আমার শাশুড়ি মা

রিমি রুম্মান:

ইদানিং আম্মা আচানক কিছু কাজ করেন। আমরা ঘুমিয়ে গেলে আচমকা ঝড়ের গতিতে অন্ধকার রুমে এসে হাজির হন। ঘুম থেকে জাগিয়ে বলেন, ‘এই রিহান, রিহান, তোমার আব্বুজি কই?’ রিহান ঘুমঘোরে জড়ানো কণ্ঠে উত্তর দেয়, ‘ও কাজে যাইছে’। ‘কখন গ্যাছে? তুমি দ্যাখছো? নিজের চোখে দ্যাখছো? আমি দ্যাখলাম না ক্যান?’ এমন উপর্যুপরি প্রশ্নে ঘুমন্ত রিহান কেঁদে ফেলে। আধো ঘুমে পাশ থেকে বলি, আম্মা, আপনার ছেলে কাজে গেছে। যাওয়ার আগে চা খেতে খেতে আপনার সঙ্গে গল্প করেছে, ভুলে গেছেন? আম্মা ধমকে ওঠেন। মিথ্যা বলতেছ ক্যান? আমার ছেলে গত তিন দিন ঘরে ফিরে নাই। তার কী হইছে, আমাকে কেউ কিছু বলতেছ না ক্যান? 

পরদিন বৈকালিক চায়ের সময়ে আম্মার মুখোমুখি বসি। রোজ রাতের এইসব ঘটনা তিনি আর মনে করতে পারেন না। এই বয়সে মস্তিস্কের ভেতরে কী ঘটে জানার চেষ্টা করি। ‘আম্মা, আপনি কি ঘুমে বা জাগরণে স্বপ্ন দেখেন?’ জিগ্যেস করি। জানলাম, হ্যাঁ তিনি ঘুমন্ত এবং জাগ্রত, দুই সময়েই স্বপ্ন দেখেন বিরামহীন। ফলে পার্থক্য করতে পারেন না, কোনটা স্বপ্ন, আর কোনটা বাস্তব। কী স্বপ্ন দেখেন? জিজ্ঞেস করতেই ঠোঁটের কোণে সলজ্জ হাসি ঝুলিয়ে শাদা ঢেউ খেলানো চুল টেনে খোঁপা করেন। আঁচল তুলে ঘোমটা দিয়ে পরিপাটি হয়ে বসেন। যেন উত্তর দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারপর বলেন, ‘আমি তো দোয়া-দরূদ পড়ে ঘুমাই। তাই আজেবাজে ভয়ের স্বপ্ন দেখি না।’

কী দেখেন? বললেন তিনি দেখতে পান, শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সহ বিশাল এক একান্নবর্তী পরিবারের যাপিত জীবন। সেই ঘর। সেই উঠান। ৪০/৫০ বছর আগে যে জীবন যাপন করে এসেছেন, সেই সময়টিই স্পষ্ট দেখতে পান চোখের সামনে, ঘুমে কিংবা জাগরণে। আম্মা সেই সময়কেই বর্তমান বলে ভ্রম করেন। মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলেন, হাসেন। তারাও আম্মার সঙ্গে কথা বলে( যদিও তাদের অধিকাংশই মৃত)। অর্থাৎ আম্মা একটি দীর্ঘ অলীক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়টা যাপন করছেন। যেখানে বাস্তবতার ছিটেফোঁটা নেই। চিন্তাশক্তি, অনুভূতিশক্তি ও বাস্তবতাবোধ নেই। একটা ঘোরের জগতে বাস করছেন তিনি। এটা একরকম ‘হেলুসিনেশন’।

গত ডিসেম্বরে আমি দেশে বেড়াতে যাওয়ার সময় আম্মা আমায় জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। দোয়া পড়ে ফু দিয়েছেন। দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, দৃষ্টিসীমায় মিলিয়ে যাওয়া অব্দি। তারপর পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে অভিযোগ করেছেন, ‘আমাকে বলে যায় নাই’ বলে। দেশ থেকে ফেরার পর এক অপরাহ্ণে লাগেজের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এইগুলা এইখানে ক্যান! বলি, আমি দেশ থেকে এসেছি, তাই। আম্মা চমকে ওঠেন। বিস্ময়ে বলেন ‘তুমি দ্যাশে গেছিলা? কবে গেছিলা?’

সন্ধ্যার পর রিহান হোমওয়ার্ক নিয়ে বসে রোজ। আম্মা পুরোটা সময় তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করেন। ‘রিহান, হোয়াট টাইম?’ রিহান মাথা তুলে একবার ঘড়ি দেখে বলবে, সেভেন থার্টি। কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার প্রশ্ন, ‘রিহান, হোয়াট টাইম?’ রিহান এবার আর মাথা না তুলেই বলতে থাকে সেভেন থার্টি ওয়ান, সেভেন থার্টি টু…! বেচারা পড়ায়, গেইমস খেলায় মনোযোগ দিতে পারে না। তাই বলে এই বয়েসী অন্য কিশোরদের মতো রেগে যায় না। দুই ভাই-ই দাদীর প্রতি সহনশীল, ও নমনীয়। কেনো? বছর চারেক আগে বারবার একই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একদিন রেগে গিয়েছিল তারা। ‘ডিমেনশিয়া’ শব্দটি সার্চ দিয়ে দুইজনকেই এ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে দিয়েছিলাম। এরপর আমার আর কোনোদিনই কিছু বুঝিয়ে বলতে হয়নি। বরং তাদের এই দুর্দশায় দুঃখপ্রকাশ করলে উল্টো আমায় শান্তনা দিয়ে বলবে, ‘থাক থাক। কিছু হবে না, আম্মু’।

একরাতে আম্মাকে ডিনার দিলে তিনি তা খেতে অস্বীকৃতি জানান। বিস্ময়ের স্বরে বললেন, সকাল বেলায় কেনো ভাত খাবো? বললাম, এখন রাত সাড়ে দশটা। তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করলেন না। তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে বলি, আম্মা, বাইরে দেখেন, ঘন অন্ধকার। সকাল হলে তো রোদ থাকত। দিনের আলো থাকত। আম্মা বিমর্ষমুখে বাইরে বেলকনির দিকে তাকায়। অন্ধকারে পত্রপল্লবহীন গাছের ডাল দুলে ওঠে বাতাসে। আমি আম্মার দিকে দৃষ্টি ফেরাই। হাত ধরে ডায়নিং টেবিলের দিকে নিয়ে যাই। ছোটবেলায় দাদা, নানার বাড়ি গেলে মাটির চুলায় রান্না শেষে আলু পোড়ানো হতো। আম্মার হাতের কুঁচকে যাওয়া চামড়া সেই পোড়া আলুর মতো, জীর্ণ। তিনি আরেকবার ঘার ঘুরিয়ে বাইরে তাকান। যেন, একদা জীবন নিয়ে উচ্ছ্বসিত মানুষটি অন্ধকারে জীবন খুঁজে বেড়ায় ঘোলাটে চোখে।

পরদিন ভোরের দিকে, তখনো চরাচরে আলো ফোটেনি। সকলেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সুনসান নীরবতা। আমি সন্তানদের নাস্তা তৈরি করছি রান্নাঘরে। এমন নীরবতার মাঝে আচমকা ঝড়ের বেগে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন তিনি। আলুথালু বেশ। ঢেউ খেলানো সাদা উসকোখুসকো চুল উড়ছে। আঁচল সিঁড়িতে, মেঝেতে বহুদূর অব্দি গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমি ফ্রাইপ্যানে পরোটা উল্টে দিয়ে পেছনে তাকাই। আম্মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটছেন তার একমাত্র পুত্রের রুমের দিকে। চুলার আঁচ কমিয়ে আম্মাকে অনুসরণ করি। আধো অন্ধকারে মাথা নুইয়ে ঘুমন্ত পুত্রকে খুব কাছ থেকে দেখেন। তারপর দরজা বন্ধ করে একই গতিতে ফিরে আসেন। জিগ্যেস করি, ‘কী হয়েছে আম্মা?’ আম্মা হাত নেড়ে ইশারায় ‘না’ সূচক উত্তর দেয়। অর্থাৎ ‘কিছু হয়নি’। ‘আপনার কি মনে হচ্ছে আপনার ছেলে বাড়ি ফিরে নাই?’ আমি আবারো জানতে চাই। ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নেড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের রুমের দিকে ছুটে যান। সেই মুহূর্তে আম্মাকে আমার গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা উথালপাতাল ঢেউয়ের ডাকাতিয়া নদীর মতো মনে হচ্ছিল। হাতের কাজ শেষে আম্মার রুমের দরজা সামান্য খুলে দেখি, অন্ধকারে নিঃঝুম শুয়ে আছেন। যেন অনন্ত নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে আকাশী-নীল ভারী পর্দা টানানো রুমটিতে।

‘আমার কাপড় রাখার আলনা, আলমিরা, খাট, কিছুই আর অবশিষ্ট নেই…’ বিদেশে বসে প্রায়শই এমন অভিযোগ করেন ম্লান মুখে, একবুক বেদনা নিয়ে। কয়দিন এক নাগারে বলতেই থাকেন বিরামহীন। গ্রামের বাড়িতে এখন পুরনোর পরিবর্তে নতুন আসবাব শোভা পাচ্ছে। কিন্তু স্মৃতিময় সেইসব ব্যবহার্য পুরোনো আসবাবের অনুপস্থিতি আম্মাকে দারুণভাবে দুঃখী করে রাখে। আমি সান্ত্বনার স্বরে বলি, ‘মানুষই তো থাকে না চিরকাল, আসবাব দিয়ে আর কী হবে, আম্মা?’
আজ ১২ই মার্চ, শাশুড়ি আম্মার জন্মদিন। ১৯৪২ সালের এইদিনেই তিনি জন্মেছেন কিনা, জানেন না।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন: