‘গোত্র মনুষ্যত্ব, ধর্ম মানবতা’

আলাউদ্দিন খোকন:

দিদি মানে রমা চৌধুরী (মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরী) আমাকে দিয়ে তিল উৎসর্গ করিয়েছিলেন দুই হাজার তিন সালে। টুনুর নামে উৎসর্গিত এই আয়োজন দিদি করেছিলেন কৈবল্যধাম পুকুরঘাটে। তিল উৎসর্গ করতে গিয়ে পূজারি ব্রাহ্মণ দিদিকে প্রশ্ন করেন কে উৎসর্গ করবে। দিদি তখন আমাকে দেখিয়ে বলেন, ও করবে। পূজারি তখন নাম বলতে বলায় দিদি বলেন, নাম ‘আলাউদ্দিন খোকন’, গোত্র ‘মানুষ’, ধর্ম ‘মানবতা।’ পূজারি কিছুক্ষণ আমার দিকে, কিছুক্ষণ দিদির দিকে তাকিয়ে থাকেন! তারপর শুরু করেন পূজা, তিল উৎসর্গ। পূজারি রাম ঠাকুরের শিষ্য, জানেন ঠাকুরের দর্শন। ঠাকুরের অনেক মুসলিম ভক্ত ছিলেন সেটাও জানেন। তাই সেদিন বিনা বাক্যব্যয়ে পূজা সাঙ্গ করেন। তিল উৎসর্গ করি আমি টুনুর নামে। আমাকে পূজারি মন্ত্র পড়ান, আমি পড়ি। নতুন ধূতি পরে সমস্ত নিয়ম মেনে সেদিনের পূজাপাঠ সম্পন্ন করেছিলাম।

কয়েকদিন আগে কলকাতার বাংলা সিনেমা ‘গোত্র’ দেখলাম। দেখে আমার নিজের জীবনের এই ঘটনা মনে পড়ে গেলো। সেখানে একজন হিন্দু মা (অনুসূয়া মজুমদার) তাঁর এক মুসলমান সন্তানের নামে পূজা দিতে গিয়ে পূজারিকে বলছেন, নাম তারিক আলী, গোত্র মনুষ্যত্ব, ধর্ম মানবতা। গোত্র সিনেমাটি এতো অসাধারণ যে মনে দাগ কেটে গেছে।

দিদির অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিলো “মানবতা” নামে একটি ধর্মের প্রচলন করবেন। উদারমনস্ক উন্মুক্ত মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ সেই ধর্মের বেশকিছু নীতি-নিয়মাবলীও দিদি তৈরি করেছিলেন। দিদি সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, ছিলেন সর্বধর্ম সমন্বয়ে মানব ধর্মের চিন্তক।
আমি দিদির সাথে কৈবল্যধাম যেমন যেতাম তেমনি গোলপাহাড় কালীবাড়িতেও যেতাম নিয়মিত। প্রতি অমাবস্যায় কালীবাড়ি আর পূর্ণিমায় কৈবল্যধাম। সেখানে আমার পরিচয় আলাউদ্দিন খোকন, সবাই জানতেন। নিয়মিত মাসে দুইবার এই দুই জায়গায় যেতাম। কীর্তনে বসতাম পূজো দেখতাম ভোগ প্রসাদ নিতাম। দিদি কোন ধর্মীয় আচার রীতি পালন করতে এসব জায়গায় যেতেন না। যেতেন শুধু একটু মানসিক শান্তির আশায়। মাঝে মাঝে বৌদ্ধ মন্দিরে যেতাম। যেতাম পাথরঘাটা গির্জায়। বুড়া মসজিদে গিয়েও দিদির সাথে সিন্নি খেয়েছি আবার বায়জিদ বোস্তামীর মাজার কিংবা আমানত শাহ মাজারে গিয়ে বসেছি একটু মানুষের সাথে প্রাণের সম্পর্ক ঘটাতে। এমন বহু ধর্মীয় স্থানে আমরা যেতাম মানুষের ধর্ম মানবতার ধর্ম জানতে।

এ ছিলো আমাদের যাপিত যাত্রার অনন্য শিক্ষা।

আমার আর দিদির জাত-গোত্র ভেদহীন এই যৌথযাত্রা এতোটাও সহজ ছিলো না। বহু কঠিন পথ আমাদের পেরোতে হয়েছে। অনেকসময় বিরূপ অবস্থার সম্মুখীনও হয়েছি। দিদির গ্রাম পোপাদিয়ায় থাকাকালীন প্রায় তিনবছরেও এমন অনেক ঘটনার সাথে মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাকে দিদিকে।

দিদিকে অনেকেই বলতেন, মুসলমানের ছেলে আপনার সবকিছু ঠকিয়ে নিয়ে যাবে। জায়গাজমি সব লিখিয়ে নেবে। দিদি এগুলো গ্রাহ্য করতেন না। বলতেন, ও যা ছেড়ে আসছে তার সাথে আমার সম্পত্তি কী? আর ও আমার প্রতিনিধি, আমার অবর্তমানে ওই তো সব দেখে রাখবে। গ্রামে কোথাও নিমন্ত্রণে গেলে আমাকে ছাড়া দিদি যেতেন না। সেখানে হিন্দুরা বাঁকা চোখে চাইতো। ফিসফিস করতো ছেলেটা মুসলিম! অনেকসময় সবার সাথে বসতেও দিতো না। আলাদাভাবে বসাতো আমাকে। আবার মুসলিম বাড়িতে গেলে হাজারো প্রশ্ন আপনি মুসলিম হয়ে হিন্দু বাড়িতে থাকেন আপনার তো ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ নিজেদের বোন বা মেয়ে থাকলে পাত্র হিসেবে আমাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে দিতো। এমনি বহু ঘটনার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হয়েছে আমাকে। এভাবেই একসময় হিন্দু মুসলিম সবাই আমাকে চিনতে পারে, বুঝতে পারে আমি কোন ধর্মের নই। আমি মানুষ।

এখনও মানুষ আছি থাকবো। জয় হোক মানবতার।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.