না জেনে বলার চেয়ে, সময় নিয়ে জেনে বলুন

দিনা ফেরদৌস:

বাইরে থেকে কারো সংসার সম্পর্কে কোন কিছুই আঁচ করা সম্ভব না। ফেইসবুকের ছবি দেখে হিসাব মিলালে সকলেই ভালো আছেন। কথা হচ্ছে ভালো না থাকার বিষয়টি কি ঢোল পিটিয়ে বলার কথা? বলতে চাচ্ছি না যে ভালো না থাকলে প্রকাশ করা যাবে না। তবে কোথায়, কখন, নিজের সংসারের বিষয় প্রকাশ করতে হবে সেটা একটু বুঝে শুনে হলে নিজের জন্যেই ভালো হয়। শাহরুখ খানের ” ইয়েস বস ” মুভিতে দেখানো হয়েছিল, ভিলেন আদিত্য পাঞ্চলি নিজের বউয়ের চরিত্র খারাপ দেখিয়ে নিজেকে অসহায় স্বামী বলে বলে জুহি চাওলার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। উল্টোটাও হয়। স্বামী ভালো না বলে বলে অনেক নারীও পরকীয়া করেন। অথবা ঘরের খবর বাইরে বের হলেই তৃতীয় পক্ষ সংসারে প্রবেশ করার রাস্তা সহজ হয়। দুজন মানুষের বনিবনা না হলে আলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়াই যায়, প্রয়োজনে আলাদাও হওয়া যায়। বাচ্চাকাচ্চা থাকলে তাদের প্রতি পিতামাতার যেই দায়িত্ব তা কীভাবে পালিত হবে সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায়। সমাজ অনেক কথা বলতেই পারে। কিন্তু নিজের ভালো থাকার বিষয়টি নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয় পরিস্থিতি বুঝে। সামাজিক মাধ্যমে এসে সঙ্গী/সঙ্গিনীকে দোষারোপ করা কোনভাবেই সুন্দর দেখায় না, বিশেষ করে একসাথে থাকা অবস্থায়।

এই সমাজে চিরদু:খী দুখী কিছু মানুষ আছেন, যারা মনে মনে সব চান কিন্তু কিছুই পাওয়ার যোগ্যতা নেই, এইদিকে চিন্তা করেন সারা দুনিয়া তাদের কথায় চলবে। কেউ ভালো আছে দেখলে সহ্য হয় না। অন্যের সংসার কীভাবে চলবে, কে কাকে বিয়ে করবে, কার সাথে কেমন মানিয়ে চলবে, তার উপর লেকচার দেন আগামাথা কিছু না বুঝেই। স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছে না, তার মানে এই নয় যে তাদের চরিত্র খারাপ, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা নেই, তাদের পরিবার খারাপ, তারা আর্থিকভাবে ভালো না, তাদের সামাজিক স্ট্যাটাসে মিল নেই! হতে পারে সবই ঠিক আছে, কিন্তু তারা দুজন, দুজনের জন্যে সঠিক মানুষ নন। তারা হয়তো ব্যক্তি হিসেবে অনেক ভালো মানুষ অন্যদের জন্যে। মানুষ হিসেবে ভালো মানেই এই নয়, যে তারা স্বামী স্ত্রী হিসেবেও ভালো হয়ে যাবেন। কত সমস্যা তাদের থাকতে পারে, যা আমাদের অজানা। আর অন্যের ঘরের ব্যক্তিগত বিষয় সকলের জানাও উচিত নয়, পারিবারিক নিরাপত্তারও একটা ব্যাপার আছে। দুইদিন পর যদি নিজেদের ভুল বুঝাবুঝি মিটে যায়, তখন কিন্তু সেইসব দরদী মানুষজন খোঁচায়ে মনে করিয়ে দেবে ভুলে যেতে চাওয়া নষ্ট সময়।

তাই বলছিলাম, অন্যের সংসারের ব্যাপারে জাজমেন্টাল হওয়া কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশ্বাস করুন, সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া ঠিক থাকলে, একটা মিষ্টি সম্পর্ক থাকলে, সেখানে তৃতীয়পক্ষও কোন সুবিধা করে উঠতে পারে না। কে সারাদিন সংসারে কাজ করে, কে সারাদিন বাইরে কাজ করে, কে কত টাকা ইনকাম করে, কে বেকার বসে বসে খায়, তাতে তাদের কিছুই যায় আসে না।  আপনি জানেন না কোন পরিস্থিতিতে কারা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংসার ভেঙে দেয়াটা যত কঠিন, সংসার করে যাওয়াটা তার চেয়েও বেশি কঠিন, বিশেষ করে সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিয়ে।

অন্যদিকে মানুষ ধুমধামে হাজার মানুষ খাইয়ে এক দিনের অনুষ্ঠান দশদিনে লাখ লাখ, ক্ষেত্রবিশেষে কোটি টাকা খরচ করে, সংসার ভেঙে যাবে এই ইচ্ছাতে নয়। কোন মেয়েই এই প্রস্তুতি নিয়ে যায় না যে গিয়েই সবাইকে সরিয়ে দিয়ে একা একা সংসার করবে বলে। নতুন পরিবেশে গিয়েই একা একটা মানুষের পক্ষে এতো লোকের বিরুদ্ধে এই সাহস হুট করে আসা সম্ভবও নয়। তবে পরিস্থিতি বাধ্য করে অনেক সময়। আর তার জন্যে পুরুষদেরও দায় এড়িয়ে যাবার উপায় নেই।

বছর খানেক আগে আমরা দেখতে পাই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের’ নাট্যকলা বিভাগের ছাত্রী এলমা চৌধুরীর মর্মান্তিক মৃত্যু। সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। ফোনালাপে শোনা যায় শ্বশুর বাড়িতে তাকে কিভাবে নির্যাতনের মধ্যে রাখা হয়েছিল, বাপের বাড়ি পর্যন্ত আসতে দেয়া হয়নি, লুকিয়ে কথা বলতে হতো। আবার বহু বৃদ্ধ শাশুড়িকেও দেখা যায় ছেলে বউ সহ্য করতে পারে না। অনেকে বলেন, বউ বিড়াল বানিয়ে রেখেছে। এই জায়গাটায় দেখা যায়, নারীর আসলে কিছুই করার যোগ্যতা নেই। পিছন থেকে পুরুষ যাকে যখন ক্ষমতা দেয়, সেই তখন সংসারে কাঠি নাড়ায়। দূর থেকে কোনো ঘটনার একটা অংশ চোখের সামনে আসতেই অনেকে হামলে পড়েন। এইসব ব্যাপারে সময় নিয়ে ভাবা দরকার কিছু বলার আগে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছরে বহু কারণের পরিপ্রেক্ষিতে বহু ঘটনার জন্ম হয়। তাই একটা ঘটনা সামনে আসতেই আগ, পিছ না জেনে মন্তব্য করাটা অনুচিত।

আমাদের সমাজে কিছু বেকার আছেন, জীবনের সব অপ্রাপ্তি নিয়ে ঘুম থেকে উঠেই শুরু করেন, কাকে কীভাবে আক্রমণ করা যায়। কার সংসারে কীভাবে আগুন ধরিয়ে দেয়া যায়। সারাদিন গসিপ চলে কার বউ কেমন কথা বলে, কেমন পোশাক পরে, কোথায় যায়, কত টাকা খরচ করে। কার বর কত ইনকাম করে, বয়স কত, বাচ্চাকাচ্চা আছে কিনা, নিচ্ছে না কেন। কতদিন সোশ্যাল মিডিয়াতে একসাথে ছবি দেখা যায় না। কারে কেমন চললে ভালো দেখায়, কার বউ/বর কেমন হওয়া উচিত, কার বউ/বর ছেড়ে দেয়া উচিত এইসব অসুস্থ, অসভ্যদের বুঝানো যায় না, অন্যের ব্যাপারে এইসব বলার জায়গা নেই। কারো সংসার অন্যের হিসাবে, অন্যের অভিজ্ঞতার হিসাবে চলে না। কারণ যাদের সাথে ঘটনা ঘটছে তারা ভিন্ন চরিত্রের মানুষ, আর ঘটনার পরিস্থিতিও ভিন্ন। নাক ডাকার শব্দে যে সংসার ভাঙে, তার সমস্যা বসে আলোচনা করে মিটমাটের কিছু নেই। তাই সব জায়গায় জ্ঞান ফলাতে না যাওয়াই উত্তম। কিছু সমস্যার সমাধান ব্যক্তিকেই করতে হয়। আর কে ভালো, কে মন্দ তার জন্যে আইন-আদালত আছে। আপনার, আমার পক্ষে কখনোই কারও বেডরুমের খবর জানা সম্ভব নয়। কিছু বললেই মানুষ স্পষ্টবাদী মনে করে না। বরং কী বলছেন অন্যদের নিয়ে, কতটুকু জেনে, বুঝে, কতটুকু বলা আপনার এখতিয়ারের বাইরে হয়ে যাচ্ছে, তা দেখে আপনার চরিত্র ও পরিস্থিতি মানুষ বুঝে নেয়। খুব জানাশোনা হলেও অন্যের সংসার নিয়ে মন্তব্য করার আগে কয়েকবার ভাবুন। কাউকে সংসার ছেড়ে দেবার মতো সিদ্ধান্ত দেয়া বা পুশিং করা অনুচিত। ব্যক্তিকে তার সিদ্ধান্ত নিতে দিন স্বাধীন ভাবে।

সম্প্রতি একজন জনপ্রিয় মানুষের পারিবারিক ব্যাপার সামনে এসেছে। যার এতোদিনের সংসার, দুইটি বাচ্চাও আছে শুনেছি, তাদের নিয়ে পুরো ঘটনা না জেনে সিদ্ধান্ত দিয়ে কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলে ভালো হয়। তারা কিন্তু বেড়াতে গিয়েছিলেন। এই ঝামেলাটা না হলে, ফেইসবুকে তাদের আনন্দঘন ছবি দেখে কতজনই হয়তো হিংসায় জ্বলে মরতেন। তাদের দুই পরিবারের লোকজনও নিশ্চয়ই এই ঘটনা নিয়ে অনেক সাফার করছেন। বলা তো যায় না, আবার তাদের মিটমাটও হয়ে যেতে পারে, কিন্তু আমরা না জেনে উল্টা পাল্টা মন্তব্য করার কারণে যদি, প্রেস্টিজ রক্ষা করতে গিয়ে তারা আলাদা হয়ে যান সারা জীবনের জন্যে, তো এই দায় কে নেবে?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.