হৃদরোগে মেয়েরা মারা যাচ্ছে বেশি, দুশ্চিন্তায় চিকিৎসকেরা

HEART-ATTACK-WOMENউইমেন চ্যাপ্টার: মেয়েদের ‘কলজের জোর’ বেশি এমন একটি ধারণাই ছিল বরাবর। ফলে এক ধরনের নিশ্চিন্ত মনেই থেকেছেন অনেকে। কিন্তু চিকিৎসা শাস্ত্রের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট আগের সব ধারণাকে পাল্টে দিয়ে বরং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে।

গ্লোবাল হার্ট প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিবছর হৃদরোগে পুরুষের তুলনায় নারীর মৃত্যুহার বাড়ছে, অথচ নারীরা পুরুষদের মতোন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা বা হৃদরোগ প্রতিকারের পরামর্শও পায় না। এদিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচএ জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে নারীদের মধ্যে হৃদরোগের প্রকোপ বেড়ে গিয়েছে ৩০০ গুণ! আর এখন স্তন ক্যান্সারে যত নারী মারা যাচ্ছেন, তার ছ’গুণেরও বেশি নারীর মৃত্যুর কারণ হচ্ছে এই হৃদরোগে।

নতুন এই তথ্য উন্নয়নশীল বিশ্বের চিকিৎসকদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করা হয়েছে, অনেকটা প্রতিরোধ এবং প্রতিকার করা সম্ভবও হয়ে উঠেছে চিকিৎসা শাস্ত্রের অভূতপূর্ব উন্নতিসাধন এবং সচেতনতা বাড়ানোর ফলে, কিন্তু অবহেলিত থেকে গেছে মেয়েদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেয়েদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ৪০ ওর ওপর যাদের বয়স এবং মেনোপজের পরপরই মেয়েদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ এই হৃদরোগ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর চার লাখেরও বেশি নারীর মৃত্যু হয় হৃদরোগে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দেখতে চেয়েছিলেন নারীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের ঝুঁকি এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে এর প্রভাবই বা কতটুকু। গবেষণায় উঠে এসেছে যে, নারীভেদে হৃদরোগের কারণ যেমন ভিন্ন, তেমনি এর চিকিৎসাও ভিন্ন। নারীর গর্ভাবস্থার সাথেও এর ঝুঁকির বিষয়টি তাদের গবেষণায় ধরা পড়ে।

গবেষকদের তথ্যমতে, প্রতি বছর সারাবিশ্বে ৮৬ লাখ নারী মারা যায় হৃদরোগ-সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে। এই হার নারীমৃত্যুর মোট হারের এক তৃতীয়াংশ। আরও ভাল করে বলতে গেলে, বিশ্বজুড়ে নারী-পুরুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে হৃদরোগ।

গবেষকরা এটাও বলেছেন যে, নারীদের মধ্যে হৃদরোগের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে, তবে খুবই ধীরগতিতে। আরও অনেক পথ চলা বাকি আছে। ২০০৪ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি পাঁচজন ডাক্তারের একজন মাত্র স্বীকার করেছিলেন হৃদরোগে নারীমৃত্যুর হার পুরুষের তুলনায় বেশি। এরপরও হৃদরোগ সংক্রান্ত পুনর্বাসন তৎপরতায় নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় শতকরা ৫৫ ভাগ কম।

গবেষকদের একজন বলেন, পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি মারা যান হৃদরোগে, আবার এই সংখ্যা স্তন ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সার, ক্রনিক শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, আলজেইমার এবং এমনকি সড়ক দুর্ঘটনার চাইতেও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে হৃদরোগে মৃতের হার শতকরা ৩০ ভাগ কমেছে, কিন্তু ৫৫ বছরের নিচের বয়সীদের মধ্যে এই মৃত্যুহার বাড়ছে। গবেষকদের মতে নারী-পুরুষের মধ্যে ঝুঁকির পার্থক্যগুলো:

• অতিরিক্ত মোটা (ওবেসিটি) হয়ে যাওয়ায় হৃদরোগের ঝুঁকি শতকরা ৬৪ ভাগ নারীর ক্ষেত্রে বাড়ে, সেই তুলনায় পুরুষের হার ৪৬ ভাগ।
• যেসব নারীর অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়, তাদের মৃত্যুর আশংকা পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ।
• শতকরা ৪২ ভাগ নারী হার্ট অ্যাটাকের এক বছরের মধ্যে মারা যায়, অথচ পুরুষের এরকম মৃত্যুর হার ২৪ ভাগ মাত্র।
• পুরুষের তুলনায় শতকরা ২০ ভাগ নারী অ্যানজিনাতে (angina) আক্রান্ত হয়।

গবেষকরা বলছেন, পুরুষের তুলনায় নারীর করোনারি আর্টারিগুলো সরু, ফলে মাইক্রোভাসকুলার রোগের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেশি থাকে।

গবেষকদের মতে ভয়ের বিষয় হলো, নারীর ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্লক নাও হতে পারে, আর ছোট ব্লক হওয়ার কারণে সেটা হয়তো প্রাথমিকভাবে শনাক্তই হয় না। ফলে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকেও বাদ পড়ে যায়। তাছাড়া পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, প্রি অ্যাক্লাম্পশিয়া, ডায়াবেটিসের মতো রোগগুলোও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সেইসাথে আছে মেনোপজ। এটা একজন নারীর জন্য খুবই স্বাভাবিক একটা শারীরিক প্রক্রিয়া হলেও বেশ কতগুলো পরিবর্তন দেখা দেয় এই সময়টাতে। এসট্রোজেন হরমোনের স্বল্পতা, হট ফ্ল্যাশ, রাতে ঘেমে যাওয়া, আবেগীয় পরিবর্তন এবং যোনিপথ শুষ্ক হয়ে যাওয়ায় এর সবটা প্রভাব পড়ে একজন নারীর মানসিকতায়। এসব নানা কারণেই নারীরা অধিক হারে এবং ব্যাপক মাত্রায় হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

ভারতেও এক জরিপে দেখা গেছে, মেয়েদের মধ্যে হৃদরোগের আশংকা বাড়ছে। নারীদের মধ্যে হৃদরোগের আক্রমণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার তথ্য সামনে আসায় নিজেদের অনেকটাই প্রতিরোধহীন বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যকর্তারা।

এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণভাবে হৃদরোগ নিয়ে প্রচার হলেও মেয়েদের ব্যাপারে আলাদাভাবে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ হয়নি। চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি, আগে ধরে নেওয়া হতো যতদিন মেয়েরা প্রজননক্ষম থাকছেন, ততদিন হৃদরোগের আশংকা নেই বললেই চলে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই ধারণাটা অনেকটাই ভুল। মেনোপজ-এর বহু আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। কখনও কখনও তা মৃত্যুতেও পরিণত হচ্ছে।

বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ দেবী শেঠীর কথায়, “৪৫-৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েদের শরীর থেকে এমন কিছু হরমোন বের হয়, যার দরুণ হার্টের সমস্যা সাধারণভাবে কম থাকার কথা। কিন্তু ইদানিং সেই তত্ত্ব বহু ক্ষেত্রেই উল্টে যাচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর কারণ ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ এবং ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস। এই দুই অভ্যাস ওই সব হরমোনের সুপ্রভাবকে নষ্ট করে দেয়। গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট দীর্ঘদিন যাঁরা খান, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। আরেকজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, “এখন মেয়েদের ঘরে-বাইরে গুরুদায়িত্ব। কোনটাকেই তারা অবহেলা করতে পারছে না। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ধূমপান, মদ্যপান। এর উপরে উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস থাকলে তো সোনায় সোহাগা।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “সংসার, সন্তান, চাকরি-এই তিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মেয়েদের ‘স্ট্রেস’ সাঙ্ঘাতিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। তারই পরিণাম এই হৃদরোগ। চেনা উপসর্গগুলো না থাকায় বহু ক্ষেত্রে তা সময়মতো ধরা পড়ছে না, ফলে প্রাণঘাতীও হয়ে উঠছে। বহু ক্ষেত্রেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে যখন সেই নারীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, দেখা যায় যে, ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে।” অথচ মেয়েদের অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে অল্পবিস্তর কাজ হলেও হৃদরোগের মতোন জটিল এবং প্রাণঘাতী বিষয়টিকে এতোদিন আমলেই নেওয়া হয়নি। সচেতনতা বাড়ানোর কাজও সেভাবে শুরুই হয়নি। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছে ভারতের একটি বেসরকারি সংস্থা। সংস্থার তরফে স্বদীপ শ্রীবাস্তব বলেন, “কাজটা করতে গিয়ে আমাদের যা অভিজ্ঞতা হয়েছে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এখন মেয়েদের শিক্ষা, তাদের পেশাগত জগৎ আগের থেকে গুরুত্ব পাচ্ছে, কিন্তু স্বাস্থ্যের দিকটা অত্যন্ত অবহেলিত। পরিবারের কাছে, এমনকী মেয়েটির নিজের কাছেও।” এর সঙ্গে রয়েছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় বসে কাজ করা এবং ন্যূনতম শরীরচর্চাটুকুও না করার অভ্যাস। কার্ডিওথোরাসিক সার্জন সত্যজিৎ বসু জানালেন, কিছু দিন আগেই তিনি ১৭ বছরের এক তরুণীর বাইপাস সার্জারি করেছেন। তাঁর কথায়, “বাবা মেয়েকে একটা কম্পিউটার কিনে দিয়েছিলেন। মেয়ে সব সময়ে কম্পিউটারের সামনে বসে কিছু না কিছু করছে। আর প্যাকেটের পর প্যাকেট চিপস শেষ করছে। ফল যা হওয়ার তা-ই।”

খাদ্যাভ্যাসের উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। বিশেষত তেলের বিষয়টিতে। তৈলাক্ত খাবারের প্রতি মেয়েদের আকর্ষণ তুলনামূলক ভাবে বেশি হওয়ার কারণেও মেয়েদের হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায় বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ। দিল্লির একটি হার্ট ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অশোক শেঠ বলেন, “তেল হলো হৃৎপিণ্ডের সবচেয়ে বড় শত্রু। তাই রান্নার তেল বেছে নেওয়ার ব্যাপারটা সবচেয়ে জরুরি। যে সব তেলে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে, সেই তেল ট্রান্স-ফ্যাট বেশ খানিকটা কমিয়ে আনতে পারে।”

চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, বহু ক্ষেত্রে মেয়েদের হৃদরোগের তেমন উপসর্গ থাকে না। আবার থাকলেও অনেক সময়ে চেনা উপসর্গের পরিবর্তে কিছু অচেনা উপসর্গ থাকে। যেমন, ডায়াবেটিস থাকলে অনেক সময়ে বুকে ব্যথা টের পাওয়া যায় না। এ ছাড়া বহু ক্ষেত্রেই বুকে ব্যথার বদলে পেটে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এর ফলে অসুখটা আদতে কী তা টের পেতেই অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। চিকিৎসকের কথায়, “মেয়েদের ধমনীগুলো পুরুষের তুলনায় ছোট। তাই অস্ত্রোপচারের সুফল তুলনামূলক ভাবে কম। রোগ হওয়ার পরে চিকিৎসা না করে রোগ প্রতিরোধটাই তাই সবচেয়ে জরুরি। আগে আমরা ৪০ বছরের পর চেক আপ করানোর কথা বলতাম। এখন তো বলি ৩৫-এর পর থেকেই বছরে এক বার চেক আপ করিয়ে নিন। ডায়াবেটিস বা হাই ব্লাড প্রেশার থাকলে কিংবা বাড়িতে কারও হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে তো অবশ্যই করানো উচিত।”

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.