প্রতারক সময়ে বাড়ছে কেবল একাকি বেদনার নীল গল্প

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন:

দুই ভাইবোন আলভী ও আনিকা। ওরা বেড়াতে যাবে। কিন্তু তাদের কাছে টাকা নেই। কী করা যায়? নানাকে অজ্ঞান করে টাকা নেয়ার পরিকল্পনা করে ওরা। ঘরের নকল চাবি বানায়। ১৮ তারিখ খালাতো বোনের বিয়ে পরিকল্পনা করে যায় নানার বাসায়। আদরে, স্নেহে তাদের জড়িয়ে ধরেন নানা। এরপর হঠাৎ তারা নানাকে ইনজেকশন দিতে গেলে তিনি অবাক হন। বাধা দেন। ক্ষিপ্ত হয়ে দুই ভাইবোন হত্যা করে তাকে। এরপর ঘরে থাকা টাকা ও সোনাদানা নিয়ে তারা বেড়াতে বের হয়ে যায়। ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটেছে ঢাকার চকবাজারে। সংবাদটি সম্পাদনা করার সময় চমকে ওঠলাম। এও সম্ভব?

নানা-নানি, দাদা-দাদী, ফুপু-ফুপা, খালা-খালু, মামা-মামি কী মিষ্টি মধুর সব সম্পর্ক। নানা-নানি-দাদা-দাদির কোলে শুয়ে রূপকথা শোনে ছোট্ট নাতি বা নাতনি। বাবা-মা বকলেও আশ্রয় দেয় দাদী বা নানা। সেই তাদের খুন করলো কিশোর কিশোরীরা?
ভাবতে বসলাম, কোথায় চলছি আমরা? ভেসে যাচ্ছি কি চারপাশে নানা অনিয়ম আর অস্থিরতার স্রোতে?
কারও যেন কোনো সময় নেই কাউকে সময় দেয়ার। আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে শব্দ, ‘চিল করো’, ‘বাইরে খাও’, ‘মাস্তি করো’ আর ‘ঘুরে বেড়াও’। তারপর সেসব ছবি ফেসবুকে আপলোড করো। শুধু দেখাও। দেখাও তুমি কতটুকু হ্যাপি।
দেখাও তোমার জীবনে কোনো দু;খ নেই, কষ্ট নেই, হতাশা নেই। তুমি খুব আনন্দে আছো। সারাক্ষণ আছো মাস্তিতে। মিথ্যে সুখে থাকার একটা অস্থির প্রতিযোগিতা চলছে যেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।

যে ছেলেটা গ্যারেজে গাড়ি মোছার কাজ করে সে তার প্রোফাইলে লেখে ছাত্র, নর্থ সাউথ। যে মেয়েটার বাবা গাড়ির ড্রাইভার সে ইন্সটাগ্রামে নানা ঢং আর বাহারি পোশাকের ছবি আপলোড করে দেখায় ভীষণ ধনীর কন্যা সে। হু হু করে বাড়ে ফ্যান ফলোয়ার। আসলটা কারও জানা হয় না।

নকল সুখী হওয়ার আশায় যে যা না, সে তাই হওয়ার চেষ্টায় আজকাল ব্যস্ত। এর মধ্যে নানা মাধ্যমে যোগ হয়েছে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতা। নকল গান, নকল নাচ, নকল অভিনয়। যা করা যাবে তাতেই খ্যাতি। দর্শক দেখছে! ভালো কিছু দেখেও দর্শক হাসছে, ভাঁড়ামি দেখেও দর্শক হাসছে। কে যে কী দেখে হাসছে, মজা পাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে না। ফ্যান ফলোয়ার সবার বাড়ছে।
আগে বাবা-মায়েরা খেয়াল রাখতো সন্তানদের বন্ধু নির্বাচনে। এখন তারা আর তা পারেন না। স্মার্ট ফোনের কারণে দেশ-বিদেশের নানা বন্ধু তাদের সন্তানদের হাতের মুঠোয়। এক বন্ধু মন খারাপ করে বলেন, আমরা সারা বিশ্বের খবর রাখি। জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে সমুদ্রবিজ্ঞান সব খবর জানি আমরা। শুধু রাখি না, সংসারের খবর।

একেকটা সংসার একেক রকম। সেখানে নানা অভিমানে এক এক করে মন মরে যায়, সর্ম্পক মরে যায়। কবে যে গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় প্রিয় স্বজনরা সে খবর আমরা রাখি না। ভার্চুয়াল জগতে চোখ রাখতে রাখতে চোখের সামনে শুকিয়ে যাওয়া পরিবার পরিজন দেখি না। আমরা দেখি বিশ্ব। আমেরিকা, রাশিয়া, ইউক্রেন, মিয়ানমার দেখি, রান্না করতে ঘরের বউ বা বরের হাত পুড়ে যায় তা আমাদের চোখে পড়ে না। কোন নায়ক বা নায়িকার পা ভেঙ্গে গেছে, কার সাথে কার বিয়ে হলো তাতে আমরা বড়ই দু:খ পাই। সন্তানদের ঘরের মধ্যে দিনের পর দিন একাকি থাকার দু:খ আমাদের চোখে পড়ে না।

অথচ একটু চোখ মেললেই আমরা দেখতে পেতাম সন্তানের মনমরা মুখ। তার ধীরে ধীরে পালটে যাওয়া। তার ক্ষয়ে যাওয়া জেদি মুখ।
জীবনের চাপে, সংসারের চাপে জ্যাম ধুলায় দ্রব্যমুল্যে নাকাল মানুষ। না সেসব দেখার সময় কই আমাদের! রাত জেগে আমরা তখন চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত বিভিন্ন গ্রুপে। সম্প্রতি স্কুল ব্যাচ, কলেজ ব্যাচ, ভার্সিটি ব্যাচ, পুনর্মিলনিসহ নানা গ্রুপে আমরা যুক্ত।
সমাজ সংসার সব ফেলে গভীররাত পর্যন্ত চলে নানা কথার আমোদ। এখানে কেউ কেউ আবার পান তাদের প্রাক্তনদের। পুরোনো সব স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে অনেকের। নতুন করে তৈরি হয় রিলেশন। বর আছে, বউ আছে, থাক না তারা তাদের মতো, মনের একটা স্পেস লাগে না! মুক্ত মনে সেখানে নিশ্বাস নিতে হবে না! মনকে তো বাঁচাতে হবে। একটাই মন। একটাই জীবন। চিল করো চিল।

বর-বউ মানে তো সেই লবন নাই, মরিচ আনো, চাল শেষ, বাচ্চার বেতন দিতে হবে। ভার্চুয়াল সম্পর্কে তো তা আর করতে হয় না। নীল আকাশ, বর্ষার মেঘ, চাঁপাফুল, ক’খানা গান পোস্ট! রাতে ঘুমিয়ে পড়ো, মন ভালো নেই বাবু, আমি আছি তো, ভয় নেই, ইত্যাদি নানা মনভোলানো কথার ফুলঝুরি তখন ইনবক্সে, হোয়াটসআপে।
পুরোনো বর-বউকে বড় পানসে লাগে। খ্যাত একটা। কখনো তো বলেনি আজ সুন্দর লাগছে। যত্ন করে কথাও বলে না। সারাক্ষণ খ্যাচ খ্যাচ করে। মন বোঝে না। আর পুরোনো প্রেমিক/ প্রেমিকা? কত যত্ন করে? ইশ কেন যে তার সাথেই সংসারটা হলো না। দীর্ঘশ্বাস পড়ে। ভুলে যায় তারা সেইসময় এই ছেলে বা মেয়েই বিট্রে করেছিলো নানা বাজে কথা বলে।

মনে পরে না কিছুই। সাময়িক ভাবনায় ভেসে যায় কেউ কেউ। ভেসে যাচ্ছে কেউ কেউ। এক বন্ধুকে বলেছিলাম, যা করছো ঠিক করছো কি? হাসতে হাসতে বললো, ভুলই বা কী করছি? সংসার আছে, থাক না। মনের স্পেসটার যত্ন করছি। অনেক অবহেলা সয়েছি। অপমান করেছে। সময় কই তার সময় দেবার? এই বন্ধু তো অবহেলা করে না, অনেক সময় দেয়। কথা শোনে।
এক সিনিয়র দাদাকে দেখছি উনি ভার্সিটিতে যে মেয়েকে পছন্দ করতেন তাকে বন্ধুদের গ্রুপে পেয়ে দিশেহারা। আগে ফেসবুকে বৌদিকে নিয়ে ছবি দিতেন। এখন আর দেন না। সারাক্ষণ পড়ে থাকেন সেই মেয়ের পেজে। লাইক, লাভ আর ওয়াওতে পোস্ট সয়লাব। সংসারে চরম অশান্তি। সংসার ভাঙে ভাঙে অবস্থা। সেই মেয়ে কিন্তু নিজের সংসার ঠিক রেখে তাকে নাচিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এক পরিচিত স্বজন বন্ধুদের সাথে ট্যুরের নাম করে কদিন আগে পুরনো বন্ধুর সাথে ঘুরে এলো কক্সবাজার থেকে। ওনার বর টেরও পেলেন না। গ্রুপ থেকে যে ভালো কাজ হচ্ছে না তা নয়, তবে বিভিন্ন গ্রুপের নামে কেউ কেউ করছেন অনৈতিক কাজও।
এসব নানা গল্প শুনে দিশেহারা মন। কী হচ্ছে চারদিকে? এতো প্রতারণা সর্ম্পক ঘিরে? প্রতিদিন ভাঙছে কিছু বিশ্বাস। প্রতিদিন ভাঙছে মন। প্রতি সেকেন্ডে ভাঙছে সংসার। কেন ঠকাচ্ছি ঘরের সরল মনগুলোকে? এর রেশ পড়ছে কিন্তু সন্তানদের উপর। ছাড়া ছাড়া সম্পর্কে বড় হয়ে উঠছে তারা। বাবা-মার মধ্যে যখন বন্ধন থাকে না তা টের পায় সবার আগে সন্তানরা।

আলভি আনিকারা বড় অস্থির হয়ে ওঠছে আজ। ওদের সামনে কোনো আদর্শ নেই। নীতি নেই। ভালো জীবনবোধের কোনো গল্প নেই। পরিকল্পনা নেই। সেকেলে আর অতি আধুনিকতার কবলে পড়ে দিশেহারা ওরা। সাময়িক উত্তেজনায় ভাসছে মন। চারপাশে নষ্ট হওয়ার প্রচুর হাতছানি। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ বুঝতে পারছে না অনেকেই।
সামনের সময় আসছে বুঝি আরও ভয়াবহ। আগে মানসিক কাউন্সিলিং করতে যেত না কেউ। গেলেও অল্প। এখন সেসব জায়গায় ভিড়ে ঠাসা। ছোট-বড়, কিশোর-কিশোরী, তরুণ, নানা বয়সী মানুষ ছুটছে আজ ঊর্ধ্বশ্বাসে।
এ কোন সময়ে এলাম আমরা? উত্তর খুঁজি, মেলে না। প্রতারক সময়ে ঘরে ঘরে বাড়ে শুধু একাকি বেদনার নীল গল্প।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.