একজন কাঁকাত হেনিনচিতা

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:

কাঁকনবিবি নয়, তাঁর নাম কাঁকাত হেনিনচিতা। শহীদ মিনারে স্বাধীনতা উৎসবের উদ্বোধন করতে এসেছিলেন তিনি ২৪ মার্চ বিকেলে।
আমি গিয়েছিলাম নব্বইছুঁইছুঁই এ বীরাঙ্গনা নারী মুক্তিযোদ্ধার একটি সাক্ষাৎকার নেবার কথা মাথায় রেখে। স্বাধীন বাঙালি কখনো কাঁকনবিবি কখনো কাঁকনদেবী নামে ডেকেছে এই আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধাকে।

ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

কাঁকাত হেনিনচিতা নামটি খাসিয়া। এই মানুষটির পূর্বপুরুষেরা মেঘালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধপূর্ববর্তী কোনো একসময়ে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে আসেন। কাকাঁত হেনিনচিতার জন্ম ব্রিটিশ শাসনের অধীন অবিভক্ত ভারতের শ্যামল বনানীঘেরা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে। শৈশবে সেখানেই বেড়ে ওঠেন তিনি। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স আনুমানিক চুয়াল্লিশ এর মতো। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সেক্টর ফাইভে। সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিলেন একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, যিনি শত্রুক্যাম্পের খবরাখবর নিয়ে আসবেন। পাঁচবার সফল হয়েছিলেন, কিন্তু একবার পাক সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাক সেনাবাহিনী যে নির্মম অত্যাচার করেছে, এখন নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়সেও তার দেহে সেই জ্বলন্ত রডের সেঁকার দাগগুলো আছে। সেই দাগগুলো তিনি দেখান এবং অশ্রুসজল কণ্ঠে এখনো সেই লোমহর্ষক যন্ত্রণার কথা বলেন, এবং বলেন, এখনো উনার পায়ে সেই পাকিস্তানী বাহিনীর অত্যাচারের যন্ত্রণা রয়েছে। যখন নারীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে হানাদার পাক বাহিনী তখন তিনি স্বসস্ত্র যুদ্ধে যান এবং তিনটি সম্মুখসমরে লড়াই করেন। একটি অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার যে গেরিলা যোদ্ধারা যখন সমরক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্রিজকে উড়িয়ে দিতে পারছে না তখন হেনিনচিতা কলার ভেলায় করে সেই ডিনামাইটগুলো নিয়ে ব্রিজের কাছে যান এবং ব্রিজটি উড়িয়ে দিতে তিনি সক্ষম হন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে।

এভাবেই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অসীম সাহসিকতায় দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় নিজের জীবন বিপন্ন করেও কাজ করেছেন তিনি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে মুক্তি বাহিনীর কাছে হানাদারদের অনেক অপারেশনের খবর পৌঁছে দিয়েছেন। সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডুয়েল এজেন্ট হিসেবে বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করেছেন। মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করেছেন। সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা, আমবাড়ী, বাংলাবাজার, টেবুর, আন্দরটিলা, দূরবীণ প্রভৃতি অঞ্চলের যুদ্ধে তার বিশেষ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বয়স গ্রাস করেছে সেই বীরনারীর বয়ানসক্ষমতা, যেকোনো জায়গা থেকে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যান তিনি। রয়েছে ভাষার সমস্যা। সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক বাংলা ও খাসিয়া নৃগোষ্ঠীর কথ্যভাষা ছাড়া তিনি কথা বলতে পারেন না। কিন্তু যে ভাষাই বলুন না কেন তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কথাগুলো আমার স্মৃতিপটে থেকে যাবে আমৃত্যু। কারণ আমি দেখেছি আমার সামনে নিরক্ষর এক আদিবাসী নারী কীভাবে তাঁর বাসভূমিকে ভালোবেসেছিল, রুখে দাঁড়িয়েছিল হানাদারের বিরুদ্ধে।

তিনি শহীদ মিনারে স্বাধীনতা উৎসবের উদ্বোধন করতে দাঁড়িয়ে বলে গেলেন, “আমি দেখে গেলাম তোমরা কেমন আছো! আবারো এসে দেখে যাবো, তোমরা কেমন আছো! কারণ তিনি মনে করেন যে বিজয় উনারা এনে দিয়েছেন তা রক্ষা করবার দায়িত্ব হচ্ছে নতুন প্রজন্মের। এই বীরমাতা তার মতো করে বললেন, ‘আমি পরথম, আমার উস্তাদ মীর শওকত, উস্তাদ আমারে রাখছে, আমি যেন খবর লইবো, এই টেংরাটিলা থাকি, টেংরাটিলা থাকি আমি খবর লইয়া আইসা দিছি অনেকবার, যুদ্ধও করছি মুক্ষামুক্ষি। এরপর আমি মীর শওকত স্যাররে দিলে তারা আমারে বলছে সাবাস। খুব ভালো হইছে। এর পরে আরো কিস্তি গেছে, এরপরে রাজাকারেরা আমার স্বজন ধরিয়া মারিয়া ফালাইছে। পাঁচবার খবর আনার পর আমি ধরা পড়িয়া গেছি। আমার সারা শরীর ছ্যাকা দিয়া পুড়িয়া ফালাইছে। তার আগে পাঞ্জাবি অফিসার আইসা খবর লইলো, আমারে দেখিয়া, এই মেয়ে ধরা খাইছে, দেইখা বলে এ অন্যরকম, অন্য জাতি, এরপরে কেমনে কেমনে আমারে বেহুশ করিয়া রাখছে। যখন হুঁশ হইছি আমি, আমারে বলছে কেউ জিগাইলে বলবা, তোমারে নির্যাতন করছে, ছ্যাঁকা দিছে মুক্তিবাহিনী। আর জিগাইছে তোমার জাত্তে কি? আমার জাতে হইলে খাসিয়া। বলে তুমি কিল্লাগ্যা আইছো এহানো? মুক্তিবাহিনীর পাব্লিক পাঠাছে নি? আমি তখন বলছি, আমি আমার স্বামী আবদুল মজিদ খাঁর তালাশ করছি, সে ইপিআর এর সৈনিক। মজিদ খানরে আমার সামনে লইয়া আইয়ো তোমরা। এরপর তারা আমারে সাতদিন ক্যাম্পে আটকায়া রাখছে। ওষুধ দিয়া বেহুশ কইরা। নির্যাতনের পর ছেড়ে দিছে আর কইছে, তোমার শরীরে যে দাগ, সে দাগ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তবে বলবা, মুক্তিবাহিনী করেছে। মুক্তিবাহিনী তোমাকে ধরেছিল এবং তারা তোমাকে অত্যাচার করে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়েছে, তাই তোমার গায়ে এত দাগ”। এটুকু বলেই কাঁকাত হেনিনচিতা ওরফে কাঁকনবিবি হাঁপাতে থাকেন, তাঁকে তখন ধরে ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুস ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।

বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেলে শহীদ মিনারে বাম পাশের বেদিতে সাউন্ড সিস্টেমের প্রচণ্ড আওয়াজের মধ্যে আমি মুখোমুখি হই এই মহিয়সী বীরনারীর।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কেমন আছেন আপনি?
কাঁকাত হেনিনচিতা: ভালা আছি, দেশের লাইগ্যা যুদ্ধ করছি, দেশের মাইনষের আনন্দ দেখতাছি, ভাল্লা আছি।

আজকের এই শহীদ মিনারে যে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন এত দূর থেকে এসে, কেমন লাগছে আপনার?
-ভালা লাগছে, খোব।

আপনি যে মুক্তিযুদ্ধ করছিলেন সব মনে আছে?
-অনেক ভুইলে গেছে। আমি গেছে। যুদ্ধ করছে। রাইফল লইছে। সমুক সমরত। মুক্তির লগে লগে।

এতদিন পরে এহন যেই বাংলাদেশে আছেন আপনি সেইটা কেমন লাগে??
-ভালা লাগে।

আজকের এই অনুষ্ঠান?
-সোনদর লাগছে, বালা লাগছে।

এই যে আপনি নাকি কলার ভেলায় করে ডিনামাইট দিয়া ব্রিজ উড়ায়া দিছিলেন, ঐটার কথা একটু কইবেন?
-হ, আমি মুক্তিবাহিনীর বিপদ থেকে উদ্ধার করার লাইগা কলার ভেলা বানাইয়া, অ্যামুনিশন নিয়া গিয়া, শওকত ওস্তাদের কথায়, জাওয়া পুল (ব্রিজ) ভাইঙ্গা, উড়ায়া দিছি।

বাহ্! সাব্বাস। উড়ায়া দিয়া আসার পর আপনের ওস্তাদ কী কইলো!
-কইলো, বালা হইছে, সাব্বাস হইছে। (বলতে বলতে প্রচণ্ড কাশিতে ভেঙে পড়েন কাঁকনদেবী ওরফে কাঁকনবিবি, বিশ্রাম নিলেন একটু, পানি খেলেন)

কেন কথা কইবেন না? কই যাইবেন?
-টিবিতে, শরীর ভালা না। যামু অনুষ্ঠান-অ। হাসান আরিপ নিয়া যাইবো।

এই অনুষ্ঠানে আপনারে কে নিয়া আসছে?
-আরিপরা।

একটা কথা কন! আপনে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেন যে, কীভাবে ধরা পড়লেন?
-পরথম তিনবার আমি খবর লইয়া আইছি। চাইরবারের বেলায় দরা পরছি। ভক্ষা করতে করতে পাকিস্তানিগো ক্যাম্পো গেছি, টেংরাটিলাত। জুম্মার আজানের সময়। রাস্তায় আটকাইছে পাকবাহিনী। হেরা কয়, এই বিটির লগে মুক্তির কন্টাক আছে।

আপনে কি কইছেন?

আমি কইছি, আমি আমার স্বামী, আব্দুল মজিদ খান, ইপিআরে চারকি করে, তার তালাশ করি। পাকিস্তানীরা বিশ্বাস করে নাই। আমারে আটকায়া মারছে। বন্দী কইরা রাখছে। মারতে মারতে অজ্ঞান কইরা লাইছে। আবার জ্ঞান ফিরলে মারছে। মাতায় পানি ঢালছে। ঢাইল্লা হুঁশ আইছে, আবার মারছে। তাও হাছাকথা কই নাই। গাছের লগে বাইন্ধা মারছে। পিটাইছে। লোহার শিক, গরম কইরা, উরাতে ঢুকায়া দিছে। কথা বার করতে পারে নাই।

আমরা তো শুনছি একসময় আপনে অনেক কষ্টে আছিলেন। সরকার আপনারে কী দিছে?

সরকার ত পরথমে দেয় নাইক। সংবাদিকরা লেখছে। ছিয়ননব্বই সালে। হেরপর বাড়ি দিছে। ঘর দিছে। সনমান দিছে। বয়স দিতে, পারে নাইক। ভাতা দিছে, নয়শ ট্যাকা হারে। ছয় মাস পরে পরে।

ঠিক আছে, ভালো থাকেন আপনে।

তুমরাও বালো থাকবা।

কাঁকাত হেনিনচিতা দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলেন অসুস্থ, কাজকর্ম করতে পারেননি৷ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কাঁকন বিবিকে ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দেয়া হয়। স্বাধীন দেশে সবাই নিজের মতো করে আবার জায়গা করে নিলেও বীরাঙ্গনা কাঁকন বিবির কোথাও জায়গা হলো না। অবশেষে কাঁকন বিবি একদিন নিজেই ঢাকায় চলে এলেন। এর-ওর কাছে জিজ্ঞেস করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি খুঁজে বের করেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর কথাও হয়। একজন বীরাঙ্গনাকে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের পরিবারেই আশ্রয় দেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে বেশ কিছুদিন ছিলেন কাঁকন বিবি৷ পরে ’৭৫-এর শুরুর দিকে আবার চলে যান নিজের গ্রামেই। বঙ্গবন্ধুর আপত্তি সত্ত্বেও তিনি নিজ গ্রামেই ফিরে যান। নিজ গ্রামে বসেই মুজিব হত্যার খবর পান। ৭৫-এর পর থেকে প্রায় ২২ বছর কাঁকন বিবির কেটেছে বাংলাবাজারের পাশে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরে। এই সময়ে তিনি কিছুটা অপ্রকৃতিস্থও ছিলেন কিছুদিন। মানুষের দেয়া খাবারই ছিল তাঁর সম্বল। নিজে কিছুই করতে পারতেন না। পরে অবশ্য স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে চিকিৎসা করান, ভরণ-পোষণেরও দায়িত্ব নেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর কাঁকন বিবিকে নিয়ে পত্র-পত্রিকায় কিছু লেখালেখি হয়। তত্‍কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করেন। শেখ হাসিনাও কাঁকন বিবির সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। তখন বিভিন্ন সংগঠন এগিয়ে আসে কাঁকন বিবিকে জাতীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য। জনকণ্ঠসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা তাঁকে সংবর্ধনা দেয়। কেউ কেউ কিছু মাসিক ভাতারও ব্যবস্থা করেন। এসব নিয়ে কাঁকন বিবি ও তাঁর মেয়ের পরিবার বেশ ভালোই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনকণ্ঠসহ সকলেই নিয়মিত মাসোহারা বন্ধ করে দেন। একমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ মাসিক নয়শো টাকাই এখন পান কাঁকন বিবি। তাও ছয় মাস পর-পর। কাঁঠালবাড়ি, সীমান্তবর্তী একটা গ্রাম্য বাজার। তার থেকে হাঁটা পথে মিনিট দশেক। জিরার গাঁও। সেখানেই সরকারি খাস জমির ৭০ শতাংশের উপর বর্তমানে ঘর করে আছেন কাঁকন বিবি। স্থানীয় বাঙালিদের কাছে তিনি পরিচিত ‘খাসিয়া বিটি’ নামে।

(শিমুল সালাহ্উদ্দিনের এই লেখাটি তার ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া। তবে এটি বহু বছর আগে বাংলানিউজ২৪ এ ছাপা হয়েছিল। উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকদের জন্য পুনরায় ছাপা হলো।)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.