গর্ভস্থ শিশুর রিমান্ডের আবেদন নামঞ্জুর!!!

সুচিত্রা সরকার:

শিরোনামে ভয় পাবেন না পাঠক। সত্য ঘটনা এটিই। আট মাসের শিশুর জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিলো। আদালত সেটা নাকচ করে, শিশুটিকে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এটা আকর সত্য। আর যে ঘটনার প্রবাহে এই কাণ্ডটি ঘটেছে, তা জানেন নিশ্চয়ই আপনি।
যদি না জানেন, ছোট করে বলি।

চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হয়েছেন। যে ফেসবুক লাইভের কারণে হয়েছেন, তার কিয়দংশ দেখেছি।
মাহিয়া মাহিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। মেহের আফরোজ শাওনের চলচ্চিত্রে দেখেছি তার অভিনয়। তার ডায়লগ থ্রোয়িং বা চেহারা কিংবা দুটি বা তিনটি বিয়ে- বর্তমান ঘটনার সঙ্গে কোনোটিরই যোগসূত্রতা নেই। তাই এসব থাক।
কেবল অপলক দেখলাম রিপোর্টটি। একজন নারী। পেছনে সামনে শ’খানেক নিরাপত্তাকর্মী তাকে নিয়ে যাচ্ছে কারাগারে।

যা দেখলাম না, মহামান্য আদালত যা দেখলো না, তা হলো, মেয়েটির ভেতরে একটি শিশুও কারাগারে যাচ্ছে।
প্রকৃত সত্যটি মনে রাখুন আপনি। বাচ্চা গর্ভ থেকে বের হলেই তার অস্তিত্ব প্রমাণ হয় না। তার বহু আগে শিশুটি প্রমাণ করে নিজের অস্তিত্ব।
প্রথমে মায়ের ঋতুচক্র বন্ধ করে। অত:পর আল্ট্রাসনোতে, স্টেথোস্কোপে হার্টবিট টিপ টিপ টিপ। শিশুর হৃৎপিণ্ড লাফানোর শব্দ।
সাত-আট সপ্তাহেই আঙ্গুরের দানা। তারপর হাত, পা, মাথা, মিষ্টি আর নরম কোমল আঙ্গুল হাতে পায়ে।
শিশুটি খাবারের স্বাদ বোঝে। বাতাসের ঘ্রাণ না পেলেও অনুভব করে। মায়ের হাসিতে সে হাসে, কান্নায় কাঁদে।

একটা ব্যক্তিগত অনুভূতি বলি।

কার্টুন দেখা বা কমিকস পড়া ছেড়েছিলাম বয়স চৌদ্দর মধ্যেই। অথচ এই দুটো কাজই আমি করেছি গর্ভকালীন পাঁচ থেকে দশ মাস অবধি। কত কার্টুন আর কত কমিকস যে আবার পড়েছি!
কারণ হরমোন চেইঞ্জ। বাচ্চার আর মায়ের হরমোন তখন মিলেমিশে একাকার। সুতরাং মায়ের কায়মনবাক্যে থাকে কেবল ভেতরের সন্তান।
যার অবয়ব, অস্তিত্ব পৃথিবী দেখে না। দেখে স্রেফ একটা পেট। মোটকা বেঢপ পেট। গ্ল্যামারহীন বিদঘুটে গর্ভ।
এরকম আট মাসের গর্ভ নিয়ে মাহি কারাগারে গেল।
বাদীপক্ষের জন্য কি ঘৃণা দেখানো উচিত? রিমান্ড চাওয়ার জন্য? পাঠক সর্বজ্ঞানী। বলুন আপনিই।

আদালতকে ধন্যবাদ রিমান্ড নামঞ্জুর করার জন্য। সাতদিনের রিমান্ডে মাহির কী হতো জানি না, শিশুটি নির্ঘাৎ…!
এই অষ্টম মাসের এক রাতে আমার গর্ভের উপরের চামড়া ফাটা শুরু করেছিলো। শিশুর আয়তন শরীরে আঁটাতে প্রকৃতি এই ব্যবস্থা করেছে। পেট বেলুনের মতো ফুলছে অথচ ফাটছে না। তাই চরম যন্ত্রণা সহ্য করো নারী।

কারাগারের ভেতরে মাহি এমন কষ্ট পাবে। থার্ড ট্রাইমেস্টার চলছে মাহির। গর্ভ বড় হবার কারণে ইউরিনের থলি জায়গা কম পায়। বারে বারে প্রশ্রাব পাবে। কারাগারে নিশ্চয়ই সে সুব্যবস্থা আছে।
এখন মার্চ মাস। গরম কাল। আমার তীব্র গরমবোধ হয়েছিলো। তীব্র মানে, কতটা তীব্র, বিবরণ না দিলে কেউ বুঝবে না।
মাহির এমন বোধ না হোক।
মাহির গর্ভকালীর ডিপ্রেশান আছে কিনা জানি না। বা হঠাৎ হঠাৎ খাবারের ক্রেভিং। কিচ্ছু জানি না।

মাহি ফাঁসির আসামী বা পলাতক খুনি (অনেক মামলায় খুনী বা ফাঁসির আসামীর সাজাও রদ হয়) কিনা, তাও জানি না।
জানবো কীভাবে, তাকে আমি চিনিই না। সে যে অপরাধ করেছে, তাতে ফাঁসি হবে না যাবজ্জীবন তা আদালতই ভালো জানবেন।
আমি শুধু জানি ওর ভেতরে একটি শিশু বাড়ছে এই পৃথিবীর জন্য।

শিশুটি কি জানে আট মাসেই সে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছে?
হায় খোদা, শিশুটিকে এই সত্য জানতে দিও না। জন্মলগ্নেই তীব্র ঘৃণা নিয়ে বড় না হোক মাহির সন্তান!
ভাল থাকুক পৃথিবীর সব মা, সন্তানসহ!

১৮.৩.২০২৩

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.