সংসারে সম্পর্কগুলোর ‘ভারসাম্য’ রাখাটা জরুরি

কাকলী তালুকদার:

ছেলেরা মানবিক হলে সেই ঘর এমনিতেই সুন্দর হয়ে যায়। নিজের জীবনসাথীর কাছে তার পরিবারে মূল্য এবং পরিবারের কাছে নিজের জীবনসাথীর গুরুত্বটুকু বোঝানোর দায়িত্বটুকু ছেলেরা পালন করলে পারিবারিক বন্ধনটুকু অনেক সাবলীল এবং সুন্দর হয়ে যায়। প্রতিটা
সম্পর্ক ভারসাম্যে টিকে থাকে। সময় সময় সেই ভারসাম্যের দায়িত্বটুকু আমাদের সবারই পালন করতে হয়।

বিয়ের পর বউ- শাশুড়ির মানসিক টানাপোড়েন আমাদের বাঙালীর ঐতিহ্যগত সমস্যা। মায়েরা খুব প্রাকৃতিকভাবেই পুত্র স্নেহপ্রবণ হয়ে থাকে, বাবারা কন্যা স্নেহপ্রবণ। পুত্রের বিয়ের পর তার নতুন জীবনের সময়গুলো পরিবর্তন হয়ে যায়। খুব কম মাকেই দেখেছি এই পরিবর্তনটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে! নিজের কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে আবার বিষয়টি উল্টো হয়!
তখন সকল দোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায় পুত্রবধূটি!

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মায়ের সাথে পুত্রের ভালো সম্পর্কটিকে বউ সহজ করে মেনে নিতে পারে না!
এই বিষয়গুলোর মধ্যে আমাদের অনেক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় জড়িয়ে আছে। আছে পিতৃতান্ত্রিক জটিলতা।

বাড়ির দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হলে বড় সন্তানটির মানসিক অবস্থা কেমন হয়? পিতা-মাতার এবং পরিবারের সকলের আচরণ দ্বারাই বড় সন্তান প্রভাবিত হয়। যেমন আপনি যদি আগেই বড় সন্তানকে বলেন তোমার একজন ভাই/ বোন আসবে কয়েকদিন পর, তোমার সাথে খেলবে, তোমাকে অনেক ভালবাসবে। তুমি যেহেতু বড়, ওকে তোমার দেখে রাখতে হবে এই রকম অনেক কিছু দিয়ে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। তখন বিষয়টি তার কাছে গ্রহনযোগ্য এবং সহজ হয়ে উঠে।
নয়তো হুট করে যেদিন মা হাসপাতালে বা আতুর ঘরে চলে যায় সেদিন নতুন ভাই/বোনের আগমন তার কাছে ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠে। মায়ের কোলে নতুন আরেকটি শিশু এবং মায়ের কাছে যেতে না পারার দূরত্ব একটি শিশু মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পরে। এই নেতিবাচক প্রভাব তার বিভিন্ন আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে।

সেই ছোট বাচ্চাটি হয়তো এতোদিন মাকে জড়িয়ে ঘুমাতো, সেই ছিল মায়ের চিন্তার কেন্দ্র বিন্দু। এই ভাগাভাগি সে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না।
সম্পর্ক অনেক রকমের হয়, একটির সাথে আরেকটির কোন মিল নেই কিন্তু ভাগাভাগি আছে। এই যে ভাগাভাগি, এই ভাগাভাগির কম বেশি নিয়েই পৃথিবীতে যতো ঝামেলা।
সেই ভাগাভাগি কমবেশি হলে ভূখণ্ড, দেশের মানচিত্র, সমাজ, পরিবার, সম্পদ থেকে সম্পর্ক সবখানেই দ্বন্দ্ব তৈরি করে। তাহলে উপায় কী? সমভাব, সমভাগ বা ভারসাম্য এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতে পারে। সুসম্পর্ক রাখতে হলে আপনাকে ভারসাম্য করা শিখতে হবে। যেমন সাঁতার, সাইক্লিং শিখতে হলে ভারসাম্য রাখা শিখতে হয়। ওই ভারসাম্যটাই আপনার দক্ষতা, ওটাই আপনাকে জলের উপর ভাসিয়ে রাখবে।

নিজের সন্তানকে শেখানোর আগে নিজেরও তো ভারসাম্য জানতে হবে। ছোটবেলা থেকেই একটি শিশুকে তার পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলার ভারসাম্য শেখাতে হয়। ভাগাভাগিটা কীভাবে সুন্দর হয় সেটা শেখাতে হয়। নয়তো বড় হয়ে আমরা অথৈ জলে পড়ে যাই। আজকে আমার ছোট শিশু আগামী দিনের নেতৃত্বে থাকবে। সেই ভবিষ্যতে একটি পরিবার, সমাজ, দেশ বিশ্বকে নেতৃত্ব দিবে। অলিখিতভাবে পৃথিবীটা আমাদের দ্বারাই প্রভাবিত হচ্ছে।

সমাজ সংসারের বণ্টনের দায়িত্বটুকু পুরুষদের কব্জায়। পরিবার থেকে রাষ্ট্র সবখানেই ভাগাভাগির যে মহা ধুমধাম, যতো অসম বণ্টন সব পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে হয়। বেশি খেতে হবে, শক্তির প্রয়োগ করতে হবে এই চিন্তা থেকেই এক শ্রেণি অনেক ধনী, আরেক শ্রেণি অতি গরীব। মূলকথা ভারসাম্য ভালো নয়।

পরিবারগুলোতে সম্পর্কের যে টানাপোড়েন সেখানেও ভারসাম্যের অভাব।
আমার চারপাশে অনেক পুরুষ আছেন যারা নিজের বউ-বাচ্চাকে নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকেন বৃদ্ধ মা-বাবার খবর নেয়ার সময় পায় না কিংবা প্রয়োজন বোধ করে না! আবার অনেক পুরুষ আছেন যারা মা-বাবা, ভাইবোনদের নিয়ে এতো ব্যস্ত যে বউকে অন্যের বাড়ির মেয়ে হিসেবে একঘরে করে রেখে দেয়!

এখানেই পুরুষদেরকে ভারসাম্যটা জানতে হয়। আপনার নিজের পরিবার এবং স্ত্রীর মধ্যে ভারসাম্য আপনাকেই করতে হবে। ভালবাসা এবং সময়ের ভাগাভাগিটার ব্যাপারে আপনার উদাসীনতার কারণে পরিবারে একটা জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আমার মতো মায়েদের ভাবতে হবে আগে থেকেই, নিজের পুত্র সন্তানের বিবাহিত জীবনটা নিজের অধিক স্নেহের কারণে যেন দুর্বিষহ না হয়ে উঠে। স্ত্রী হয়ে ভাবতে হবে আমার কারণে যেন একজন দায়িত্বশীল ছেলে তার মা-বাবা এবং ভাইবোনদের সাথে দূরত্বের কারণ না হয়। এই ভারসাম্য পরিবারের সকলের মধ্যেই থাকতে হয়।
পুরুষ হিসেবে আমার বাবা ছিলেন একজন চমৎকার মানুষ, তাঁর কাছে প্রতিটি সম্পর্কই আলাদা আলাদা গুরুত্ব বিবেচিত হয়েছে। এই মানুষটির কাছ থেকে কোন সম্পর্কই বিতাড়িত হয়নি।

নিজের পরিবারকে সুন্দর রাখতে আমাদের সবাইকে ভারসাম্য করাটা মাথায় রাখতে হবে। পুরুষ হিসেবে এতোদিন না ভেবে থাকলে এখন ভাবতে শিখুন। আপনার সুন্দর ভাগাভাগির দৃষ্টি দিয়ে একটি সুন্দর পরিবার উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। আপনার ভারসাম্যপূর্ণ মনোভাব আপনার মা এবং প্রিয়তমার মধ্যে সুসম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে দিতে পারে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.