সম্পর্কের ইতিকথা

শাশ্বতী বিশ্বাংগ্রী বহ্নি:

“সম্পর্ক”, বানানটার মতই সম্পর্ক নিজে বেশ জটিল। সম্পর্ক তৈরি, লালন, বহন করা খুব খাটনির কাজ।

তবে সম্পর্ক একটা সহজ সেতু। হুম, দুইটা মানুষের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান চলে সম্পর্ক নামের সেতু দিয়ে…।

সম্পর্কের যত্ন নিতে জানতে হয়। এতে কেবল একতরফা দেওয়া কিংবা নেওয়া চলে না। দেওয়া-নেওয়ার সঠিক সামঞ্জস্য থাকতে হয়। আবার এই সেতুর পিলার হচ্ছে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। এই তিনটা পিলারের একটারও যদি এতটুকু খামতি থাকে তবে সম্পর্ক বেশ নড়বড়ে হয়ে যায়। এখানে সবচাইতে অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য হচ্ছে ইগো। ইগো হচ্ছে ঘুণ পোকার মতো!! ধীরে ধীরে সম্পর্কের পিলারগুলোকে অন্ত:সারশূন্য করে সম্পর্কের অপমৃত্যু ঘটায়!

ইগো একটি ইংরেজি শব্দ। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে অহং বোধ।
অনেকেই “অহং” আর “আত্মসম্মান” এই দুটো শব্দকে গুলিয়ে ফেলে। অথচ দুটোর মধ্যে বিস্তর তফাৎ!! আসুন তফাৎটা জেনে নিই…..
“আত্মসম্মান” একটি ইতিবাচক গুণ এবং “অহং” একটি নেতিবাচক গুণ। আত্মসম্মানকে লালন করতে হয় এবং অহংকার ত্যাগ করতে হয়। আত্মসম্মানসম্পন্ন একজন ব্যক্তি নিজেকে যেমন সম্মান করেন, তেমনি অন্যকেও সম্মান করেন। অহং বোধসম্পন্ন একজন ব্যক্তি, নিজেকে এবং অন্যদের সম্মান না করে অন্যদের দ্বারা সম্মানিত হওয়ার প্রত্যাশা করে!

সেক্ষেত্রে, আমি খুব ভাগ্যবতী! আমি আমার চারপাশে এমন কিছু বন্ধু পেয়েছি যাঁরা ভীষণরকম আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন, কিন্তু সযত্নে ইগোকে এড়িয়ে চলতে জানে। আমার বন্ধু হয়তো পেশায় সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা কোন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড় কর্মকর্তা, কিন্তু আমার সাথে যখন চলে, তখন শুধুই আমার বন্ধু!!

আমরা প্রায়ই যে ভুলটা করি তা হচ্ছে কোন ব্যক্তির গুটি কয়েক ভালো গুণাবলিকে মাথায় রেখে সম্পর্কের দাবি করে বসি!! আর যখনই সেই ব্যক্তির কোন খুঁত চোখে পড়ে তখনই সম্পর্কের পিলারগুলোতে ফাটল ধরে মানে বিশ্বাস, ভালোবাসা অথবা শ্রদ্ধার জায়গাটা থেকে সরে আসি। অথচ অন্যদিকে সেই ব্যক্তি হয়তো আপনার সবটাকে আপন করে নেবে বলেই আপনার সাথে সম্পর্ক পাতিয়েছিলো, যার মর্যাদা আপনি রাখতে পারলেন না।

যে সম্পর্কেই জড়ান না কেনো, সততা হচ্ছে সেই সম্পর্ক নামক সেতুটার পাটাতন!! সততার অভাব থাকলে সেই সম্পর্ক কেবল একটা প্রহসনের নাম!! সম্পর্কে সততা না থাকলে সম্পর্কিত ব্যক্তির সামনে একদিন না একদিন আপনার মুখোশ খুলে পড়বেই। সম্পর্কের যত্নে আপনার অনুভূতির প্রকাশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনেকটা গাছের যত্নে সারের মত। অপরিহার্য না হলেও পরিত্যাজ্য নয়!! অবশ্যই অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে হবে…. যা হয়তো সম্পর্কের সেতুটিকে মজবুত করে তুলবে। তবে অনেকে অনুভূতি প্রকাশে চালাকির আশ্রয় নেন, যা কিনা সেতুর পাটাতন আর পিলারের সংযোগস্থলে লোহার নাট-বল্টুর উপর মরিচার মত। এতে করে শক্ত নাট-বল্টুগুলো ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়!! তাই চালাকি পরিহার করা বাঞ্চনীয়। ও হ্যাঁ, সেতুর নাট-বল্টু হচ্ছে মায়া। হুম, মায়া না জন্মালে সম্পর্ক আর হলো কই?!

আমাদের সমাজে একটা বহুল প্রচলিত কৌতুক আছে সম্পর্ক নিয়ে! ওই যে বললাম, সম্পর্কের সেতু বন্ধনে আমরা বাঁধা পরি মায়ার টানে…. আর এই মায়াকে কেবল একটি নারীবাদী চারিত্রিক গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজটা মোটামুটি শেষ। এতে বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিরও হাত আছে বৈকি! জনৈক বিখ্যাত লেখক বলেছেন, “মায়াবতীর নাকি পুরুষবাচক শব্দ নেই” বাহ!! অথচ “দয়াবান” পুরুষবাচক শব্দ হলে, “দয়াবতী” স্ত্রীবাচক শব্দ। তবে মায়াবতীর পুরুষবাচক শব্দ কেনো “মায়াবান” নয়?!

আর সেই প্রাচীনকাল থেকে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে, এমনকি আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে কিংবা শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিয়ে সম্পর্ক টিকানোর দায় যেন শুধুই নারীর। অথচ সম্পর্ক পাতানোর বেলায় কিংবা সম্পর্কের সুফল আস্বাদনের বেলায় যদিও পুরুষের অংশীদারিত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য! আমার একান্ত উপলব্ধি, সম্পর্কের কোন লিঙ্গ নেই। শুরু থেকে শেষ অবধি সম্পর্কের দুই প্রান্তে থাকা দুই বা ততোধিক মানুষ, বিপরীত বা সমলিঙ্গ, যাই হোক না কেনো, তাদের দায়-দায়িত্ব সমান মানে একেবারে কড়ায়গণ্ডায় সমান।

তাই পুরুষ বা নারী নয়, মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ুন। কোন সম্পর্কে জড়ানোর আগে উপরের বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন। আর যথাযথ পরিচর্যায় সম্পর্কগুলো বর্ণিল করে গড়ে তুলুন। সম্পর্কগুলোর অপমৃত্যু ঠেকান।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.