পড়াশোনা, না বিভীষিকা?

ফেরদৌস আরা রুমী:

প্রথম আলোতে আজ খবর বেরিয়েছে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। কারণ সে নবম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ওর মামা বারবার অনুরোধ করেছে, কিন্তু প্রধান শিক্ষক কর্ণপাত করেননি। অপমানে সে আত্মহত্যা করেছে। এই আত্মহত্যার দায় কে নেবে? মাত্র ১৪ বছরের একটা কচি প্রাণ ঝরে গেলো সবার অবহেলায়! কী আশ্চর্য রকমের অসভ্য সমাজে আমরা বসবাস করছি।

১. সবার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না। না লাগাটা অস্বাভাবিকতা না। সবাই পড়াশোনায় ভালো হবে না। কিন্তু তাই বলে প্রতিটা মানুষ কি কোন না কোনভাবে যোগ্য নয়! অথবা তার কি বিশেষ আগ্রহের কিছু নেই, যা নিয়ে সে নিজেকে/বিকাশে আগ্রহী নয়? কিন্তু আমরা একটা শিশুকে চাপিয়ে দেই কী? আমরা এমন এক অশ্লীল প্রতিযোগিতামূলক সোসাইটিতে বসবাস করি সেখানে আছে কেবল পড়ার চাপ, ভালো ছাত্রগিরি আর নম্বরের বহর।

২. একটা শিশুর কোথায় আগ্রহ এটা কেউ অনুসন্ধান করে না। না পরিবার, না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র বা সমাজ তো জগদ্দল। ওদের আর টানলাম না। শিশুর মত প্রকাশের যে অধিকার আছে এটা আমরা জানি না। মানামানি পরের আলাপ । বাবা-মা তাকে একাডেমিক ক্লাসে, নাচে, গানে, আর্টে – কালচারে সবখানে চূড়ায় দেখতে চায়। আমি এমন অনেক শিশুর মনের দুঃখ শুনেছি, নিজের ইচ্ছা নাই, কিন্তু বাবা-মায়ের কারণে এসব মানতে হচ্ছে, আবার বাবা-মাকে বলতে ভয় পায়। এহেন বাবা-মাদের আমি বলে দেখেছি তারা কেউ ভালভাবে নেননি। এভাবে মরে শৈশব।

৩. এবার আসি সমাজ কী নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটায়। ছেলেমেয়ে মানেই লেখাপড়ায় ভালো হতেই হবে। নইলে আত্মীয় -স্বজনের কাছে মান থাকে না। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় আত্মীয়-পরিজন এসে সবার আগে জিজ্ঞেস করতেন রোল নম্বর কত, ট্রান্সলেশন, লাস্ট পরীক্ষায় অংকে বা ইংরেজিতে কত নম্বর পেয়েছিলাম। প্রথম আলোর সংবাদটিতেও দেখলাম অংক, ইংরেজিসহ তিন বিষয়ে ফেল করার কারণে ফারজানা আক্তার দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। খেয়াল করে দেখেন ইংরেজি, অংক এগুলোতে ভালো নম্বর পাওয়া হলো ভালো ছাত্র হওয়ার মাপকাঠি। এগুলোতে যে ফেল করে তার মরে যাওয়াই প্রাপ্য। এটাকে কেন আত্মহত্যায় প্ররোচনা বলা যাবে না?

৪. আমি একাধিক শিশুকে জানতাম, তাদের এইসব একাডেমিক লেখাপড়া ভালো লাগে না। একজনের আইটিতে সমস্ত মনোযোগ। সবার ভাষায় পড়াশোনায় সে লাড্ডু-গুড্ডু। এই নিয়ে তার আশেপাশের মানুষের আক্ষেপের শেষ নেই। অথচ এই ছেলের যে আইটিতে এতো মনোযোগ উপযুক্ত পরিবেশ, সুযোগ পেলে সে নিজেকে উৎরে ফেলতে পারতো। বিপরীতে সেসহ তার পরিবার বারবার পড়ছে সামাজিক লজ্জায়। ছেলেটার শেষ খবর এখন আর জানি না। আরেকটা ছেলে হতে চেয়েছিল ফিল্মের হিরো। জানি না এই সমাজ তাকে পড়াশোনার আগে সেই অনুমতি দিয়েছে কিনা? সম্ভবত দেয়নি, নইলে এতোদিনে সে খবর পেতাম। একাডেমিক পাশ দেওয়ার আগে এই সমাজ কাউকে কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিত্রকর, অভিনেতা যাই-ই ইচ্ছা হোক না কেন; কিছু হওয়ার অনুমতি দিবে না। দিস্তা দিস্তা পড়া না পড়ে নম্বর না তুলতে পারলে তার আর কীসের প্রতিভা!

৫. শৈশব কীভাবে মরে? এখন চলছে ভালো স্কুলে ভর্তি, জিপিএ ফাইভের যুগ। শিক্ষক অভিভাবক সবাই মিলে থাকেন তীব্র প্রতিযোগিতায়। কারও ভালো প্রতিষ্ঠান হওয়ার ধান্ধা, কারো বা নিজের সন্তানদের সেরা দেখানোর ধান্ধা। আমি একবার ক্লাস ফাইভে পি ই সি’র পর ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি কি রেজাল্ট নিয়ে চিন্তা করছ? তুমি জিপিএ ফাইভ পাবে কি, পাবে না সেটা নিয়ে আমরা ভাবিত না। উত্তরে ছেলে বলেছিল, কিন্তু বন্ধুরা সবাই পাবে আমি যদি না পাই? দেখেন সমাজ কত ছোটটেই কি চিন্তা ঢুকিয়ে দেয় মগজে?

৬. আমার মনে আছে, স্কুলে ভাল ছাত্র- ছাত্রীদের শিক্ষকরা আলাদা চোখে দেখতেন। এই দেখাটা ভালো নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের অহংকারি করে তুলতো। আমরা যারা এভারেজ ছিলাম, শিক্ষক ও শিক্ষকদের উচ্চ নম্বরযুক্ত শিক্ষার্থীরা নিচু নজরে দেখতো। তাতে আমাদের নিজেদের তাদের কাছে অপরাধী দেখাতো। আমাদের সেসব মেধাবী বন্ধুরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ইত্যাদি হয়েছে আজ। তাদের অবজ্ঞার দৃষ্টির কারণে তার কোনো বন্ধু সেদিনই ঝরে পড়েছে কিনা, মন মরে গেছে কিনা এই প্রশ্ন করা যায় না। শিক্ষকদের কথা কী বলবো!

৭. এগুলোর জন্য দায়ি কে? আমরা সকলেই দায়ি বলার পর কিছু কর্তৃপক্ষ থাকে যারা সরাসরি দায়ি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই গলদপূর্ণ। এখানে আছে ১১ রকমের শিক্ষা পদ্ধতি। যার যেমন সামর্থ্য সে তেমন বিদ্যালয়ে পড়বে। কেউ পড়বে ক্লাস ওয়ান মানের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কেউ পড়ে বিনা বেতনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই ধরনের বৈষম্যমূলক শিক্ষা পদ্ধতি চালু রেখে সেখান থেকে কেমন শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠবে আমাদের শিক্ষার্থীরা তা সহজে অনুমেয়। শৈশবেই মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয় যেখান বৈষম্য।

লেখাটা বড় হয়ে গেছে অনেক। শেষ করি। আজকে ফারজানার আত্মহনন একদিনের বা বিচ্ছিন্ন কোনো ইস্যু না। এমন অনেক ফারজানাকে আমরা রোজ মারি। আজ দেহ নিয়ে গেছে বলে সংবাদ হয়েছে। রোজ অনেক শিশুর মন মেরে ফেলি বারবার। যা আমরা বুঝিই না, এড্রেস করতে পারা পরের বিষয়। শিশুর বিকাশের সুযোগ নাই পাঠ্যক্রমে। কারিকুলাম সেভাবে তৈরি করা হয় না। এমন অসভ্য, অপ্রয়োজনীয় পাঠ্যক্রম আমাদের যা কিছুই বানায় না। তবে হ্যাঁ, আজীবনের সর্বোচ্চ নাম্বারধারীদের বানায় উন্নত মানের দাস। যারা দেশের দশের বিপদে থাকে না। ব্যতিক্রম আছে সেটা আলোচ্য বিষয় না। দেখা যায়, কম নম্বরধারীরা মানুষের কাতারে থাকে কম-বেশি। নাম্বার নিয়ে ব্যস্ত না থাকার কারণে তারা মানুষকে কিছুটা পড়তে বা বুঝতে পারার সময় পান/পেয়েছেন বরং।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.