আদালতের যুগান্তকারী রায়: পুরুষতন্ত্রের মুখে আরেকটা চপেটাঘাত

উইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক:

“বাবা না থাকলেও অভিভাবক হিসেবে মায়ের নাম যুক্ত করতে হাইকোর্টের স্বীকৃতি। আইনজীবীরা জানান, এই রায়ের ফলে বাবা-মায়ের উভয়ের নাম লেখার বাধ্যবাধকতা থাকলো না। শুধু মায়ের নাম লিখেও যেকোনো সরকারি ফরম পূরণ করা যাবে। মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট আইনুননাহার সিদ্দিকা, এস এম রেজাউল করিম ও আয়েশা আক্তার। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত।
রায় ঘোষণার পর অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তার সাংবাদিকদের জানান, এ রায়ের ফলে এসএসসি, এইচসি পরীক্ষার ফরম পূরণ, পাসপোর্টের ফরম পূরণসহ সব ফরম পূরণে বাবা অথবা মা অথবা আইনগত অভিভাবকের নাম লেখা যাবে। এই রায়ের ফলে বাবা-মায়ের উভয়ের নাম লেখার বাধ্যবাধকতা থাকলো না। শুধু মায়ের নাম লিখেও ফরম পূরণ করা যাবে। (ঢাকা ট্রিবিউন, ২৪ জানুয়ারি ২০২৩)

রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ছাড়াও অনলাইনে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি অভিনন্দন এবং সন্তুষ্টি প্রকাশের পাশাপাশি নারীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে দেখা হচ্ছে এই রায়কে। নারী আন্দোলনের ইতিহাসে এ অন্যতম মাইলফলক হয়েই থাকবে। অনেকেই অনেকরকম প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। তার কয়েকটা এখানে তুলে ধরা হলো উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকদের সুবিধার্থে।

শেলী নাজ:

নদীকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করাতে নিয়ে গেছি। ভর্তি সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম ঠিকঠাক মতো শেষ হলো। তারপর ঝামেলা লাগল অভিভাবক কার্ডে অভিভাবক হিসেবে কার নাম দেওয়া হবে সেটা নিয়ে। তার আগে এক দফা হেস্তনেস্ত করা হয়েছে প্যারেন্টস ইন্টারভিউ এর সময়। সবাই জোড়ায় জোড়ায় ঢুকছে অধ্যক্ষ মহাশয়ের রুমে, আমি বেজোড় হয়ে ঢুকেছি। চোখ কপালে তুলে অধ্যক্ষ মহাশয় বললেন, ছাত্রীর পিতৃদেব কোথায়? যেন জগতে আমিই একমাত্র পাপিষ্ঠা যার একখান স্বামী নাই।
বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন করলেন, মনে পড়ে সিটি কর্পোরেশন অফিস থেকে বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধনের কাগজপত্র এনে জমা দিয়েছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি এমন কথাও বল্লেন যে এধরনের ছাত্রীদের তারা রাখেন না, এরা খুব প্রব্লেমেটিক হয়! এই বুঝি ভর্তির খাতা থেকে তার নাম কাটা যায়, সেই ভয়ে আমাদের মা মেয়ের মুখ শুকিয়ে কাঠ, বুক চৌচির। অপরাধী হিসেবে তার সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আমাদের মুক্তি মিলল। তারপর আসল ঝামেলা শুরু হলো। অফিসের প্রধান করণিক কিছুতেই অভিভাবক কার্ডে আমার নাম লিখবে না। তিনি তার নুরানী চেহারার আলো ছড়িয়ে দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বল্লেন, ইসলামী আইনে নারী কখনও সন্তানের অভিভাবক হতে পারে না। তাই তিনি পিতার নামই লিখবেন। আমি তাকে শান্তভাবে আমার পরিস্থিতি বুঝিয়ে বল্লাম, মনে হলো তিনি বুঝলেন। কিন্তু কার্ডটা হাতে পাওয়ার পর দেখলাম সেখানে পিতার নামই জ্বলজ্বল করছে। সেই নাম চেন্জ করে অভিভাবক কার্ডে আমার নাম লেখাতে অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সেদিন। পুরুষতন্ত্র আমাকে যত লাঞ্চনা ও গন্জনা দিয়ছে বলা বাহুল্য তা পায়ে দলে নিজেকে ভেঙে মুচড়ে এতদূর পর্যন্ত এনেছি। পাল্টা আঘাত হানতে চেয়েছি কখনও কবিতায়, কখনও জীবনাচরণে। কিন্তু বড় পরিবর্তন আনতে আইনের সংস্কার জরুরী।
আজ হাইকোর্টের যুগান্তকারী ঐতিহাসিক রায় পুরুষতন্ত্রের গালে একটা বিরাট চড়। জয় হোক নারীশক্তির !

 

সুমাইয়া অনন্যা:

মা’য়ের প্রেগ্ন্যাসির সময় বাপের হুটহাট লাপাত্তা হইয়া যাওয়া, কন্যা সন্তান জন্মের কারণে আরেক বিবাহ করা, কন্যা সন্তানের মাতা রে ত্যাগ কইরা কেবল মাত্র পুত্র সন্তান ও তার মাতার সহিত বাপের জীবন অতিবাহিত করা… এগুলা ক্ষমা করা গেলেও কিছুই ভুলবো না আমি।
সেই দেড় বছর থিইকা আমার মাতা একলা আমারে বড় করছে, আজকে আমার বয়স ২২। কিন্তু সেই ছোট্ট থিইকা প্রতিটা কাজে, একাডেমিক, ননএকাডেমিক সব কিছুতে আমার বাপরেই আমার অভিভাবক দেখাইতে হইসে।
এই সেই দিনও ভার্সিটি, হলের কাগজে বাপেরে মূল অভিভাবক লিখতে হইসে, তার আয় লিখতে হইসে যার কিছুই আমি জানতাম না, লিখতে চাইতাম না। অথচ সেদিন সেই ভার্সিটিরও ভর্তির টাকাটা বাপের কাছে চাইলে সে মুখের ওপর “না” করে দিছিলো, তখন ওই আমার পার্টটাইম চাকরির বেতন আর মা-ই শেষ ভরসা ছিলো।
তবে তখন সব জায়গাতেই বলছিলাম, বাপের সাথে তো যোগাযোগ নাই- এইগুলা দিয়ে কী হবে? তার আয় দিয়ে আমার কী হবে? আমার পেছনে কারো আয় ব্যয় হইলে সেটা হলো আমার মা’য়ের!
তারপর তারা তখন সমাধান দিলো, ঠিকাছে বাবার ঠিকানা, আয় এগুলাতে মা’য়েরটাই লিখে দেও। আপাতদৃষ্টিতে ওকে মনে হইলেও জিনিসটা কত অপমানজনক ছিলো! যে আসলে দায়িত্বটা পালন করতেছে তারে প্রকাশ্যে আনা যাবে না, মানা যাবে না, লেখা যাবে না!
কী বিরক্তিকর ও একইসাথে অপমানজনক!
বাপ নাই, এখন তাই তার ওপর ক্ষোভ, রাগ নাই, কিন্তু এতোসব ঘটনা তো ভুলে যাওয়া যায় না, মায়ের সেসব দিনের অসহায় মুখ তো ভুলে যাওয়া যায় না!
খবরটা দেখে আমার আনন্দে চোখে পানি চলে আসছে। মায়েরেও ফোন দিয়া এসব জানায়া দুইজন একসাথে আনন্দে গদগদ হইলাম।
মা বললেন, যাক! তোর পথ সহজ না হইলেও আজ থিইকা তো অন্য অনন্যা’দের পথ কিছুটা সহজ হবে!

 

হিল্লোল দত্ত:

উচ্চাদালতের একটি রায় নিয়ে বাংলাদেশের অনলাইন জগতে বেশ কথা হচ্ছে। রায়ের সারমর্ম, এখন থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে ফর্মপূরণে মায়ের নাম দিয়েই কাজ চলবে। অভিভাবক হিসেবে পিতার নাম বাধ্যতামূলক নয়।
এই রায়ের পেছনের ইতিহাস সকরুণ৷ একজন নারী মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীকে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পিতার নাম ছাড়া পরীক্ষার ফর্মপূরণে বাধা দেওয়ার খবর গণমাধ্যমে আসায় আজ থেকে ১৪ বছর আগে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ও নারীপক্ষ ২০০৯ সালে একটি রিট মামলা দায়ের করে। এতদিন পর এর চূড়ান্ত রায় মিলল।
অনেকেই দাবি করছেন, এই রায়ের বাস্তবায়ন সবখানেই হবে, কিন্তু প্রথম আলোর প্রতিবেদনে তেমন কিছু দেখতে পেলাম না। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বাকি সবখানে পিতার নামের বিকল্পে মায়ের নাম ব্যবহার্য, এরকম কোনো তথ্য খুঁজে পাইনি। কেউ বিশদ ব্যাখ্যা দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।
নারীর নিজের সন্তান নিয়ে একার লড়াই বিশেষত আমাদের মত নারীবিদ্বেষী দেশে যে কী পরিমাণ কঠিন, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন৷ আমার পরিচিত একাধিক নারী রীতিমত নরকযন্ত্রণা ভোগ করেছেন এমন সব আইন বা নিয়মের কারণে যা ঠিক নারীবান্ধব বলা যায় না সম্ভবত। আমি এরকম নারীর কথাও জানি, যিনি পিতার আইনি লড়াইয়ের হাত থেকে নিজের সন্তানের উত্তরাধিকারের দাবি বাঁচাতে নীরবে দেশত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছেন প্রবাসে। কিংবা, পলাতক আসামির মত জায়গা বদলেছেন সদাসতর্ক শিকারের মত, যেন বুকের ধন কেড়ে নিতে কেউ না-পারে। অনেক সময় বাবাদের কাছে যা প্রেস্টিজ ইস্যু, তা মায়েদের কাছে জীবনমরণের বিষয়। তবে বুবলির বা অপুর মত আত্মসম্মানের দিক থেকে কিছুটা ঊন মাও আছেন।
আবার, বিপরীতমুখী ঘটনাও যে নেই, তা বলা মুশকিল। তবে সন্তানকে মায়ের চাইতে বেশি কেউ ভালোবাসেন কিনা, সেই প্রশ্ন চিরকালের। বাবারা, দুঃখজনকভাবে, এখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
নারীদের অনেক পথচলা আজো বাকি, বাকি অনেক প্রাসাদ জয় করার। এবং, এই কাজে নারীপুরুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে প্রাগ্রসর মানস ও মনন ধারণ করে। ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র যুগে যুগে বাধা দিয়েছে, দেবেই। মানুষেরাও সহজে ছাড় দেবে না। গণমাধ্যমে এই খবরে নিচে আমজনতার প্রতিক্রিয়া দেখলেই বিবমিষা জাগে। সন্তানের পিতৃপরিচয়ের মত ক্ষমতার লাগাম হাতছাড়ার আশঙ্কায় এখন জারজ সন্তান, পরকীয়ার বৈধতা, এবং কদর্যতম বিষয়াশয় মিলিয়ে ঘোঁট পাকিয়ে নারীদের প্রতি কুৎসিত বিদ্বেষের অন্তর্লোক উন্মোচনের পাগলাটে প্রদর্শনী চলছে। বোঝা যায়, পিতৃতান্ত্রিক প্রাণভোমরার মোক্ষম জায়গাতেই আঘাতটি লেগেছে।
আমরা আশা করব, সন্তানের ওপর নারীর এই অধিকার আইনিভাবে বিস্তৃত হোক সর্বক্ষেত্রে যা এতদিন বাধা দেওয়াটাই চরম অন্যায় ছিল। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই সন্তানের অধিকার পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে হোক। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়, সেখানে দায়িত্বশীল মা যেন অধিকার পান, সবদিক বিবেচনা করে। শহিদ আজাদকে যে মাবাবার বিচ্ছেদের পরেও বাবার নাম লিখতে হত, তা কি তাঁর জন্যে চরম অপমানের বিষয় ছিল না?
আজ কেন যেন বারবার মনে পড়ছে ছান্দোগ্যোপনিষদের সেই সত্যকামের কথা যিনি গুরুগৃহে শিক্ষালাভের জন্যে যাওয়ার আগে পিতৃপরিচয়ের অভাবে মায়ের কাছে এসেছিলেন, যাঁর মা জবালা জবাব দিয়েছিলেন, তোমায় যৌবনকালে বহুভর্তার সেবা করে পেয়েছি, তাই তোমার পিতার নাম আমি জানি না। নিষ্পাপ সত্যকাম অকুণ্ঠমনে এই সরল সত্য গুরুগৃহে উপস্থাপন করলে অন্য শিক্ষার্থীদের ব্যঙ্গহাসির শিকার হন তিনি। কিন্তু তাঁর গুরু গৌতম ঘোষণা করেন, তিনি সত্যভাষণ করেছেন, তাই তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ৷ এবং তাঁকে গুরুগৃহে থাকার ও শিক্ষালাভের অনুমতি দেন। মায়ের নাম জুড়ে তাঁর নাম হয় সত্যকাম জাবালি। এই নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অমর কাব্য ব্রাহ্মণ। এই জাবালি পরে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করেন এবং জাবাল উপনিষদ নামে একটি উপনিষদের রচয়িতা তিনি।
আমরা কেউ তাঁর পিতার নাম জানি না, কিন্তু আজও অমর হয়ে আছে সেই তথাকথিত জারজ সন্তানের মায়ের নাম। সেই পরিস্থিতি থেকে আজ আমরা ঠিক কতদূর এগুলাম? নজরুল তো বলেইছিলেন, কামজ ও জারজ সন্তানের পার্থক্য তিনি দেখেন না। মাতৃদুগ্ধ কেন্দ্রের মত মহান উদ্যোগও এরকম দুপেয়ে ইতরদের হামলায় হওয়া সম্ভবপর হয়নি, যা নিতান্ত জরুরি ছিল।
মায়ের কাছে সন্তানের অবস্থান, বেড়ে-ওঠা, এবং পথচলা নিরাপদ, নিষ্কণ্টক, ও নির্ভার হোক পারিবারিক, সামাজিক, ও রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.