানবাসীদের বঞ্চিত করা হল। যাকে বলে লৌহ যবনিকা।

তালিবানরা কি কখনওই প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়নি ?  কেন হবে না ?  গুলবদিন হেকমতিয়ার কিছুতেই মাথা হেঁট করেনি। তার পিছনে আছে লড়াইয়েরও এক দীর্ঘ ইতিহাস। সে লড়েছে কারমাল, বাচ্চা খান, নজিবুল্লার, এমনকী কখনও কখনও জেহাদ ঘোষণা করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও। এ হেন হেকমতিয়ারকে নির্দেশ পাঠাল তালিবান কর্তা আবদুল মালিক— ‘‘অস্ত্র সমর্পণ করো।’’ হেকমতিয়ারের জবাব— ‘‘জান দেব, কিন্তু হাতিয়ার তুলে দেব না।’’

সম্ভবত এই প্রথম আফগানিস্তানের মাটিতে কেউ তালিবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সাহস দেখাল। ধর্মান্ধ তালিবান জঙ্গীরা যে আসলে কাপুরুষ, এই প্রথম সেটাও প্রকাশ পেল। হেকমতিয়ারকে শায়েস্তা করা দূরের কথা, প্রথম চোটে ভয়ে চুপসে গেল তারা। বেশ কিছুদিন টুঁ শব্দটি করল না। আসলে, তখন নানা রকম ষড়যন্ত্র চলছে। তালিবানরা ঠিক করল যে ভাবেই হোক সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে দিতে হবে হেকমতিয়ারের বিরুদ্ধে।

কী ভাবে ?  সে আর এমন কী কথা ?  শুরু হয়ে গেল লুঠপাট। মেয়েদের টেনে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করতে লাগল। জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল সাধারণ মানুষের। এমনও হয়েছে, নিজেদের বাঁচাতে মেয়েরা কুয়োর মধ্যে আত্মগোপন করেছে।

১৯৯৪ সালের অক্টোবরে আমারও হতে পারত ওই অবস্থা। সাধারণ কিছু ওষুধপত্র জুটিয়ে আমি একটি দাতব্য চিকিৎসালয় চালাতাম। ওখানে তো মানুষের চিকিৎসার কোনও সুযোগই নেই। ভেবেছিলাম, এইটুকু অন্তত করি। সেটাও ওদের বিষ নজরে পড়ল। প্রথমে আমাদের বাড়িতে এসে ফতোয়া দিয়ে গেল— ‘‘বোরখা পরতে হবে।’’

কথাটাতে আমি আদৌ কান দিইনি। কল্পনাও করতে পারিনি, এরকম একটা বাজে হুমকি না মানার জন্য জঘন্য শাস্তি পেতে হবে। আবার এল ওরা। এবার একেবারে উগ্র মূর্তি। ঘোষণা করা হল— ‘‘এই মেয়েটা ব্যাভিচারিণী। তাই চিকিৎসার অজুহাতে রোজ পুরুষ ধরতে বেরোয়।’’

ওদের কথায় আমার থোড়াই যায় আসে। কিন্তু, শুধুই তো কথা নয়, কথাটা বলা হল হেনস্থা করা হবে বলে। শা-জওয়ান এক তালিবান আমার চুলের মুঠি ধরে এমন টান মারল, যে আমি ছিটকে রাস্তায় পড়ে গেলাম। এবার ওরা হিড়হিড় করে আমাকে ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে চলল প্রায় দু’মাইল রাস্তা। তারপর নিজেদের মধ্যে কী সব কথাবার্তা বলল, আমি তার কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে, ছাড়া পেলাম। তার মানে ওরা নিশ্চয়ই বলছিল, বাছাধনকে যা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যথেষ্ট। ঠিক কাল থেকেই বোরখা পরবে।

আমার জেদ অবশ্য এতেও ভাঙা যায়নি। হয়তো স্থানীয় কোনও মেয়ে হলে অত্যাচারের মাত্রা আরও বেশি হত। আর, সেও জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করতে যেত না। অন্য দিকে তালিবানরাও আমাকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু মাত্রা রেখে। শত হোক, বিদেশের মেয়ে, বেশি না ঘাঁটানোই ভাল।

সেবার রেহাই পেলেও ১৯৯৫ সালের ২০ জুলাই আবার ওদের হাতে পড়তে যাচ্ছিলাম। কী করে পালিয়েছিলাম, ঈশ্বর জানেন। ধরা পড়লে আর প্রাণে বাঁচতাম না। পালিয়ে চলে গেলাম ইসলামাবাদের ভারতীয় দূতাবাসে। সেখান থেকে ওরা আমাকে আবার ধরে এনেছিল, আমি আবার পালালাম। পথ ফুরোয় না। কবরের পাশ দিয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলেছি তো চলেছি। প্রতি মুহূর্তে ভয়, এই বোধহয় গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়লাম। সারা রাত এক রকম দৌড়ে ভোরবেলায় গজনিতে পৌঁছলাম। গজনি থেকে শেষ পর্যন্ত যে পালাতে পারলাম, সে প্রায় বরাতের জোরে।

Sushmita B

তালেবান জঙ্গিদের গুলিতে নিহত ভারতীয় লেখক সুস্মিতা ব্যানার্জি

আজ এতদিন পরে ওই সব দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়েছি। অন্য একটা কষ্ট পেয়ে বসেছে আমাকে। কেন সেই সময়ে একবারও বামিয়ান গেলাম না!

 ২১ পৌষ ১৪০৮ রবিবার ৬ জানুয়ারি ২০০২

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.