ভুল হোক বা সঠিক, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে হয়

লতিফা আকতার:

এক লাইনে নারীর ক্ষমতায়ন বলতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণকেই বোঝায়, তাই নয় কি?

* নারীর জীবন আর সিদ্ধান্ত গ্রহণ!! এখনও এই কনসেপ্ট খুব একটা যায় না উপমহাদেশের সাথে। কেন যায় না? সে বিষয়টা আজও স্পষ্ট করে উঠতে পারিনি আমরা। কেন পারিনি? এমন প্রশ্নের উত্তরে আমার একটা জিনিসই মনে হয় যে আজও আমরা মানে নারীরা স্বপ্নের জগতে বাস করি। আজও আমরা ভাবি, কেউ একজন আসবে, আমাকে খুব সুখী করবে। সে আমাকে খাওয়াবে, পরাবে, সেইসাথে আমার সকল শখ পূরণ করবে। আর আমি তাঁকে রূপে, রন্ধনশিল্পে, ঘরকন্নায় ভুলিয়ে রাখবো। দ্বাবিংশ শতাব্দীতে যা অনেকটাই খেলো। ইউটিউব ঘাঁটলে সবাই রাঁধুনি, দেশের বাইরে থাকা লোকজন যেটার সঠিক প্রয়োগ করে। আর টেস্ট বহমান বিধায় সেটায় আঁকড়ে থাকা পুরাই একটা লস প্রজেক্ট। যে প্রজেক্টকে কখনই স্থির করা যায় না সাফল্যের দৃষ্টিকোণ থেকে।

* এই চাওয়ায় নারীর ইনভেস্টমেন্ট কী? রূপ, শরীর, বাপের অবস্থান? স্থূলভাবে এগুলোই তো! শিক্ষার হার বেড়েছে। বাবার টাকা, সরকারের দেয়া ভর্তুকি আর নিজের মেধার সমন্বয়ে যে অর্জন, তাও অধিকাংশ মোটামুটি, শেষমেশ ঐ চাওয়ার মাঝেই পর্যবসিত হয়। মনস্তত্ত্বের কোথাও না কোথাও একটা বিপত্তি রয়ে গেছে। মেইনস্ট্রিমে সক্ষমতা বলতে যা বোঝায়, নারী আজও সে স্ট্রিমে শক্তপায়ে চলতে শেখেনি।

* কেন হাঁটতে পারেনি, সেটা আমরা কখনো খুঁজে বার করার চেষ্টাও করিনি। বেড়ে ওঠায়, শৈশব হতে একটা ছেলে, এ জেনে বড় হয় যে, তাকে নিজের বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়ার পাশাপাশি, আগত দিনে আরও কিছু মানুষের দায়িত্বও নিতে হবে। সবার জন্য অনেক করতে হবে। মানে এ টু জেড বলি যাকে আমরা। তো সে চিন্তা তাকে ঘুমাতে দেয় না, সাথে নিজের কিছু স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষাও তো রয়েই যায়।

* অথচ এই একটা জায়গায় কন্যা শিশুকে কখনও সেভাবে ভাবতে শেখানো হয়নি, ভাবে না বলে আর্থিকভাবে সক্ষম হয়ে ওঠা আজও তার শখই রয়ে যাচ্ছে বা ‘চয়েজ’। কর্মজীবী নারী হয়ে ওঠা হলো একটা শখ বা চয়েজ, পুরোপুরি প্রয়োজন নয়। সেই শখকে অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রতি মুহূর্তে কতো রকম হ্যাপা যে সয়ে যেতে হয়! চাকুরি যদি করতে না দেই?? এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি, এমন কর্মজীবী নারীর সংখ্যা এ সমাজে নেহায়েত কম নয়।

* অথচ এই জায়গাটা এমন হওয়া উচিত ছিলো- দু’জনের সংসারে, দু’জন মিলে ঘরে-বাইরে পরিশ্রম করা হবে, সবাই ভালো থাকার দায়িত্বে, কেউ একা দায়িত্ব নেবে না। মিডল ক্লাস থেকে উঠে আসা ছেলেপেলেরা ঘরে বাইরে পরিশ্রম করলে অনেক শখ পূরণ অনায়াস হয়, আমার বাবা এ কথাটা সব সময় মাথায় ইমপুট করতেন।

* যৌথ জীবন আমি তুমিতে হয় না। “আমরা” এই শব্দটা হলো পারফেক্ট। আমরা যদি হয়ে ওঠা যেতো, সমাজের আপামর কাঠামোই বদলে যেতো। একটা দেশের ব্যক্তি জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে গিয়ে, দেশটা যে তলানিতে পৌঁছাচ্ছে, সেটাও হয়তো কমে আসতো। আর আন্তর্জাতিক বাজারের যে ঊর্ধ্বগতি, যেটা প্রয়োজন মিটিয়ে আপন শখগুলোকে যেভাবে দাবিয়ে রাখে, সেটাও নাগালের বাইরে না থেকে কিছুটা হলেও নাগালেই রয়ে যেতো।

* খুব সহজভাবে বলি- আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সেইসব দেশ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচাইতে এগিয়ে, যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, রাষ্ট্র পলিসির ভিত অনেক শক্ত। এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসাব করলে সেটা কিন্তু ব্যক্তি জীবনটায়ই এসে ঠেকে।

* একটা বিষয় ভেবে দেখেন- ঘরকন্নায় ত্যক্তবিরক্ত হয়ে যে অভিযোগ করা হয়, তার অধিকাংশই হলো- ” ও আমার জন্য এই করলো না, প্লেট বাটি ধুইলো না, বাচ্চারে আমিই স্কুলে দিয়ে আসি, সে ফিরেও তাকায় না, এক বাজার তাও আমাকেই করতে হয়।” কী খেলো সব অভিযোগ!! আর উত্তরে আপনি কী পান সেটা নিজেই ভেবে দেখেন। অমন শক্ত উত্তর দেয়া হয়, কেননা আপনি উত্তরদাতার নিকট নির্ভরশীল সদস্য, আর যাকে ঐ ব্যক্তির টাকায় একটা হেল্পিং হ্যান্ডও রেখে দেয়া হয়।

* আজকাল অফিসের কাজে প্রান্তিক লেভেলের মানুষের কাছে বেশ যাওয়া লাগে। সেখানটায় গেলে বেশ হতাশা গ্রাস করে আমাকে। অধিকাংশ নারীই অলস সময় কাটায়। আর এই কারণে তার চেহারা, তার আচরণ অনেকটাই ছন্দহীন লাগে। অথচ এই একই জায়গায় আবার কিছু নারী সক্ষমতায় উজ্জ্বল। আত্মবিশ্বাস, কর্মক্ষমতা, উপার্জনক্ষমতা চেহারায় যে বাড়তি সৌন্দর্য বা উজ্জ্বলতা আনে, পৃথিবীর কোন দামী শাড়ি, গয়নাও সেটা আনতে পারে না।

* ভেবে দেখেন সক্ষম হবেন, নাকি অভিযোগের ভাণ্ডারেই বসবাস করবেন?? জীবনের সব সিদ্ধান্ত সব সময় সঠিক হবে না, কিন্তু কারও চাপিয়ে দেয়া কিছুর চেয়ে নিজের সক্ষমতায় নেয়া ভুল সিদ্ধান্ত হয়তো খুব একটা পীড়া দেয় না। যদি সে সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায় ঘরে থাকারও হয়ে থাকে। যাই হোক, ভুল হোক বা সঠিক হোক, সিদ্ধান্তটা একান্ত নিজেরই হোক। চাপিয়ে দেয়া যেন না হয়।

* আর যদি সেটা না হয়, তাহলে সহজ করে একটা কথা বলে যাই, পার্লারে আয়দিন দৌড়ে যে নিজেকে অন্যের দৃষ্টিতে সুন্দর করে তোলেন, খেয়াল করলে দেখবেন, আপনাকে সুন্দর করে তোলা ব্যক্তিটি কিন্তু আপনার আমার মতোই একজন নারী। বাকিটা নিজে চিন্তা করেন। মস্তিস্কের ব্যায়াম হবে, সাথে ঝাপসা কিছু বিষয় ক্লিয়ার হওয়ার পাশাপাশি, হয়তো কিছু সিদ্ধান্তও চলে আসতে পারে। যা একান্তই আপনার হয়ে উঠবে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.