চির বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা!

ফারদিন ফেরদৌস:

ভারতীয় চন্দ্র অভিযানে ইসরো’র (ISRO) চেয়ারম্যান এস সোমনাথের তদারকিতে বড় দায়িত্ব সামলেছেন এক নারী বিজ্ঞানী। তিনি চন্দ্রযান-৩ মিশনের ডিরেক্টর। ঋতু করিধাল’কে এখন ‘রকেট উইমেন অব ইন্ডিয়া’ বলে ডাকা হচ্ছে। এই মিশনে মোট ৫৪ জন নারী বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তারা সহযোগী পরিচালক, উপ-প্রকল্প পরিচালক এবং বিভিন্ন সিস্টেমের প্রকল্প ব্যবস্থাপকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পালন করছেন।

চাঁদে সফল অভিযানের পর মহাকাশ বিজ্ঞানী ঋতু করিধাল আশা প্রকাশ‌ করেছেন, দেশের মেয়েরা আরও বেশি করে এগিয়ে আসবেন বিজ্ঞান গবেষণায়। সামজের বিভিন্ন স্তরের মেধাবী ছাত্রীদের তিনি আরও বেশি করে দেখতে চান বিজ্ঞানী ও গবেষকের ভূমিকায়।

লখনউয়ের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ঋতু করিধাল। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন লখনউয়ের সেন্ট অ্যাগনেস স্কুল থেকে। লখনউয়ের নবযুগ কন্যা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। মহিলা বিদ্যালয় পি জি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক পাশ করেন। লখনউয়ের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ঋতু। গ্র্যাজুয়েট অ্যাপটিটিউড টেস্ট ইন ইঞ্জিনিয়ারিং বা ‘গেট’-এ ভাল ফল করে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে সুযোগ পান। সেখান থেকেই করেন এম টেক। এমটেক পিএইচডি শুরু করলেন ঋতু। গবেষণারত অবস্থায় ১৯৯৭ সালেই যোগ দেন ইসরোতে। চন্দ্র জয়ের মাধ্যমে জীবনের বড় সাফল্য পেলেন এ বছর।

নারীরাও যে দায়িত্বশীলতা ও গবেষণায় পুরুষের চেয়ে কম যান না ঋতু করিধাল এর বড় প্রমাণ।

এমনিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী সায়েন্টিস্টরা মহাকাশ গবেষণায় যোগ্যতা ও সক্ষমতাবলে নিজেদের নাম লিখিয়ে চলেছেন। বিশেষ করে রক্ষণশীল মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোও এরোস্পেসে তাদের নারীদেরকে এগিয়ে রাখছেন।

আমিরাতের মতো ক্ষুদ্র উপসাগরীয় দেশও মঙ্গলে মিশন পরিচালনা করেছে। এর পেছনের রূপকার এক নারী। যার নাম সারাহ বিনতে ইউসিফ আল আমিরি। ‘হোপ মিশনের’ বৈজ্ঞানিক দলের প্রধান সারাহ। একইসঙ্গে দেশটির অ্যাডভান্সড সায়েন্স বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। নবীন এই বিজ্ঞানী ইতিমধ্যে আরব বিশ্বের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। ‌

অপরদিকে আরবের প্রথম নারী নভোচারী হতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দা নোরা আল-মাতরুসি। দেশটিতে নভোচারী হতে আগ্রহী হাজারো আবেদনের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া দুজন ব্যক্তির মধ্যে একজন হচ্ছেন মাতরুসি।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শারজাহর ২৮ বছর বয়সী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মাতরুসি ছোটবেলা থেকেই মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। স্কুলে থাকতেই তিনি গ্রহ–নক্ষত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

এদিকে সৌদি আরবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহাকাশে যাচ্ছেন নারী নভোচারী রায়ানাহ বার্নাবি। সৌদি আরবের ভিশন-২০৩০ পূরণের জন্য এএক্স টু মহাকাশ মিশনে যোগ দেবে দেশটি।
৩৩ বছর বয়সী সৌদি নাগরিক বার্নাবি বায়োমেডিকেল সায়েন্সে দুটি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই বিষয়ে স্নাতক এবং আলফাইসাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এ ছাড়া গবেষণাগার বিশেষজ্ঞ হিসেবে বেশ খ্যাতি রয়েছে তার। ক্যান্সার স্টেম সেল গবেষণায় প্রায় এক দশকের মতো কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন রায়ানাহ।

মহাকাশ গবেষণায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের নারী বিজ্ঞানীরাও। সাম্প্রতিককালে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আমাদেরকে দারুণভাবে অতীত দেখাচ্ছে। এ গবেষণায় কাজ করছেন বিভিন্ন দেশের এক হাজার জনেরও বেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাদের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী লামীয়া আশরাফ মওলা। কানাডার ১৫ সদস্যের দলে তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি, যিনি পেশায় একজন অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট। লামীয়া ২০২০ সালে ফেলো হিসাবে কানাডার ডানল্যাপ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের সঙ্গে যুক্ত হন এবং জেডব্লিউএসটিতে কানাডিয়ান দলে গ্যালাক্সির পাইপলাইন নিয়ে বিশ্লেষণ ও গবেষণা করছেন।

এছাড়া আমাদের সিলেটের সফটওয়্যার প্রকৌশলী মাহজাবীন হকও কাজ করছেন নাসায়।

বাংলাদেশের নারীদেরকে মিসোজিনিস্টদের সাথে রীতিমতো ফাইট করে নিজেদের লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে হয়। ঘরের বাইরে আসতে হয়। চাকরিবাকরি করে সংসার সামাল দিচ্ছেন। অগণন মিথ্যা ও অসংগতিপূর্ণ মানবতাবিরোধী বক্তৃতার মাধ্যমে নারীকে ঘরে বসে থেকে স্বামীসেবার ছবক দেয়া হয়। তারপরও সংগ্রামী নারীরা ইদানিং ছেলেদের চেয়েও পড়াশোনায় এগিয়ে আছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক সাময়িকী ‘এশিয়ান সায়েন্টিস্ট’ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর একটি তালিকা প্রকাশ করে ২০২১ সালে। সেখানে বাংলাদেশের তিন বিজ্ঞানী স্থান পায়। সালমা সুলতানা, ফেরদৌসী কাদরী ও অধ্যাপক সায়মা সাবরিনা

সালমা সুলতানা বাংলাদেশের মডেল লাইভস্টক অ্যাডভান্সমেন্ট ফাউন্ডেশনের (এমএএলএফ) চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য পশু চিকিৎসা ও শিক্ষায় ভূমিকা রাখার জন্য ২০২০ সালে তিনি নরম্যান ই বোরল্যাগ অ্যাওয়ার্ড এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ ফাউন্ডেশনের স্বীকৃতি পান।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষক ফেরদৌসী কাদরী উন্নয়নশীল বিশ্বে শিশুদের সংক্রামক রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে বৈশ্বিক টিকাদান কর্মসূচিতে তার অবদানের জন্য ২০২০ সালে ল’রিয়েল-ইউনেসকো ফর ওমেন ইন সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড পান।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সায়মা সাবরিনা ন্যানোম্যাটেরিয়্যালের ব্যবহার নিয়ে গবেষণার জন্য ২০২০ সালে ওডব্লিউএসডি-এলসেভিয়ের ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড ফর আর্লি ক্যারিয়ার ওমেন সায়েন্টিস্ট ইন দ্য ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড পান।

এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর ২০২৩ সালের তালিকায় স্থান পান বাংলাদেশের দুজন নারী বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী ও অণুজীববিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা।

এ তালিকায় থাকা গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী প্লাস্টিকের দূষণ এবং প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে একাধিক গবেষণা করেছেন।

অপরদিকে সেঁজুতি সাহাই প্রথম বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচন করেছেন। তবে এর আগে তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ কাজ ছিল শিশুদের নিয়ে। তিনিই বিশ্বে প্রথম প্রমাণ করেন, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শুধু রক্ত নয়, শিশুর মস্তিষ্কেও বিস্তার লাভ করতে পারে।

এ কথা সত্য আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও সক্ষমতার ঘাটতি থাকায় দেশে অবস্থান করে মহাকাশ গবেষণায় সফল হওয়া দুষ্কর। যে কারণে মার্কিন নাসায় গিয়ে আমাদের বিজ্ঞানীরা কাজ করতে বাধ্য হন। দেশ যদি তাদের উপযুক্ত স্থান দিয়ে নিজের জন্মভূমিতে ফিরিয়ে আনতে পারে আমরাও নিশ্চয়ই ঋতু করিধালের মতো বিজ্ঞানী পাবো। এবং তাদেরকে আমরা ‘রকেট উইমেন অব বাংলাদেশ’ বলে ডাকব।

তবে এর জন্য প্রয়োজন দেশজ সংস্কৃতি অন্তপ্রাণ মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন ও বিজ্ঞানমনস্ক জাতিগঠনে জোর দেয়া। ধর্মীয় অপব্যাখ্যার নামে নারীকে কোণঠাসা করে রাখা যাদের প্রয়াস তাদেরকে সুষ্ঠু চিন্তা কাঠামোয় আনাটা রাষ্ট্রেরই মহৎ দায়িত্ব। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে না দেয়ার বাহানা প্রগতির অন্তরায়।

চন্দ্র জয়ের পর ইসরোর নারী বিজ্ঞানীদের সহাস্য বদনগুলো আমাদের নারীদের অনুপ্রেরণা হোক। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা গবেষণা, অন্বেষণ ও আবিষ্কারে নূতন দ্বার উন্মোচনে মনোনিবেশ করুক। যাতে আমরাও গর্ব ও ভালাবাসায় বলতে পারি, হে বিশ্ব তোমার সভ্যতার ইতিহাস বিনির্মাণে আমরাও শ্রম ও সদিচ্ছা দিয়েছি।

আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেই কথাটিই জোর দিয়ে বলেছেন।

জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা।
জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্ত-টিকা।।

ধূ ধূ জ্ব’লে ওঠ ধূমায়িত অগ্নি,
জাগো মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নী!

মেঘে আনো বালা বজ্রের জ্বালা
চির-বিজয়িনী জাগো জয়ন্তিকা।।

লেখক: সাংবাদিক
৯ ভাদ্র ১৪৩০ | ২৪ আগস্ট ২০২৩

শেয়ার করুন: