বুড়িকথন-নারীকাহন

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

‘বুড়ি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ বয়স্কা বা বৃদ্ধা নারী। বুড়ির আরেকটি অর্থ আছে যা হল পাঁচ গণ্ডা, গণনায় ব্যবহৃত হয়। যদিও আজকের আলোচনা সেই বুড়ি নিয়ে নয়।

এই বুড়ি বা বয়স্কা নারী ঠিক কত বছর বয়সে বুড়িয়ে যান? আমাদের সংস্কৃতিতে কুড়িতে বুড়ি হয়। এমন প্রবচন শুনে শুনেই আমাদের বেড়ে ওঠা। নারীর এই কুড়িতে বুড়িয়ে যাওয়ার গল্পের পেছনের গল্পটা হল নারীর বাজার দর পড়ে যাওয়া।

স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, নারীর বাজার দর বলতে কী বোঝানো হয়? বাজারদরের সাথে পণ্যের একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে। কিন্তু নারীর বাজার দর হয় নাকি আবার? নিশ্চয়ই হয়। আর সেই দর নির্ধারিত হয় নারীর বয়স, শারীরিক কাঠামো, চামড়ার রঙ দিয়ে। অন্তত আমাদের সমাজে সেটাই চিরায়ত।
বাজারে লাউ, শসা, কুমড়ো, ঢেঁড়স, ইত্যাদি সবজি একটু বুড়িয়ে গেলেই স্বাদের ভিন্নতা হয়। লাউ কিনতে গিয়ে ক্রেতারা নখ দিয়ে খুঁচিয়ে দেখে, কতটা নখের ডগা সহজেই চামড়া ভেদ করে প্রবেশ করে কিংবা আদৌ করে না। তার ওপর ভিত্তি করে দোকানির সাথে দরদাম করে। লাউ, শশা,কুমড়া যত কিশোরী হবে, ততই দাম পাওয়া যাবে ভালো। কিশোরী এসব পণ্য ক্রেতারা স্বাদের কারণেই দাম দিয়ে কিনবেন আনন্দে। রসনা বিলাস বলে কথা!

একইভাবে, সামাজিক,পারিবারিক সকল চর্চায় নারীর বয়স বৃদ্ধিকেও খাদ্য পণ্যের মতো মূল্য নির্ধারণ করা হয়। খাদ্য পণ্যের সাথে নারীর শরীরকেও একইভাবে ভোগ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। অনেকটা প্রাকৃতিক নিয়মের মতোই এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী হাজার বছর ধরেই চর্চিত হয়েছে। নারী মানে একজন পূর্ণাঙ্গ মানব নয়, নারী একটি পণ্য, কিংবা যৌন সামগ্রী। খাদ্যপোযোগী পণ্যের সকল অংশ ভক্ষণ করা না গেলেও নারীর শরীরের প্রায় সকলকিছুই ভক্ষণযোগ্য।

শুনতে খারাপ লাগলেও নারীর শরীর নিয়ে প্রচলিত কথাগুলোতে ভোগ্যপণ্যের সাথেই তুলনা দৃশ্যমান। তেঁতুল দেখলে জিভে জল আসে, মিষ্টির দোকানে মাছি ঘুরবে, ঘি আর আগুন পাশাপাশি থাকতে পারে না, ফুল ফুটলে মৌমাছি আসবেই।” লক্ষ্য করে দেখুন এই প্রবচনগুলোর মূল বক্তব্যই হল খাদ্য-খাদক সম্পর্ক। এখানে নারী খাদ্য আর পুরুষ খাদক।

শিল্প-সাহিত্যেও নারীর শরীর সর্বদা গুরুত্ব পেয়েছে ভোগ্য পণ্য হিসেবেই। এমন অনেক কালজয়ী বিশ্বসাহিত্যের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে যৌনতা ও নারী একে অপরের পরিপূরক। অস্কার ওয়াইল্ডের দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে, লর্ড বায়রনের জব ডুয়ান, ফিলিপ রথের পোর্টনয়’স কমপ্লেন এবং জেমস জয়েসের ইলিসিস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য সান অলসো রাইজেসের কথা উল্লেখ করা যায়। এইসব উপন্যাসের রচনাকালেই বহুল সমালোচিত হলেও পরবর্তীতে এগুলো বিশ্বসাহিত্যের এক একটি সম্পদরূপে পরিগণিত হয়েছে।

বলা বাহুল্য, মানবজীবনের একটি অতি স্বাভাবিক শারিরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে আজীবন মানুষের এতো কৌতূহল তার মূলে সেই চির আরাধ্য বস্তু নারীর শরীর। অন্যান্য সমাজের প্রেক্ষাপটে নারীর যৌনাকাঙ্ক্ষাকেও কম গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, সেখানে দ্বিপাক্ষিক কামনা-বাসনার গল্পে নারী কেবল ভোগের স্বীকার নয়, বরং এক একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র।
তবে, দুঃখের বিষয় হল, আমাদের অশিক্ষা, অসত সামাজিক ব্যবস্থা, এবং রক্ষণশীল সামাজিক রীতি-নীতির কারণে বার বার নারীই হয়ে যান ক্রীড়নক। নারীর নিজস্বতা, সৌন্দর্যবোধ, আকাঙ্ক্ষাকে কখনোই আলাদা গুরুত্ব কিংবা মর্যদা দেওয়া হয় না। কেবল ভোক্তা কী উপায়ে তাকে ভোগ করবে সেইমত নারীকে হয়ে উঠতে হয় ‘নারী’ হিসেবে।

যে সমাজ শৈশব থেকেই মেয়ে শিশুটিকে তার শিক্ষা-দীক্ষা, বেড়ে ওঠার চেয়ে তার বাইরের রূপ, শারীরিক কাঠামোর মাপকাঠিতে মেপে নিজেকে প্রমাণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়, সেই সমাজে ছেলে শিশুটিও একই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়। তবে একই শিক্ষায় বিস্তর তফাৎ; মেয়ে শিশুটি প্রচণ্ড হীনমন্যতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। নিজেকে অন্যের চোখে সুন্দর, ভালো, আদর্শ নারী হিসেবে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

এতে করে একটা সময় যাদের রঙ ফর্সা নয়, কিংবা দেহের কাঠামো সমাজ নির্দেশিতভাবে সুন্দর নয়, কিংবা কারও বয়স বেড়ে গেছে , সেসব নারীরা অনেকটা ডিপ রুটেড ডিপ্রেশনে চলে যায়। তাঁরা নিজের শরীরকে, চেহারাকে আর ভালোবাসতে পারে না। আত্মমর্যদাবোধ তৈরি হয় না মানুষ হিসেবে। নিজেকে মানুষ হিসেবে আলাদা আইডেনটিটি দিতে পারে না। এমনকি পড়াশোনা করেও অনেক নারী স্বামীর পদবী নিয়েই সুখী হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

অন্যদিকে সেই সমাজের ছেলেটিই প্রচণ্ড প্রতাপে ভেবে নেয় যে সৃষ্টির যা কিছু সুন্দর, তার সবকিছুতেই তার অধিকার আছে। আছে ব্যাপক স্বাধীনতা, আছে ভোগের স্বাধীনতা, অবাধ যৌনাচারেv স্বাধীনতা। তার গাত্রবর্ণ, শারীরিক গড়ন-কাঠামো, চামড়ার রঙ কিংবা বয়স এর কোনো কিছুই তার এই পছন্দনীয় জীবনযাপনের পথে অন্তরায় হতে পারে না। সেক্ষেত্রে আমাদের সমাজের ছেলে-তথা পুরুষদের মধ্যে অনেকটা স্বেচ্ছাচারিতা, আগ্রাসী মনোভাবের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে।

যার ফলশ্রুতিতেই আমরা দেখতে পাই, যত্রতত্র এবং যেকোনো বয়সের, যেকোনো পরিস্থিতিতে নারী ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ শেষে হত্যা, এবং মেয়ে শিশু ও নারী পাচারের মতো ঘটনা অহরহই ঘটছে আমাদের চারিপাশে।
সময়ের পরিবর্তনে নারী শিক্ষিত হচ্ছে, নিজের রোজগার নিজে করছে, নিজের স্বাধীন জীবন যাপনের সিদ্ধান্তও নিজে নিতে সক্ষম। একা থাকা, কিংবা ডিভোর্স নেওয়া-দেওয়ায় এখন তেমনভাবে সমাজকে তোয়াক্কা না করলেও চলে। একদিকে নারীর স্বাধীনচেতা মনোভাব যেমন নারীর জন্য অনেকটা স্বচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। তেমনিভাবে সমাজে আরেকটা বিষয় প্রকটভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। তা হল, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন আজকাল খুব সহজেই। যদিও এই সম্পর্ক সমাজে আগাগোড়াই ছিল, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণই তাঁর মামীর প্রেমে পাগল হয়েছিলেন! তথাপি প্রযুক্তির কল্যাণে, যোগাযোগের সহজলভ্যতায় আজকাল এ জাতীয় সম্পর্কগুলোর আধিক্য তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।

প্রসঙ্গত, একজন বয়স্ক নারী-পুরুষ কে কার সাথে সম্পর্কে জড়াবেন সে বিষয়ে আমার আজকের আলোচনা নয়। বরং আমি ভাবি, একজন নারী বা পুরুষ তাঁদের বিবাহিত জীবনে সুখী না হলে অন্য কারও সাথে বন্ধুত্ব করতেই পারেন। যেহেতু সকল ক্ষেত্রেই বিবাহ বিচ্ছেদ সম্ভব হয়ে ওঠে না, সেক্ষেত্রে নিজেকে ভালো রাখার জন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব করায় খুব বেশি অপরাধ আছে বলে আমি মনে করি না। যদি সেই সম্পর্ক অন্য আরেকজন নারী বা পুরুষের জীবন ধ্বংস করে দেয়!

যে বিষয়টি লক্ষ্য রাখা দরকার, সেখানে কেউ যেন সামাজিক-মানসিক-আর্থিকভাবে ভিকটিম না হয়। যদি দ্বিপাক্ষিক ফলাফল ভালো হয় সেই সম্পর্কে সেটি অগ্রহণযোগ্য হবার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমার স্বামী-সন্তান আছে বলেই আমি একজন পুরুষ বন্ধুর সাথে কথা বলতে পারবো না, একদিন কফি পান করতে গেলেই আমি দুশ্চরিত্রা হয়ে যাবো, এমন সমাজ আমি কল্পনাও করি না, অন্তত এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে।
তবে, মুশকিলটা হল অন্য জায়গায়। সেখানেও নারীরাই আবার হচ্ছে বুলিংয়ের শিকার। নারীরাই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কূফল বয়ে বেড়াচ্ছেন। নারীটিকেই সমাজ আঙুল তুলে বলছেন ওই নারী পরকীয়া করছে, ও আরেক নারীর ঘর ভেঙেছে, কিংবা ওই নারী একটি কম বয়সী ছেলের সাথে প্রেম করছে। একজন পুরুষ বিবাহিত-অবিবাহিত যেকোনো অবস্থাতেই খুব সহজভাবেই জড়াতে পারেন প্রেম তথা শারীরিক সম্পর্কে।
কেননা তার সামাজিক যোগাযোগ, কাজের পরিধি, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নিজস্ব রুচি-পছন্দ নিয়ে কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। এমনকি পুরুষ একইসাথে একাধিক সম্পর্ক চালিয়ে গেলেও সমাজ তাকে খুব একটা কুতসিত বলে ভ্রুকুটি করে না। অপরদিকে, নারীর বিবাহবহির্ভূত এই সম্পর্ক রক্ষায় সবদিক বিবেচনা করেই এগুতে হয়। সমাজ, সন্তান, পরিবার, সব্বাইকে পাশ কাটিয়েই তাকে জড়াতে হয়। নিজের মনের খোরাক জোগাতে গিয়ে অনন্ত অনলে জ্বলতে হয় নিজেরই জ্বালানো আগুনে।
উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, দুজন নারী-পুরুষ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে আবদ্ধ হলেন। দুজন কথা বলেন, মাঝে সাঝে চা-কফি খান, নিজেদের সুখ-দুঃখ শেয়ার করেন। দুজনেই জানেন, তাঁদের কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। কেউ কাউকে আজীবন একসাথে চলার প্রতিজ্ঞাও করেননি। কেউ কারো ওপরে খুব বেশি অধিকার খাটানোর দায়িত্বও নেননি।
তাঁরা পারিবারিক গণ্ডি থেকে বেরিয়ে একটু সহজে নি:শ্বাস নিতে চান। এবং অলিখিত এক বন্ধনে দুজনই আবদ্ধ হয়ে পড়েন। হয়তোবা মনের টানও থাকে খানিকটা শুরুতে। এভাবে উদ্দেশ্যহীন নৌকোর মতো স্রোতের তালে ভাসতে গিয়ে ধীরে ধীরে নারীটি জড়িয়ে পড়েন। পুরুষটি সুতোর বাঁধন আলগা করেই জড়ান। যেনো প্রয়োজন হলেই সে সুতো কেটে সহজেই বেরিয়ে যেতে পারেন দায়-দায়িত্বহীন, নির্দোষ নির্বিকারভাবে।

এখনও আমাদের সমাজের নারীরা অতোটা দ্বিধাহীন চিত্তে একজন পুরুষের দিকে নিজের থেকে এগিয়ে যেতে পারে না। কেননা, সমাজ তাকে শিখিয়েছে, তুমি মা, তুমি স্ত্রী কিংবা তুমি ডিভোর্সী বা বিধবা! তুমি কি আরেক পুরুষের ভালোবাসা পাবার যোগ্য? না, মোটেও নয়। এই ভয়েই নারী ভেতরে ভেতরে সেঁটিয়ে থাকেন। এইক্ষেত্রে সবসময়েই পুরুষেরা অগ্রগামী হয়।
শুধু তাই নয়, পুরুষেরা নারী মনকে স্টাডি করে ফেলেন দ্রুতই। কোন নারী কীসে সন্তুষ্ট হবেন সেভাবেই তাদের সাথে মিশবেন, বলবেন। যাতে নারীটি সেইসব পুরুষের ওপরে ভরসা করতে শেখেন। পুরুষেরা তখন সেইসব নারীর পরিণত সৌন্দর্য্যের প্রশংসা করেন, তাদের প্রজ্ঞা, মেধা-মনন, এবং জীবন অভিজ্ঞতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে যান। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, লড়াইকে পুরুষেরা সম্মান জানান, যাতে করে নারীরা সত্যিই সেই পুরুষদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে শুরু করেন, এবং বিশ্বাস করেন তিনি নিপাট ভদ্দরনোক।

ভাবতে থাকেন, আহা! এই বুঝি ভগবান এলেন! এতো জীবনে সে কখনও তার রূপ আর শরীর ছাড়া অন্য কোনো কিছুর প্রশংস শোনেননি। এই লোক তাকে সম্মান করছে! তার গুণের, যোগ্যতার প্রশংসা করছে! এ খাঁটি প্রেমিক না হয়ে যায় না। খুব সহজেই নারী বিগলিত হয়ে যান এবং শতভাগ ঢেলে দিয়ে নিজেকে সমর্পণ করে ফেলেন অতি দ্রুত। তারও হৃদয় গহব্বরে আছে বিশাল শূন্যতা! সংসারের ভেতরে থেকেই হোক আর একলা জীবনে।
কিন্তু খেলাটা শুরু হয় কিছুকাল পরে। এই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কগুলোর শতকরা ১০০ ভাগই ভেঙে যায় পুরুষদের কারণে। কেননা, তাঁদের পক্ষে সবদিক ম্যানেজ করা সম্ভব হয় না। যখনই সে আইনী সম্পর্কের কাছে ধরা পড়ে যায়, তখনই সে প্রেমিকা নারীটিকে ডাইনি বলে উপাধি দেয়। তিনি নিতান্তই সহজ-সরল, অবোধ শিশু। তাকে ওই ডাইনী বুড়িটা ফাঁদে ফেলেছে। আর তাঁর স্ত্রীও সে কথা বিশ্বাস করে ক্ষমা করে দেন স্বামীদেবতাটিকে। স্বামীটি ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে সমাজে বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়ান।

সোশ্যাল মিডিয়ার বাজারে এই পরকীয়া কিংবা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের আরও একটি বিশেষ রূপ বা হালের ট্রেন্ড চালু হয়েছে গত দুই দশক ধরে। আজকাল বয়সে বড় নারীদের প্রতি অবিবাহিত ছেলেদের ঝোঁক বেশি। সম্পর্ক করার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রথমত, আমার মনে হত, এটা পার্ভার্সন। কিন্তু অনেক হিসেব কষে বের করলাম, পুরুষ চিরকাল হিসেবী এবং নিজের লাভটা ষোলো আনাই বোঝেন। কোনো সুবিধে ছাড়া এই বুড়িদের পেছনে কেনো কচি খোকারা ছুটবেন? আসল রহস্যটা পেয়ে গেলাম।

আদতে একজন অবিবাহিত যুবক যদি মানসিক- শারীরিক শান্তির জন্য একজন বিধবা, বয়স্কা, ডিভোর্সী নারীর সাথে সম্পর্কে জড়ান, সেক্ষেত্রে সেই যুবক আরও বেশি স্বাধীন ও দায়-দায়িত্বহীন প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়াতে পারবেন। জীবন আরও বেশি উপভোগ করতে পারবেন। প্রথমত, বয়স্কা নারী, যারা শিক্ষিতা, নিজের রোজগারে চলেন, তাঁরা স্বাধীন। সুতরাং প্রেম করতে গিয়ে গার্লফ্রেণ্ডের পেছনে ব্যয়ের ঝামেলা নেই যুবকটির।
সেই বয়স্ক নারীরা কিছুমাত্র মানসিক ও শারীরিক আনন্দ ছাড়া বিরাট কোনো দায়িত্ব যুবককে দেবে না। কেননা, সেই নারীও সমাজকে ভয় পান। তার বর্তমান সামাজিক অবস্থা ও অবস্থান থেকে সে বেরিয়ে আসবে না। যুবককে কোনোরকম ভবিষ্যত আর্থিক কিংবা সামাজিক দায়িত্ব নিতে হবে না। তাছাড়াও যুবক তাকে প্রতারণা করে যখন তখন চলে গেলে সেই নালিশ নিয়ে এইসব নারী কোথাও যেতে পারবে না নিজেরই সম্মানের কথা ভেবে।

এমতাবস্থায় এইসব আধুনিক অল্পবয়সী ছেলেপুলেরা যত্রতত্র বয়স্কা নারীদের সাথে দেদারছে প্রেমে জড়িয়ে পড়ছে। আবার অতি দ্রুতই প্রেম থেকে বেরিয়ে আসছে। একইসাথে অনেকের সাথেও রুটিন মেনে, দেশে বিদেশে, পাড়ায়-মহল্লায় এ জাতীয় সম্পর্ক করছে। এর থেকে একটা মোটা অঙ্কের রোজগারও করছে অনেকেই। যদি কখনো প্রেমিকাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা হয়, অর্থাৎ জানাজানি হয়ে যায় যে একটি ছেলেই সবার সাথে এইসব করে বেড়াচ্ছে, তখন যুবক অতি সহজেই যেকোনো একজনের দিকে আঙুল তোলে। যাকে তার বেশি সুবিধেজনক মনে হয়, তাকে আরও কিছুদিন সার্ভিস দিতে চায়।
অবলীলায় সে নারীকে বলে দেয়, তুমি একজন বয়স্কা নারী। তোমার সাথে কি আমার যায়? তোমার সংসার-সন্তান আছে। সমাজ তোমাকেই বা কী বলবে? আমি এই সম্পর্ক আর চালাতে পারবো না। অথবা সব সম্পর্ক মানেই কি প্রেম-ভালোবাসা? নিমেষে পুরোনো সকল কথা- প্রেমের ডায়লগ সব ভুলে যায় যুবকটি।
এমতাবস্থায় সেই নারীটিই বিপাকে পড়েন। কেননা নারীর মানসিক গড়ন আর পুরুষের ভোগ্য মানসিকতা কখনোই ভালোবাসার একটি বিন্দুতে পৌঁছোয় না। নারীটি ততোদিনে সেই যুবকের মুহুর্মুহু প্রেমে অন্ধ, সে ভাবতে শুরু করে, একটা জীবন এর সাথেই কাটিয়ে দেবে।

অনেক সময় বোকা নারীরা এও ভাবে, আমিতো কেবল প্রেমিকাই নই, মায়া-মমতায় স্নেহে তাকে আগলে রেখেছি। দুর্দিনে সঙ্গী হয়েছি, অসুখে-বিসুখে, অর্থে-ক্যারিয়ারে অনেক সাহায্য করেছি, সে কেনো আমায় ছেড়ে যাবে? সে হয়তো এতোটাও অকৃতজ্ঞ হতে পারবে না। নারীটি হয়তো সত্যিই সেই যুবকের কাছে বিয়ে চায়নি, সংসার চায়নি। চেয়েছিল একটু পাশে থাকা!

পুরুষ সামাজিক জীব। ভেতরে তার যতই নোংরামী থাক, বাইরে সে পরিপাটি। সে সমাজের কাছে হেয় হয় এমন কর্ম কস্মিনিকালেও করবে না। তাই একাধিক নারীর সাথে একই সময়ে সম্পর্কে জড়িয়েও সে যদি সেটেলড হবার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে সকল নারীকেই অস্বীকার করবে। কিংবা সে যদি তাদের মধ্য থেকে কোনো একজনকে বেছে নিতে চায়, তখন সে বাকিদেরকে বিচ্ছিরিভাবে অস্বীকার করে। নোংরা গালাগালসহ একজনকে অন্যজনের পেছনে লেলিয়ে দেবে। একটু কান পাতলেই আমাদের আশেপাশে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই গল্পের সয়লাভ।

অল্প বয়সী প্রেমিকদের বয়স্কা প্রেমিকাকে অস্বীকারের প্রধানতম অস্ত্রগুলো ভীষণ ভয়ঙ্কর। মানুষ যে মানুষকে এতো বিশ্রী শব্দে অপমান করতে পারে, পৃথিবীর কোনো বুলেটও ততোটা রক্ত ঝরাতে পারে না। তখনকার শব্দবুলেটগুলো এমন হয়- “তুমি কি নিজেকে আয়নায় দেখ, তোমার বয়স কত? তুমি তো শেষ! তোমার শরীরে রূপ-যৌবন কী আছে? তুমি আমাকে আর কী দেবে? আমার গোটা জীবন পড়ে আছে। বোঝার চেষ্টা কর। প্রেম-ভালোবাসা ছাড়াও সম্পর্ক হয় তো।”
অতি চালাকেরা খুব ভদ্রতা করে হয়তো এও বলতে পারে, দেখ সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু আমায় বাড়ি থেকে তাড়া দিচ্ছে বিয়ে করতে। সেটাও তো মানবে। একটু গুছিয়ে নিই। অথবা এমনও বলে, আমার গার্লফ্রেণ্ড সব জেনে গেছে। এখন ওকে তো সামলাই! আসলে ভালো তো আমি তোমাকেই বাসি।
তখন সেই ভিকটিম নারীটির আর কিছুই করার থাকে না। না পারে কারও কাছে বলতে, না পারে সইতে, না পারে সেই মানুষটাকে ঘৃণা করতে, না পারে ভালো বাসতে। কেবল দুর্মর এক স্মৃতির ভার বয়ে বয়ে ক্লান্ত হয় রোজ জীবনের পথে। একটুখানি বিষাদের ওপর আলতো প্রলেপ দিতে গিয়ে গোটা জীবনটাকেই সে চরম বিষাদের ভেতরে ফেলে দেয়। সেই বিষাদের মেঘ ঘণ-কালো-ভারী হয়ে তার জীবনকে গ্রাস করে আষ্টেপৃষ্ঠে।

সে আর কোনো পুরুষকেই বিশ্বাস করতে পারে না। পারে না সহজ হতে ভালোবাসায়। নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান – আত্মমর্যদাও হারিয়ে ফেলে। নিজেকে আর নিজে সম্মান করতে পারে না। একজীবন অপরাধী হয়ে কাটায় নিজেরই কারাগারে। আর এর দায় সেই পুরুষশাসিত সমাজ প্রাণপণে অস্বীকার করেই চলে, নারীর দিকে আঙুল তুলে। এইই আমাদের সমাজ!

শেয়ার করুন: