“Jin – Jiyan – Azadi: Women, Life, Freedom”, এসময়ের সেরা শ্লোগান

সুপ্রীতি ধর:

“Jin – Jiyan – Azadi: Women, Life, Freedom”, স্টকহোমের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যখন ইরান ছাড়াও বিশ্বের নানান দেশের নাগরিকদের সাথে এই শ্লোগানটি উচ্চারণ করছিলাম কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে, অন্যরকম এক শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল শিরদাঁড়া বেয়ে। এক বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ হওয়ার ভালো লাগা বোধও যে আমাকে তখন তাড়িত করেনি, বলবো না। ইরান-কুর্দিস্তান-সুইডেন-বাংলাদেশ তখন একাকার হয়ে গেছিল। একাকার হয়ে গেছিল আমাদের বোধ এবং লড়াই, অধিকার আদায়ের লড়াই। নারীর অধিকার।

ইরান থেকে এখন বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে এর চেয়ে শক্তিশালী আর কোন শ্লোগান হতে পারে না সমসাময়িক বিশ্বে। কুর্দিস্তানে লড়াইরত নারীদের বিষয়ে ভীষণ শক্তিশালী আর ইউনিক একটা পরিচয় তুলে ধরে এই শ্লোগানটি। এটি এখন কেবলমাত্র ইরানের নারীদেরই নয়, সমগ্র বিশ্বের মুক্তিকামী নারীদের অনন্য মন্ত্র হয়ে উঠেছে। মাত্র তিনটি শব্দ Women Life Freedom – সারাবিশ্বে একই সুরে, একই লয়ে বাজছে এখন। আর এটা সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র ইরানের অসম সাহসী তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষের কল্যাণেই। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হিসেবে গড়ে উঠেছে এই শ্লোগানটি।

যে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে ইরান থেকে সারাবিশ্বে, ফেমিনিজম তথা নারীবাদী লড়াইয়ের, যে বিপ্লব আজ গড়ে তুলেছে সদ্য কৈশোর পেরুনো ইরানি তরুণীরা, তা দেখে রীতিমতোন বিস্মিত ও অভিভূত। বিশ্ব আজ প্রত্যক্ষ করছে নারীর অন্যরকম এক শক্তিকে। কীভাবে শাসকের রক্তচক্ষু আর বুলেট উপেক্ষা করে মেয়েরা অন্ধকারের মুখোমুখি হচ্ছে, তা ইতিহাসে অনন্য আখ্যান হয়ে থাকবে। ধর্ম যেন নারীর জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তার জন্য চুল কেটে, হিজাব পুড়িয়ে যে সাহস ওরা আজ দেখাচ্ছে, অবশ্যই আশা করতে পারি যে এখান থেকেই নারীবাদী লড়াইয়ের দিক একটা অন্যরকম রূপ নেবে।

ইরানের মোরালিটি পুলিশের হাতে নিহত কুর্দি তরুণী মাসা আমিনি নিজের জীবন দিয়ে আজ প্রতিটা মেয়েকে এক কাতারে শামিল করে দিয়ে গেছে। যে কারণে মাসা আমিনিকে প্রাণ দিতে হয়েছে, তার প্রতিশোধ নিতেই হবে। এবং তা নেবে আমাদের আগামী প্রজন্মই।

শ্লোগানটির উৎস সম্পর্কে একটু পিছন ফিরে তাকাই। যে তিনটি শব্দ ওলটপালট করে দিচ্ছে বিশ্বের তাবৎ লড়াকু নারীকে তার অন্তর্নিহিত বৈপ্লবিক অর্থ
একটি ‘free world’ এর আকাঙ্খা। Jin Jiyan Azadi – মূল কুর্দিশ ভার্সন প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল ২০০৬ সালে কুর্দিশ উইমেন্স মুভমেন্টের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বৈপ্লবিক দর্শনকে সবার সামনে তুলে ধরা। ক্রমে এটি মুভমেন্টের শ্লোগান হয়ে উঠে, বিশেষ করে রোজাভায়, যা কিনা নারীর বিপ্লব হিসেবেই চিহ্নিত হয়।

নিহত জিনা (মাহসা) আমিনি ছিলেন কুর্দিশ অরিজিন, এবং রোজহেলাত, যা কিনা ইরানিয়ান কুর্দিস্তান হিসেবে পরিচিত। আর এটাই হয়ে উঠে বর্তমান সময়ের ইরানি মুভমেন্টের এপিসেন্টার। যেন একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি অপেক্ষায় ছিল বিস্ফোরণের। জিনা সেই বিস্ফোরণটিই ঘটিয়ে দিয়ে গেল জীবন দিয়ে। জিনা ছিল মাহসার কুর্দিশ নাম, যা অফিসিয়ালি স্বীকৃত বা অনুমিত ছিল না। ইরানি না হয়ে তার কুর্দিশ অরিজিন হওয়াটাই যেন তার ওপর চলা নির্যাতন ভয়ংকর রূপ নেয়।

এই শ্লোগান নিয়ে কথা বলতে গেলে চলে আসে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার সোনিয়া হামাদের নামও। যার জন্ম ১৯৮৬ সালে সিরিয়ার দামেস্কে, বাবা-মা কুর্দিশ ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের। তিন বছর বয়সে পুরো পরিবার জার্মানিতে চলে আসে। এখানেই সোনিয়া বড় হয়ে ফটোগ্রাফিকে বেছে নেয়। নিজের অরিজিনকে কখনও অস্বীকার করেনি বলেই সোনিয়ার পছন্দের বিষয় হয়ে উঠে কুর্দি ফাইটার নারীরা।  ২০১৩ সালে তিনি “Jin, Jiyan, Azadi – Frauen, Leben, Freiheit – die kurdischen Freiheitskämpferinnen”
(“Jin, Jiyan, Azadi – Women, Life, Freedom – the Kurdish Freedom Fighters”) নামে একটি পোট্রেট-বেসড প্রজেক্ট শুরু করেন। সম্পূর্ণতই রাজনৈতিক ছিল এই প্রজেক্ট। এজন্য তাকে তিনবার উত্তর ইরাকের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে হয়েছে। কখনও কখনও সেই জার্নি সুখকর ছিল না। তবে একই সম্প্রদায়ের হওয়ায় খুব সহজেই তিনি মিশে যেতে পেরেছিলেন লড়াইরত নারীদের সাথে। তারাও তাকে অকপটে জানিয়েছেন তাদের লক্ষ্য, লড়াই, বিপ্লবের কথা।

কথা প্রসঙ্গেই ২২ বছর বয়সী একজন লড়াকু নারী বলেছিলেন সোনিয়াকে, ‘হাতের শেষ গ্রেনেডটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন যোদ্ধার জন্য। সেজন্য সবাই এটা খুব সন্তর্পণে যত্ন করে রাখে। যদি ধরা পড়ে যেতে হয় বিরোধী শিবিরের কাছে তবে যেন শেষমুহূর্তের লড়াইটা সামাল দেয়া যায়, অথবা নিজেকে ভয়ংকর পরিণতি থেকে মুক্তি দেয়া যায়। এক্ষেত্রে আত্মহত্যা একটা ভালো সমাধান সব যোদ্ধা নারীর কাছে’।

খুবই অল্পবয়সী কুর্দিশ এই নারী যোদ্ধারা পশ্চিমা বিশ্বের সৃষ্ট এক ভয়ংকর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বিরুদ্ধেই শুধু লড়াই করছে না, করছে পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের বিরুদ্ধেও। যেখানে বাঁচামরা তাদের কাছে সমান। আর তারই প্রতিফলন আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি ইরানের বিপ্লবের মাঝে। এই শক্তি ইরানিরা পেয়েছে ওই কুর্দি লড়াকু নারীদের কাছ থেকেই। যদিও শ্লোগানের মূল তাৎপর্য্যের সবটুকু প্রতিফলিত হওয়া সম্ভব না এই আন্দোলনে, কারণ এর বিস্তৃতি ব্যাপক, তারপরও ইরানের জন্য কিছুটা হলেও প্রযোজ্য। কারণ সেখানে রাজনৈতিক অধিকার রুদ্ধ, বাকস্বাধীনতা বলতেই নেই, শাসকের দমনপীড়নও সব সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে।

একটি মুক্ত বিশ্বের দাবিতে, যেখানে নারীর ওপর কোনরকম নিয়ন্ত্রণ, অবদমন চলবে না, ধর্মের নামে নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না হাজার বছরের জগদ্দল পাথর, লড়ে যাচ্ছে ইরানিদের সাথে ঐকমত্য রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীরা।

নারীরা জয়ী হোক এই লড়াইয়ে। সার্বিক অর্থে নারী-জীবন-মুক্তি হয়ে উঠুক আমাদের সবার শ্লোগান। স্যালুট।

 

সুপ্রীতি ধর: প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক উইমেন চ্যাপ্টার এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান উইমেন চ্যাপ্টার ইন্টারন্যাশনাল

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.