আমাদের দায়িত্ব দেশের নামকে উপরে নিয়ে যাওয়া

0
salma khatun

সালমা খাতুন

উইমেন চ্যাপ্টার: বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সালমা খাতুন সম্প্রতি বিবিসি বাংলার সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন কিভাবে তার এই অঙ্গনে আসা। নিজের ক্যারিয়ারের পরবর্তি লক্ষ্যগুলো নিয়েও খোলাখুলিভাবে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শায়লা রোকসানা।

প্রশ্ন: ‘অধিনায়ক’ কথাটি অনেকটা পুরুষবাচক। ক্রিকেট যে বহুকাল থেকে পুরুষদের খেলা সেটা এখানে স্পষ্ট। যদিও এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের অনেক দেশে নারীরা ক্রিকেট খেলছে আমাদের দেশে আপনারা খেলছেন। নারী হিসেবে এই পেশাটিকে কেমন লাগছে?

সালমা খাতুন: আসলে শুরুটা আমার বাড়ি থেকেই। বাসায় ক্রিকেট খেলতাম। আমি তখন বিশ্বাসও করিনি আমি একদিন বাংলাদেশের উইমেন টিমের হয়ে খেলবো। বাংলাদেশে যখন উইমেন টিম হওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছিলো তখন পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। পরে আমার এক বন্ধুর সহায়তায় আমার মামাতো ভাই আমাকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে সেদিন বৈশাখী, জাহানারা ও শুকতারা সহ আরও অনেক মেয়ে ছিলো। সেখানে তখন কোচ ছিলেন ইমতিয়াজ হোসেন পিলু, শংকর স্যার আর শেখ সালাউদ্দিন। উনারা আমার প্রথম দিনের প্রশিক্ষণ দেখেই মুগ্ধ হয়ে যান যে মেয়েরাও এত সুন্দর করে ক্রিকেট খেলে। এভাবেই যাত্রার শুরু।

প্রশ্ন: যখন আপনি শুরু করেন তখন আপনি কোন ক্লাসে পড়তেন?

সালমা: আসলে তখন আমি পড়াশোনা করিনা। ক্লাস এইট পর্যন্তই লেখাপড়া করছি আমি। এর বেশি আমি লেখাপড়া করিনি।

প্রশ্ন: ছোটবেলার কথা যদি একটু বলেন…

সালমা: আমার জন্ম খুলনায় নানাবাড়িতে। খুলনার ভৈরব নদীর ওপারে মিল্কিদেয়ারায় আমি বড় হয়েছি। ক্রিকেট ছোটবেলা থেকে পছন্দ করলেও তেমন কোন লক্ষ্য ছিল না। কিছুটা পারিবারিক বিষয়ও যুক্ত। আমাদের পরিবার এমন ছিল না। তাই ক্রিকেট নিয়ে তেমন কোনও স্বপ্ন ছিল না।

প্রশ্ন: ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেয়ার বিষয়ে পরিবার থেকে কেমন সাড়া পেয়েছেন?

সালমা: আসলে প্রথমে যখন বাড়িতে খেলতাম তখন তেমন কোন সমর্থন কারও কাছ থেকেই পেতাম না। পরে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ এলে পরিবারের সবাই আমাকে সমর্থন দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন। বন্ধুরা খুব উৎসাহ দেয়। এলাকার একমাত্র মেয়ে বাংলাদেশের হয়ে খেলছে এবং অধিনায়কত্বও করছে তাই সবাই আমাকে নিয়ে গর্বিত। এলাকায় গেলে সবাইকে অনেক সময় দিতে হয়। ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে অনেক সময় কাটাই।

প্রশ্ন: আমাদের দেশও মূলত চিন্তা চেতনায় অনেক দেশ থেকে অনেক পিছিয়ে । সেরকম একটা দেশে নারী ক্রিকেট দলের হয়ে খেলতে গিয়ে কী রকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে…

সালমা: চ্যালেঞ্জ বলতে বাংলাদেশ নামক দেশটির কথা সবাইকে জানান দেয়া। পুরুষ ক্রিকেটের মাধ্যমে অনেকেই জেনেছে। এখন আমাদেরও দায়িত্ব দেশের নামকে উপরে নিয়ে যাওয়া। এটাই সবচাইতে বড় চ্যালঞ্জ।

প্রশ্ন: দেশের দর্শকদের কাছ থেকে কেমন আচরণ পান?

সালমা: আসলে দর্শকদের কাছে আমরা অনেকটাই নতুন। মাত্র বছর ছয় হবে আমরা খেলছি। তেমন দর্শক আসেনা খেলা দেখতে। কিছুদিন আগে যখন দক্ষিণ আফ্রিকা খেলতে আসলো, বাংলাদেশে তখন গ্যালারিতে প্রচুর দর্শক হয়েছিলো। সেটা আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া ছিলো। আগের ম্যাচটি জেতার কারণে হয়তো দর্শক মাঠে এসেছিলো। দর্শক না আসলে খেলার মজাটাই থাকেনা।

প্রশ্ন: মফস্বলের একটি শহর থেকে ক্রিকেটে আসা তারপর জাতীয় দলে উঠে আসা। সে সময়কার ঘটনাগুলো যদি একটু বলেন…

সালমা: খুলনায় প্রশিক্ষণের সময় ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, ভোলাসহ দশ জেলা নিয়ে আমাদের একটা টুর্নামেন্ট হয়। ২০০৬ এর শেষের দিকে। সেখানে আমার শতরানের ইনিংস ছিলো। ১০৪ করেছিলাম। আমরা খুলনার হয়ে খেলি। সেখানে আমরা রানার্স আপ হই। পারফরমেন্স ভালো হওয়ার কারণে পরে জাতীয় দলে সুযোগ হয়। তারপর ২০০৭ সালের দিকে প্রথম মালয়েশিয়া ট্যুর ছিলো। ভালো পারফরমেন্সের জন্য কোচ আমাকে প্রথম থেকেই খুব পছন্দ করতেন।

প্রশ্ন: ২০০৭ এ মালয়েশিয়া সফরের পরে অনেক দেশেই খেলেছেন আপনারা। আপনার স্মৃতিতে সবচাইতে উজ্জ্বল খেলা কোনটা?

সালমা: ২০০৮ এ এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কা সফরটা। সেখানে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান ছিল। সেখানে ভারতের বিপক্ষে আমার একটা পারফরমেন্স ছিলো ৯০ রানের। এই ইনিংসে আমার ২০টা বাউন্ডারি ছিলো। আউট হয়ে ফিরে যাওয়ার সময় দর্শকরা সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান দিয়েছিল। ওটাই আসলে আমার সবচাইতে বড় পাওয়া এখন পর্যন্ত।

প্রশ্ন: তো এখন আপনার কি মনে হয়? বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের উত্তরণের জন্য কোথায় কোথায় কাজ করা দরকার বলে মনে করেন আপনি?

সালমা: বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট এখন অনেকটা এগিয়েছে। আমাদের মূল সমস্যা আসলে আমরা অনেক কম ম্যাচ খেলার সুযোগ পাই। অন্যান্য দেশ ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে খেলছে সেখানে আমরা মাত্র ৬ বছর। আমাদের সময় দিতে হবে। বেশি ম্যাচ খেলে বাকী সবার মত পরিপক্ক হলে আমাকের পারফরমেন্সও বাকী সবার মত হবে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বেশি চাইলে আমাদের উপর মানসিক চাপ পড়ে। বাকীরাও আমাদের মত সময়ে অতটা ভালো ফলাফল করতে পারেনি। সবাই আস্তে আস্তে উপরে উঠেছে। আমরাও আস্তে আস্তে উপরে উঠছি।

প্রশ্ন: ক্রিকেট নিয়ে আপনাদের এখন লক্ষ্য কি?

সালমা: আমাদের লক্ষ্য ছিলো এক দিনের বিশ্বকাপ খেলবো। কিন্তু সেটা হয়নি। এখন টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বাংলাদেশে হচ্ছে। সেটাতে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ভালো কিছু করা। যাতে বোর্ড আমাদের জন্য আরও কিছু করতে পারে।

প্রশ্ন: ওডিআই বিশ্বকাপ খেলতে হলে আপনাদের সুযোগ এখন কিসের উপর নির্ভর করে?

সালমা: বিশ্বকাপে মেয়েদের মাত্র আটটা টিম। আর আমরা এখন আছি নয় নাম্বারে। সামনের বছর আবার যখন কোয়ালিফাই হবে, তখন কোয়ালিফাই এ ভালো করেই আমরা বিশ্বকাপে খেলতে পারবো।

প্রশ্ন: ক্লাব ক্রিকেটে আপনি কোন ক্লাবের হয়ে খেলেন?

সালমা: এখন পর্যন্ত পাঁচবার ক্লাবের হয়ে খেলেছি। পাঁচবারই মোহামেডানের হয় খেলেছি। তিনবার আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, একবার রানার্স আপ হয়েছি। এবার কি হবে এখন জানাটা সময়ের ব্যাপার।

প্রশ্ন: ঘরোয়া ক্রিকেট আপনার কেমন লাগছে? যুগ যুগ ধরে আবাহনী-মোহামেডানের দৌরাত্ম্য আমরা সবাই জানি। এখন সেখানে খেলে আপনার কেমন লাগছে?

সালমা: শুরু থেকেই আম মোহামেডানে। পাঁচবারই এই ক্লাবটির হয়েই খেলেছি। এবার পরিবর্তন করতে চেয়েছি। ইচ্ছা ছিলো আবাহনীতে খেলার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবাহনী দল গঠন করতে না পারায় মোহামেডানেই থাকতে হয়েছে।

প্রশ্ন: মেয়েরা কি এখন আসছে ক্রিকেটের দিকে? আগ্রহটা কেমন দেখছেন?

সালমা: অবশ্যই, প্রথমে ১০টি জেলা দিয়ে শুরু হলেও এবার আসছে ৪৭টি জেলা। মেয়েরা আসছে, নইলে জেলাগুলো টিম করতে পারতোনা। অনেক মেয়ে বের হয়ে আসছে এখন।

প্রশ্ন: দলীয় লক্ষ্যের বাইরে নিজের ব্যাক্তিগত কোন লক্ষ্য কি আছে?

সালমা: অবশ্যই, নিজের পারফরমেন্স তো ভালো রাখতেই হবে। চেষ্টা করবো নিজের ভালো পারফরমেন্স ধরে রেখে দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। মূলত ব্যাটসম্যান হলেও মাঝে মাঝে আমি স্পিন বলও করে থাকি। সবটা উপভোগ করার চেষ্টা করি। খেলাটার সবকটা দিক এনজয় করতে না পারলে পারফরমেন্স ভালো হবেনা।

প্রশ্ন: দেশ বিদেশে আপনার প্রিয় খেলোয়াড় কে বা কারা?

সালমা: রিকি পন্টিং আমার প্রিয় ব্যাটসম্যান, এর বাইরেও ভালো লাগে টেন্ডুলকার, ধোনির খেলা ভালো লাগে। মোহাম্মাদ ইউসুফ, সাঈদ আনোয়ারের খেলা আমার ভালো লাগতো।

প্রশ্ন: নারী ক্রিকেটে কোন দল বেশি এগিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

সালমা: এবারের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। ওরা খুব ভালো দল। এর বাইর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডও খুবই ভালো দল বলেই মনে করি।

প্রশ্ন: খেলাতে আপনারা কেমন পৃষ্ঠপোষকতা পান?

সালমা: ন্যাশনাল খেলার সময় মোটামুটি পৃষ্ঠপোষকতা মেলে। সবচাইতে বেশি মেলে ক্লাবে। এবার যেমন আমি সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পেয়েছি খেলার জন্য। এরপর দুই লাখ বিশ হাজার, দুই লাখ করে অনেকেই পেয়েছে।

প্রশ্ন: ক্রিকেটের বাইরে কি ভালো লাগে?

সালমা: ক্রিকেটের বাইরে ব্যাডমিন্টন আমার ভালো লাগে। বাসায় থাকার সময় আম্মুকে সহায়তা করতে পছন্দ

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.