দরিদ্র সোহেল মিয়া কিংবা কিং খান ক্ষমতায় দুজনেই সমান

দিনা ফেরদৌস:

কিছুদিন আগে সোহেল মিয়া নামে একজনের ভিডিও ভাইরাল হয়, যিনি নিজের প্রতিবন্ধী স্ত্রীকে কাঁধে নিয়ে প্রায় ১৫ বছরের মতো হবে সংসার করছেন। স্ত্রী রওশন আরা’র দুই পায়ে সমস্যা থাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা তার পক্ষে কঠিন। ফলে কোথাও যেতে হলে স্বামী সোহেল মিয়া তাকে কাঁধে করে নিয়ে যান। ১৫ বছরের চমৎকার প্রেমের সংসার তাদের। ভিডিওটি ভাইরালের কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল এর পিছনে অন্য খবর।

এই সোহেল মিয়ার আরেকটা সংসার আছে। যেখানে উনার আরও চারটি সন্তান আছে। সোহেল মিয়া সম্পর্কে তার ছেলে শিহাব বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাপের ভিডিও দেখে তারা অবাক, প্রতিবন্ধী একজন নারীকে বিয়ে করে যেই মানবতার নিদর্শন দেখাচ্ছেন, সেটা তার বাপের আসল জীবন থেকে পালিয়ে আত্মগোপন করে থাকা। কারণ এতো বছর ধরে তাদের বাপ যে চার ছেলেমেয়ে রেখে গেছেন তাদের সাথে চুল পরিমাণ যোগাযোগ করার দরকার কোনদিন মনে করেননি। তারা বহু চেষ্টা করেছেন যোগাযোগ করার। তাদের বাপ যদি বুঝতে পারতেন তারা ফোন নাম্বার পেয়ে গেছেন, তখন অন্য কোন লোক দিয়ে ফোন রিসিভ করাতেন।

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সোহেল মিয়া যখন জানতে পারলেন তার আগের সন্তানেরা তার সন্ধান ও আরেক সংসারের খবর পেয়ে গেছে, তখন সোহেল মিয়া জনগণকে জানালেন, আগের সংসারে তাদের দাম্পত্য কলহ ছিল। বউ কথা শোনে না, বউয়ের সাথে সম্পর্ক ভালো না, এইসব কথা যেহেতু পুরুষশাসিত সমাজের পক্ষে যায়, ফলে আরেকটা বিয়ে করা সহজ হয়, মানুষ তখন বাহবা দেয় এই বলে যে ঠিক কাজটিই করেছে। কেউ প্রশ্ন করে না, দাম্পত্য কলহ থাকলে একজন লোক সংসার ছেড়ে চলে যেতেই পারে। কিন্তু সোহেল মিয়া যে চার সন্তানের বাপ ছিলেন, সন্তানদের প্রতি যে মায়ের পাশাপাশি বাপেরও সমান দায়িত্ব ছিল, তা থেকে তিনি কেন সন্তানদের বঞ্চিত করলেন? এরই মধ্যে সোহেল মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী রওশন আরা’র বিলাপের একটা ভিডিও ভাইরাল হয়, তিনি কেঁদে কেঁদে বলছেন, ‘আমার হাজবেন্ড কী অন্যায় করেছে, কী অপরাধ করেছে, সেটা বিষয় না। উনার পিছনের কোন কিছুতেই আমার কিছু যায় আসে না, আমার মতো একটা প্রতিবন্ধীকে সে মাইনা নিতে পারছে এটাই বড় কথা আমার কাছে’।

কিছুদিন ধরে আমাদের সুপারস্টার শাকিব খানকে নিয়েও নানা কথা হচ্ছে। জানা যায় শাকিব খান অপু বিশ্বাসকে গোপনে বিয়ে করেন ২০০৮ এর দিকে, যাদের একসাথে মুভির সংখ্যা সত্তুরেরও বেশি। আট বছর সংসার করেছেন গোপনে। তারপর যখন খেয়াল হলো সেই মানুষটি আর তার পাশে নেই, তখন ২০১৭ সালের দিকে হঠাৎ করে বাচ্চা নিয়ে মিডিয়ার সামনে উপস্থিত হন অপু বিশ্বাস। কান্নাকাটি করে স্বামীর অধিকার আদায় করতে জনগণের সামনে যখন দাঁড়ান, তখনই সবার কাছে পরিষ্কার হয় শাকিব খান বিবাহিত এবং বাচ্চার বাপও। তিনি এতোদিন বউ-বাচ্চা লুকিয়ে রেখেছিলেন। শাকিব খান এতে খুব ক্ষুব্ধ হন যে অপু বিশ্বাসের এইভাবে বাচ্চা নিয়ে জনসম্মুখে আসা উচিত হয়নি, সময়মতো তিনিই নিয়ে আসতেন। এদিকে অপু বিশ্বাস যখন বুঝতে পারলেন, এই সময় কিয়ামতের আগে আসার সুযোগ নেই। আর যার কথা ভেবে, যার ক্যারিয়ারের কথা ভেবে কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন বলে ঠিক করেছেন, তিনি এখন অন্য কারো প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। তার গতি হোক না হোক, ছেলেকে নিয়ে যাতে পরিচয় সংকটে পড়তে না হয়, তাই তার এই প্রকাশ। এই ঘটনা সামনে আসতেই শাকিব খান, অপু বিশ্বাসকে ডিভোর্স দিয়ে দেন। এইদিকে আরেক নায়িকা বুবলিও কম না। তিনিও একটা সাক্ষাৎকারে বললেন, অপু বিশ্বাস প্রথমেই কেন বাচ্চার কথা প্রকাশ করেননি মা হিসেবে। সময় গড়িয়েছে অনেক।

কিছুদিন আগে অপু বিশ্বাস শাকিব খানের বাসায় ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কিছু ছবি শেয়ার করে স্ট্যাটাস দিলেন “সুখী পরিবারের কিছু সুন্দর মুহূর্ত “৷ অমনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন চিত্র নায়িকা বুবলী। সাথে সাথে তিনি নিজের বেবি বাম্পের ছবি পোস্ট দিলেন, তার পরেই পোস্ট করেন শাকিব খানের সাথে বাচ্চার ছবিও। স্বামী আগের সংসারে ফিরে যেতে পারে এই আশংকা থেকেই বুবলী এই কাজটি করেছেন তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তখনই নায়ক শাকিব খান জানিয়ে দেন; ” প্রেম, বিয়ে, সন্তান প্রত্যেক মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। আর তিনি পারসোনাল লাইফ পাবলিকের সামনে আনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তার ইচ্ছে ছিল, সময়মতো সুন্দর আয়োজনের মাধ্যমে ঘটা করে বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে সবার সাথে একত্রে আনন্দ করবেন। কিন্তু অপু বা বুবলী কেউই তাকে সেই সুযোগ দেয়নি”। নায়ক শাকিব খান আরও বলেন; ” আমার অপছন্দের এমন কাজ করে সবার কাছে আমাকে ছোট করার পরও কি তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা যায়?” আমার সঙ্গে বিয়ে ও সন্তান নিয়ে তাদের মনে যখন এতোই উচ্ছ্বাস ছিল, তখন তারা বিয়ে বা সন্তান জন্মের পর পরই সবাইকে বিষয়টি কেন জানালো না? আমি তো তাদের মুখ বন্ধ করে রাখিনি! অবশেষে শাকিব খান বলেছেন, ভুল করেছি ভুল মানুষদের সাথে মিশে। আর কোন ভুল করতে চাই না। ভুল করে মেশা সেই বাজে মানুষগুলোকে আর পাশে রাখতে চাই না”।

বাহ, কী চমৎকার আত্মোপলব্ধি। একেবারে সমাজের চরিত্রের সাথে খাপে খাপ। তাই কেউ এ নিয়ে টুঁ শব্দটিও করছে না। পুরুষ বলে কথা! করতো আজ এই একই কাজ কোন নারী, রি রি পড়ে যেত সমাজে।

শাকিব খান একজন সুপারস্টার। তার সাথে কাজ করতে হলে, তার পাশে থাকতে হলে তার কথা মতোই চলতে হবে। তিনি যখন ইচ্ছে বিয়ে করবেন, যখন ইচ্ছে বাচ্চা পয়দা করবেন, আবার সেইসব লুকিয়ে সোহেল মিয়ার মতো বিন্দাস সুখের জীবন যাপন করবেন। তার যুক্তি বউদের সাথে তার বনিবনা হয়নি ,তারা তার কথা শুনেনি। তার টাকা আছে, ক্ষমতা আছে। শুধু টাকার ক্ষমতা নয়, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা আছে। কারণ তার সমর্থক আছে এই সমাজে ৷ যারা মনে করে বউয়ের সাথে বনিবনা না হলে স্বামী যা ইচ্ছে তাই করতেই পারে। এই ক্ষমতার জায়গায় দরিদ্র সোহেল মিয়ার সাথে সুপারস্টার শাকিব খানের ক্ষমতা সমান। যেমন পার্থক্য নেই সোহেল মিয়ার প্রতিবন্ধী স্ত্রী রওশন আরার সাথে আমাদের চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস কিংবা বুবলীর। যারা নিজেদের মনে মনে শাকিব খান ছাড়া প্রতিবন্ধীই মনে করেন।

রওশন আরা যেমন বলেছিলেন; স্বামী পিছনে অন্যায়, অপরাধ যাই করুক তাতে তার কিছু যায় আসে না, তার মতো প্রতিবন্ধীকে ভালোবেসেছে এটাই বড় কথা, তেমনি আমাদের সুপারস্টার নায়িকারাও দুইদিন পর পর শাকিব খানকে নিয়ে বিলাপ করেন। একজন জন্মদিনের ছবি দিয়ে প্রমাণ করেন শাকিব খান তার দিকেই যাচ্ছেন, তো আরেকজন বেবি বাম্পের ছবি দিয়ে সংসার করছেন প্রমাণ দেন। এইলোক যতই অন্যায়, অপরাধ করুক তাদের তাতে কিছুই যায় আসে না। তারা যেকোন শর্তে শাকিব খানের স্ত্রী হয়েই থাকতে চান। এটাই তাদের একমাত্র পরিচয়।

আর এইদিকে আমাদের নায়ক দেখাতে চান তিনি চিরকুমার। প্রমাণসহ বাচ্চার ছবি নিয়ে এরা সামনে না এলে তাকে আজ কেউ বাচ্চার বাপ বলেও জানতো না। তিনি আনন্দ নিতে চান, প্রেম চান, মন চান, দেহ চান, বাচ্চা চান, বউ চান, কিন্তু সংসারী হতে চান না। এগুলো জনসমক্ষে আসুক তা তিনি চান না। চান না বলেই প্রকাশের সাথে সাথে তিনি বউদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। মনে করেন তারা শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছে। শত্রুরা তার গোপন বিয়ে ও বাচ্চার খবর সামনে নিয়ে আসার ফলে শাকিব খানের জন্যে কঠিন হয়ে যাচ্ছে জাতিকে ফুটবল টিম উপহার দেয়া থেকে। হয়তো জাতির এই নায়কের স্বপ্ন ছিল একদিন দেশের সব সুপারস্টার নায়িকাদের গোপনে বিয়ে ও এক একটা করে বাচ্চা জন্ম দিয়ে একসাথে ফুটবল টিম নিয়ে এসে হাজির হয়ে সারপ্রাইজ করে দেবেন। সেই সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন, যা বদজাত দুই নায়িকা শাকিব খানের শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে সহজ রাস্তাকে কঠিন বানিয়ে দিয়েছে।

ঘটনাগুলো যে প্রকাশ পেয়েছে, তার মানে এই নয় যে থেমে যাবে এখানেই৷  আরও নায়িকারাও বলিহারি! তারা জানে সোহেল মিয়ার মতো শাকিব খান যদি তাদের কাঁধে তোলে না নেন তো তাদের দিয়ে কিছুই হবে না। যারা নিজেদের রওশন আরা’র মতো প্রতিবন্ধী ভাবেন তারাই সেই সুযোগ করে দেবেন। আর একদল সেই মেয়েদেরই দোষারোপ করে যাবেন, যায় কেন শাকিব খানের কাছে? একজন রিকশাওয়ালাও চার/পাঁচটা করে বিয়ে করে, বউ পায়, তারাও নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী পায়, শাকিব খানের তো না পাওয়ার কিছু নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওই দুই বজ্জাত নায়িকা না হয় বিয়ে ও সন্তানদের প্রথম দিকেই সামনে নিয়ে আসেননি। শাকিব খান তবে নিজে কেন নিয়ে আসেননি? এই প্রশ্নটা নিজেকে করলেই পরিষ্কার হয়ে যায় তারা কেন আগে প্রকাশ করেনি। এখন অনেকে বলবেন শাকিব খানের টাকার লোভে। যেই লোক নিজের সন্তানের পরিচয় লুকিয়ে রাখে, সে এতো কচি খোকা না, যে মুখের কথায় নায়িকাদের টাকা বিছিয়ে দেবে। এই মেয়েগুলার অবস্থা তখন দেশের আট-দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই হয়ে যায়। আর আমাদের সমাজ মেয়েদের গালি দিয়ে ভাবে সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। অপু বিশ্বাস কোন ধর্ম পালন করে, বাচ্চা কী করে তা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ম ত্যাগ যদি স্বামীর জন্যে হয়, তো ছেড়ে যাওয়া স্বামীর ধর্ম দিয়ে সে কী করবে? আর এই বাপ তো ছেলের পরিচয় গোপন রেখে নিজের বাপের ধর্মই পালন করেনি, সেই ছেলের কী ধর্ম হবে তাতে কার কী যায় আসে!

তারচেয়েও বড় কথা যারা এইসব বলেন, তারা আদৌ নিশ্চিত কি, যে বিয়ের সময় অপু বিশ্বাস ধর্ম পাল্টে ছিলেন, কিংবা বুবলীর সাথে সত্যিই বিয়ে হয়েছে কিনা? সব সত্যি হলেও কোন সত্যের খবরই তো সরাসরি কারো জানা হয়নি। তার চাইতেও বড় কথা হচ্ছে, ছোট ছোট বিষয়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বড় বড় অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে।

আমি কখনোই বলবো না, শাকিব খানকে বয়কট করো, তার সাথে যেন কোন নায়িকা অভিনয় না করে। আমি বলবো, শাকিব খান যেন ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন সেই বিষয় নিয়ে আওয়াজ তোলা হোক। অন্যদের দোষারোপ করতে গিয়ে শাকিব খানের অন্যায় আচরণকে যেন ছোট করে দেখা না হয়।

একজন মানুষ কয় বিয়ে করবেন আর কয়বার ডিভোর্স দিবেন, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু বউ বাচ্চাকে অনন্তকালের জন্যে লুকিয়ে রেখে, দুইদিন পর পর বাচ্চা নিয়ে বউয়েরা হাজির হলে, এটা নিয়ে মেয়েদের উল্টো দোষারোপ না করে শাকিব খান কিছুই করেননি এমন প্রশ্রয় দেয়াটা অনুচিত। যার প্রভাব সমাজে পড়ে। আর অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে সমাজে অপরাধ বাড়ে। অপু কিংবা বুবলী দুজনেই সংসার করতে চেয়েছেন। একজন ডিভোর্সী পুরুষকে যেকোনো মেয়ে বিয়ে করতেই পারে। বিয়ে একটা আইনানুগ বিষয়, সন্তানের সাথে পিতার সম্পর্ক রক্তের ,এইসব লুকিয়ে রাখতে হবে কেন ?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.