একাকি মায়ের সন্তানের চলার পথটি হোক সুগম ও নির্ভার

শাহানা লুবনা:

শাকিব খানকে নিয়ে অনেকেই লেখালেখি করছেন, ট্রল করছেন। রস ব্যঙ্গাত্বক বিভিন্ন ধরনের পঙক্তিরও জন্ম হয়েছে যেমন: “কোনো প্রেমিকা এসে আমার গেটে, ফিরে যাবে না খালি পেটে।” আবার, “O+ রক্তের ধারক আর শাকিব খান উভয়ই সর্বজনীন দাতা” ইত্যাদি…।
এইসব যারা করছেন তাদের বেশিরভাগই দেখলাম পুরুষ। অন্যদিকে না গিয়ে বিষয়টিকে পজিটিভলিই দেখি। এই কারণে যে, পুরুষ সমাজ অন্য একজন পুরুষের বিরুদ্ধে লিখছেন বা ট্রল করছেন।

শাকিব খান একজন polygamous অর্থাৎ বহুগামী পুরুষ। জানি না রাত্রি, অপু, বুবলিকে তিনি বিয়ে করে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন কিনা? যদি না করে থাকে তবে তিনি ‘ব্যাভিচারি’র মধ্যেও পড়েন। দেশের প্রচলিত আইনে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের সদিচ্ছায় যৌনতায় কোনো বাধা নেই, কিন্তু সমাজে বাধা আছে, ধর্মে বাধা আছে, লালিত মনস্তত্ব ও মূল্যবোধে বাধা আছে।

সমাজ, কিংবা ধর্ম বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে বা কী করছে সেটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যেতে চাই না। তবে আইনে যেহেতু বাধা নেই সে কারণে এখন যৌনতার চৌর্যবৃত্তি অনেক বেশি। আর শাকিব খানের মতো ব্যক্তিদের বহুগামিতার পথটাকে সুগম করার জন্য অপু, বুবলীরাও যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী। কারণ তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বিষয়টা জানেন বা জানতেন। এ ধরনের ব্যক্তির সন্তান গর্ভে ধারণ করাও আমার মতে অন্যায়।

এখন মূল বিষয় যেটি প্রাধান্য পেয়েছে তা হচ্ছে সন্তানের পিতৃপরিচয়। অপু, বুবলি দুজনই সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ার সামনে উপস্থিত হয়েছেন, কান্নাকাটি করেছেন। বিষয়টি যেহেতু ভাইরাল হয়েছে তাই অনেকেই অভিমত দিয়েছেন পিতৃ পরিচয়ের দরকারটা কী? তারা দুজনই তো বাচ্চা লালন-পালনে সক্ষম। তবে কি সমাজের ভয়ে, লোকলজ্জার ভয়ে? এই ধরনের নানাবিধ প্রশ্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্থাপিত হয়েছে।

কেবল ভাত-কাপড় দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলার নামই লালন-পালন নয়। একাকি মা সন্তানকে বড় করে তোলার ব্যাপারে সমাজ, রাষ্ট্র কী ভূমিকা পালন করে সেটাও বিবেচ্য। অনেক সময় সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের ব্যাপারে সমাজকে উপেক্ষা করতে পারলেও কিছু বিষয় আছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। একটা সময় ছিল যখন সন্তানের স্কুল ভর্তি থেকে শুরু করে সর্বত্র বাবার নাম লিখতে হতো। সন্তানকে মা দশ মাস গর্ভে ধারণ করলেও মায়ের এসব ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা ছিল না। বলা যায়, মায়ের সন্তান জন্মদান থেকে লালন-পালনের কোনো লিখিত স্বীকৃতিই ছিল না। বাবার নাম পরিচয়টাই তখন মুখ্য ছিল। ১৯৯৮ সালের ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবসে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখার ঘোষণা দেন এবং ২০০০ সালের ২৭ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হয়। আর সার্টিফিকেটে পিতার নামের সাথে মায়ের নাম লেখা চালু হয় ২০০৪ সাল থেকে। অর্থাৎ সে সময় থেকে বাবার নামের পরে সন্তানকে মায়ের নাম লেখার অনুমতি দেয়া হয়। খুব বেশিদিন আগের কথা নয় কিন্তু। এখন পর্যন্ত এই নিয়মই চালু আছে। সন্তান যেহেতু বাবা মা দুজনের, সুতরাং দুজনের নামই লিখতে হবে।

সন্তান লালন-পালনের লড়াইটা বাবা মা দুজনের হলেও অনেক সময় দেখা যায় তাদের বিচ্ছেদের কারণে এই লড়াইটা একাকি একজন মাকেই নিতে হয়। এখানে বলে রাখি, সন্তানের খরচ বহন করা আর দায়িত্ব নেয়া এক নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা সন্তানের খরচ বহন করার বিষয়টি নিয়ে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়ান আর মা তার দশভূজা দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন।

সেসময়টা মাকে কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। ধরে নিলাম, একজন মা সমাজ এবং মানুষের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়ার বিষয়টিকে উপেক্ষা করে একাকি চলতে এবং সন্তান লালন পালন করতে শিখে গেছেন। এই পথ চলা, এই শেখা কিন্তু মোটেই সহজ কাজ নয়। এই কণ্টকাকীর্ণ পথটা যখন একজন মা অতিক্রম করতে যায় তখন কেবল সমাজ নয়, রাষ্ট্র দ্বারাও সে কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়।

একটা ঘটনা বলি, কয়েক মাস আগে থেকে সরকার ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক আইডি তৈরির একটি কার্যক্রম শুরু করেছে। যথারীতি অভিভাবকদেরকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। এর মধ্যে রয়েছে বাবা এবং মায়ের জন্মসনদ। একদিন এক মা আমাকে ফোনে জানালেন, তার পক্ষে কোনোভাবেই বাবার জন্মসনদ জমা দেয়া সম্ভব নয়। কেননা তার সাথে স্বামীর বিচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। আমি তখন বললাম, কোনো আত্মীয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করে আনেন। উত্তরে তিনি জানালেন, ‘অনেকটা পথ আত্মসম্মান নিয়ে একাকি পাড়ি দিয়ে এসেছি। কন্যাকে লালন-পালন করেছি। কখনও সে খবরও রাখেনি। এখন আমার কন্যা বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে। আমরা মা-মেয়ে চাই না জীবনের এই পর্যায়ে এসে তার কোনো সহযোগিতা আমাদের লাগুক। যদি মায়ের পরিচয়ে আমার সন্তানের ইউনিক আইডি হয়, হবে, তা নাহলে এই ইউনিক আইডির দরকার নেই।’ আমি নির্বাক হয়ে এক সাহসী মায়ের বক্তব্য শুনলাম। আর হৃদয় নিংড়ানো এক বুক ভালোবাসা তার জন্য উজার করে দিলাম।

আরেকটি ঘটনা বলি, পরিচিত এক বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর তাদের সন্তান দুঃখ করে তার ব্যাভিচারী বাবা সম্বন্ধে মাকে বলেছিল, ‘তুমি তো ভাগ্যবান, চাইলেই তুমি তার (বাবার) নামটি তোমার জীবন থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারো, অথচ আমরা সন্তানরা কতটা দুর্ভাগা সারাজীবন এমন একটা মানুষের নাম বয়ে বেড়াতে হবে!’

একটি বয়সে সন্তানের নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার জন্মায়। ভালোমন্দ বিবেচনাবোধ জন্মায়। তবু রাষ্ট্র কর্তৃক কিছু নিয়ম কানুন, অনুশাসনে সে বাধা পড়ে যায়। বিব্রত হয় নিজের কাছে।
তাই এ ধরনের কিছু কিছু বিষয়ে অপশন রেখে রাষ্ট্রকে সংশোধনের বিবেচনায় আনা উচিত। যেন আগামী প্রজন্মের জীবন চলার পথটি সুগম হয়, নির্ভার হয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.