মায়ের একক পরিচয়েও বড় হতে পারবে সন্তান

কানিজ আকলিমা সুলতানা:

পিতৃপরিচয়হীন সন্তানের অভিভাবক হবেন মা। মানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা পাসপোর্টে বা কোনো ফর্ম ফিলাপ করতে পিতার নাম লেখা আর বাধ্যতামূলক নয়, মায়ের নাম লিখলেই হবে, এটা সদ্য প্রাপ্ত হাইকোর্টের রায়।

স্বাগতম এই রায়কে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক এক রায়।

উত্তর ফাল্গুনী সিনেমার কথা মনে পড়ছে। বাঈজী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেন। পিতার পরিচয় দিতে পারেননি বলে কন্যাকে স্কুলে ভর্তি করাতে আরেক পুরুষের নাম দিয়ে আড়ালে চলে যেতে হয়েছিল তাকে। কন্যা জানতো মা মারা গেছে। মায়ের বন্ধু সেই পুরুষকেই বাবা বলে জেনে ব্যারিস্টার হয়েছিল সে। মা আর কোনোদিন সন্তানের সামনে যায়নি। একবুক বেদনা নিয়ে আড়াল থেকে নিজের মেয়ের বেড়ে উঠা, বড় হওয়া ও সফলতা দেখে গেছে।

এই সমাজে এমন বহু নারীকে, বহু সন্তানকে মানবিক পরাজয়ের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে শুধুমাত্র একটা নামের জন্য। কারণ এই নামটা তার পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু “পিতৃপরিচয়হীন সন্তান” শব্দটাতেই এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় যে পিতার পরিচয় গোপন করেও সন্তান জন্ম নিতে পারে। পিতার উপস্থিতি ছাড়া, একটা ক্ষণের অংশগ্রহণ ছাড়া, দীর্ঘ গর্ভধারণ প্রক্রিয়া ও প্রসব বেদনায় পিতার অংশগ্রহণ ছাড়াই সন্তান জন্ম নিতে পারে। যে সন্তান দশমাসের প্রতিপল মায়ের শরীরের ভিতরে ভ্রুণ থেকে মানব হয়ে উঠে, নিজের নাভিমূল দিয়ে মায়ের শরীর থেকে খাদ্যরস নিয়ে যে মায়ের পেটে বেঁচে থাকে, হাত-পা ছুঁড়ে জানান দেয় সে ভালো আছে তার পরিচয় নাকি পিতার নামে! যাকে জন্ম দেয়ার সময় এলে মায়ের জরায়ুর মুখ খুলে যায়, নিতম্বের হাড় সরে শিশুকে মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসার পথ করে দেয়, ৫৬ টা হাড় একসাথে ভেঙ্গে যাওয়ার তীব্র ব্যাথার মত প্রসব ব্যথায় চিৎকার করতে করতে একসময় যে মা নবজাতকের চিৎকার শুনে অপার্থিব আনন্দে এলিয়ে পড়ে, নবজাতকের জন্য যে মায়ের বুকে দুধ জমা হয়, সে মা নাকি সন্তানের পরিচয় নয়, অভিভাবক তো নয়ই!

শতাব্দীর পর শতাব্দীর বেদনা শেষে, অবশেষে মায়ের পরিচয় যথেষ্ট করেছে হাইকোর্ট। যদিও এটা পিতৃপরিচয় থাকা সন্তানের অভিভাবকত্ব নয়। মায়েরা সন্তানের অভিভাবক হতে হলে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হয়। সেটাও মা-বাবা একসাথে থাকার সময় নয়। মা-বাবার বিবাহিত জীবন আলাদা হয়ে গেলে অথবা বাবা মারা গেলে সন্তানের অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে মাকে আইনী লড়াই লড়তে হয়। এই পুরুষতান্ত্রিক আইন পিতার অবর্তমানে পিতার পিতা বা পিতার ভাইকে অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সন্তান পালনের পূর্ণ শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকার পরেও জন্মদাত্রী মাকে বছরের পর বছর আইনী প্রক্রিয়া চালাতে হয় সন্তানের অভিভাবকত্ব পেতে। অথচ অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব বা শারীরিক, মানসিকভাবে অযোগ্য অথবা সন্তানের প্রতি দায়িত্বহীন পিতাও আইনগতভাবে সন্তানের ন্যাচারাল অভিভাবক হয়! কী বৈষম্য, নারীর প্রতি কত অমর্যাদাকর এই আইন!

আমার পুত্রদের পিতার পরিচয় আছে। তাদের পিতার সাথে আমার সম্পর্কও দ্বন্দ্বের নয়। তবুও যখন ওদের স্কুলের বা যেকোনো ফর্ম ফিলাপ করতে শুধু পিতার নাম লিখতে হতো, তখন আমার মনের গহীনে বেদনা হতো। আমাকে অধিকারহীন করে দেয়ার ব্যবস্থাকে একজন মায়ের প্রতি রাষ্ট্রের চরমতম অন্যায় মনে হতো, হয়। প্রকৃতি যে মাকে সন্তানের জন্য নির্ধারণ করলো, প্রকৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যম করলো, সেই মা কেন ন্যাচারাল অভিভাবক হতে পারবে না, এর যথাযথ উত্তর কোথাও নেই। আসলে উত্তর দেয়ার মত কিছু নেই। সবাই বোঝে এটা নারীকে দমন ও অধিকার হরণ করার পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। পুরুষতন্ত্র বুঝেছে প্রাকৃতিকভাবেই মা ও সন্তানের বন্ধন অবিচ্ছেদ্য এবং নারীর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা তার সন্তান। এটা দিয়ে নারীকে আটকানো ও বঞ্চিত করা সহজ। এই সিস্টেম একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক বুঝেশুনে সমাজপতিরা হীন উদ্দেশ্যে এই আইন তৈরি করেছে। তবে বহুদিনের অচলায়তনে ফাটল ধরেছে। ফর্ম পূরণে পিতার নাম বাধ্যতামূলক নয়, এই রায় সেই ফাটল গলে অচলায়তনে পড়া আলোকরশ্মি। নারীর অধিকার নিয়ে ক্রমাগত লড়াইয়ের ফলাফল এটা।

এই রায়টা এসেছে একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ ধরে।

“২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পূর্বে শিক্ষার্থী তথ্য ফরম এ অত্যাবশ্যকীয়ভাবে বাবার নাম পূরণ করতে না পারার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী ঠাকুরগাঁও জেলার এক তরুণীকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রবেশপত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায়। মা ও সন্তানকে কোনরূপ স্বীকৃতি না দিয়ে বাবার চলে যাওয়ার পর উক্ত তরুণী তার মায়ের একার আদর স্নেহে বড় হয়েছিলেন। পরবর্তীতে এ ঘটনার যথাযথ অনুসন্ধানের উপর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এবং সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মা এর স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২০০৯ সালের ২ আগস্ট ৩টি মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং নারীপক্ষ যৌথভাবে জনস্বার্থে রিট দায়ের করে।” (দেশরূপান্তর)

এই রায় পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার আংশিক বিজয়। এই বিজয় এই বার্তা দেয় যে আইনের মধ্যে যত অন্ধকারই থাকুক, চাইলে নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। মনেপ্রাণে চাই প্রজন্ম একটা সুস্থ ও আনন্দময় সমাজে বাস করুক। নারী পুরুষের বৈষম্য দূর হোক। মা ও বাবার অধিকার সমান ও দুজনেই সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক হোক। সচেতন মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসে পূর্ণ বিজয় আসবেই, এই বিশ্বাস করি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.