সন্তান কখনোই স্বামী-স্ত্রীর ভাঙ্গা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর মাধ্যম নয়

রিমু সিদ্দিক:

স্বামীকে সংসারে বেঁধে রাখার দড়ি (কৌশল) কখনও সন্তান নয়। হতে পারে না। নারীরা এই কথা বুঝবে কবে? কেউ কেউ শাকিব, অপু-বুবলীর ঘটনায় শুধুই শাকিবের দিকে আঙ্গুল তুলছে, আবার কেউ কেউ কেবলমাত্র দুটো মেয়ের সমালোচনা করছে। আমিও হয়তো নতুন কিছু বলবো না, হয়তো আমার মতামতের সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন, তবুও এটুকু বলার স্বাধীনতা তো আমার আছে। নয় কি?

আমি বলি কী, শাকিব দুজন সাধারণ মেয়েকে দেশের প্রথম সারির নায়িকা বানিয়েছে, একের পর এক সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ করিয়েছে। বিয়ে করেছে, সন্তান দিয়েছে। শাকিবকে আমি দুধে ধোয়া তুলসি বলছি না। কারণ সে প্রতারণা করেছে সবার সাথেই। এখন তো আবার তৃতীয়জনের খবর পাওয়া গেল। বর্বরোচিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন শাকিব খান তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে সফল হয়েছে। আর তাতে ইন্ধন জুগিয়েছে ততোধিক পুরুষতান্ত্রিক নারীরাই। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক দেশের পুরুষ উচ্চতার শিকড়ে পৌঁছার পর বা সুযোগ পেলেই নারী সঙ্গকে স্মার্টনেস ভাবতে শুরু করে। কিন্তু সবারটা চোখে পড়ে না। শাকিব সুপারস্টার, নামধারী, তাই তারটা ফোকাসে আসে। আর বলদা স্মার্ট ফেঁসে যায় প্রমাণ রেখে। শাকিবও ব্যতিক্রম নয়।

শাকিবের নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন, সমাজে নন্দিত হয়েছেন, অনেকের স্বপ্নকন্যা হয়েছেন। তবে বাস্তবের দাম্ভিক অসুরকে বধ করতে পারেননি। পর্দার নায়িকা হলেও বাস্তবের নায়িকা হতে পারেননি। এসব নায়িকাদের কাছে সন্তানের জন্য শুধু প্রয়োজন একজন নামওয়ালা বাবার, বলিষ্ঠ অভিভাবকের প্রয়োজন নেই।

যেকোনো সম্পর্কের টানাপোড়েনে তৃতীয় পক্ষের আগমন সেই সম্পর্কের ফারাক আরও বাড়িয়ে দেয়। গণমাধ্যমের সূত্র ধরেই জানা যায় শাকিব-অপুর টানাপোড়েনের মূলহোতা বুবলী। একইভাবে বুবলীর বেলায় নাম এলো পূজা চেরীর। এগুলো সবারই জানা, তাই আর বিবরণে গেলাম না ।

প্রায়ই শুনি নতুন বিয়ে হয়েছে, তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিয়ে নিতে। জামাই একটু বে-কায়দার হলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আদৌ কি তা হয়? স্বামীকে কব্জায় রাখতে সন্তানকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতা এটি। কিন্তু একটি সন্তানের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সন্তান জন্ম দেওয়া আমার কাছে মহা অপরাধের মতো। আর সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ দু’জনেরই সম্মতি থাকা বাঞ্ছনীয়। এ ক্ষেত্রে আইনের বাস্তবায়নও জরুরি। তাহলে যেমন রক্ষা পাবে বোকা নারীর দল, বেঁচে যাবে বলির পাঁঠা সন্তানগুলি।

বাবা-মা কখনও সন্তানের প্রয়োজনে সন্তান জন্ম দেয় না। দেয় তাদের নিজের প্রয়োজনে। আর একটি সন্তানকে কখনও কখনও তার দায় চুকাতে হয় আমৃত্যু। তাই সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক পরিবেশ, আর্থিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি সঠিক নীতি নির্ধারণ হতে পারে।

মূল কথায় যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা গল্প বলি। সবে এইচএসসি পাস করে অনার্স ১ম বর্ষে ভর্তি হওয়া একটি মেয়ে। বয়স ১৮ হয়নি। প্রাইভেট হোস্টেলে থাকে। টুকটাক পরিচয় বাড়ছে। এরই মধ্যে রুমমেটের মাধ্যমে তার এক বন্ধুর সাথে পরিচয়। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা। গাড়ি-বাড়ি সবই আছে, সাথে সুদর্শন-স্মার্ট। এক-দুই করে দুইজনের সম্পর্ক সামনে গড়াতে থাকে। চা-কফি, রেস্টুরেন্ট থেকে বেড়াতে যাওয়া। এভাবেই সম্পর্কের ফাঁদে পড়ে মেয়েটি। হ্যাঁ, ঠিক বলেছি, ফাঁদেই পড়ে।

তার আগে একটু বলে নিচ্ছি আমি কী করে জানি। আমিও একই হোস্টেলের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন থাকার কারণে মাঝে মাঝে হল সুপারের অনুপস্থিতিতে অতিরিক্ত হল সুপারের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে আমাকে। এই সুযোগে অনেক মেয়ের সুখে-দুঃখের ভাগিদার হয়েছি প্রায় সাত বছরে।

যেমন-কোনো মেয়ে প্রেমিকের সাথে অভিমান করে নিজের মাথা ফাটিয়েছে তাকে গভীর রাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। জ্বীনে ধরা মেয়ের পাগলামী সামলাতে তার সাথে দাঁতে দাঁত কামড়ে বসে থাকা। পছন্দের মানুষের সাথে দেখা করতে যাওয়া  মেয়েকে শাড়ি ধার দেওয়া, সাজিয়ে দেওয়া। প্রিয়জনের জন্য সবাই মিলে খাবার রান্না করা, কে ডিম চুরি করলো বা কে কার বালতির পানি ফেলে দিলো, সাত বছরের এমন অনেক গল্প।

এসবের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি মনে গেঁথে থাকে সবে এইচএসসি পাস করা মেয়েটির কথা। প্রায় সময় দেখতাম নীরব হয়ে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। শুধু তাকিয়েই থাকে। আমি বন্ধুত্ব করলাম। নিজের গল্প বলি, তার গল্প শুনি। ধীরে ধীরে আমাদের বন্ধুত্ব হয় এবং বিশ্বস্ততা বাড়ে। সে তার নিরবতার কারণ একটু একটু করে বলে। একদিনের শারীরিক সম্পর্কে মেয়েটি কনসিভ করে ফেলে। তা জানতে পারে এক মাস পর। কারণ তার এসব জানা বা বোঝার মতো কোনো জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ছিলো না। এই সম্পর্কের একদিন পরেই প্রেমিক পুরুষটি ব্যবসায়িক কাজে চলে যায় বিদেশে। একমাস পর এসে দেখে মেয়েটি অসুস্থ, খেতে পারে না, বমি হয়। সব শুনে ছেলেটি প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট কিনে দেয়। যা দেখেই নাকি মেয়েটির শরীর কাঁপতে থাকে। পরদিন ফল এলো পজেটিভ, যা দেখে এক ঘণ্টা নিস্তেজ হয়ে ওয়াশরুমেই পড়েছিলো মেয়েটি। শরীরে শক্তি ছিলো না, নড়তে পারছিলো না। সব জানলো ভদ্রলোক এবং তখন মেয়েটিকে জানালো  যে তিনি বিবাহিত।

এসব কিছুর পর মেয়েটির প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

সে বললো, ‘বিবাহিত শোনার পর আর কিছুই বলিনি তাকে। কোনো কিছু বলে ব্ল্যাককমেইল করিনি বা রাগও করিনি। সেটা করার মতোন দাপট আমার পরিবারের ছিলো। শুধু ওই ব্যক্তির স্ত্রীর কাছে মনে মনে সরি বলেছি। কারণ হলো উনার স্ত্রীর জায়গায় আমি বা আমার বোনকে বসিয়েছি। আর নিজেকে অপরাধী লেগেছে। সেইসাথে এমন প্রতারকের সাথে যে নারী থাকে তার জন্য মায়া হয়েছে। এরপর আমি তার সাহায্য নিয়েই গর্ভপাত করেছি এবং যোগাযোগ বন্ধ করেছি। আমি আসলে একটি সন্তানকে গুটির চাল হিসেবে ব্যবহার করে কষ্ট দিতে চাইনি।’

ওর কথা শুনে আমি বিস্মিত হলাম কিছুটা। অপরাধ না করেও নিজেকে অপরাধী বললো আঠারো না পেরোনো মেয়েটি। অজানা এক ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইলো, ভ্রুণকে পৃথিবীর আলোয় না আসতে দিয়ে অনাগত সন্তানের কষ্ট লাঘব করলো। দেশের প্রথম সারির নায়িকাদের দৌড়ঝাঁপ দেখে সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে গেল আজ। যারা রুপালি পর্দায় কতো অপরাধের প্রতিবাদ করে বলিষ্ঠ কণ্ঠে, দুঃসাহসী অনেক চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয় হয়েছেন। রূপালি পর্দায় ভিলেনকে পেটান নির্দয়ভাবে। তারাই ভিলেনের মতো একজন আরেকজনের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে হাজির হন। নায়করূপী ভিলেনকে পাওয়ার জন্য কৌশল খুঁজেন। তাকে ছুঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ করতে জানে না। জানে না যে জন্মদাতা শুধু জন্মই দেয়, কিন্তু বাবা হয়ে ওঠে না, সে কীটতুল্য। কীটের পরিচয়ে মানব সন্তান পরিচিত হয় না, কীটকে পায়ে মাড়িয়ে দিতে হয়।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে তাই অর্থনৈতিক মুক্তি কিংবা শিক্ষা আমাদের নারীদের কতখানি মানসিক মুক্তি এনে দিতে পেরেছে তা আজও সত্যিই প্রশ্নবিদ্ধ।

অপু-বুবলী বা শাকিব কাউকেই আমি এখানে কাঠগড়ায় তুলতে চাইনি। তারা একটি ইস্যু বা উদাহরণ মাত্র। এটি আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের একটি বাস্তব চিত্র। আমরা নিজের সুখের জন্য অন্যের সুখ ধ্বংস করি। ক্ষণস্থায়ী আমিকে চিরস্থায়ী করার মিথ্যা প্রচেষ্টায় আমরা যে দগ্ধ জীবন তৈরি করি সেই জীবনভাবনার প্রাসঙ্গিকতাই প্রকাশ করতে চেয়েছি।

রিমু সিদ্দিক, গণমাধ্যম কর্মী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.