নারী মুক্তি, পোশাকের স্বাধীনতা ও একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

জিন্নাতুন নেছা:

স্বাধীনতার বিপরীত হলো পরাধীনতা। সুতরাং বলা যেতেই পারে স্বাধীনতা শব্দটি কিছু বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত হয়। যার সাথে সামাজিক, ধর্মীয়, নৈতিক, রাষ্ট্র, আইন অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে থাকে। স্বাধীনতা মানেই কোন স্বেচ্ছাচারিতা নয়। আপনি স্বাধীনতার চর্চা করতে গেলে আপনাকে উপরিউক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখেই চর্চা করতে হবে।

অন্যদিকে মুক্তি হলো এমন একটা বিষয়, যেটা স্বাধীনতার এক ধাপ উপরে। যখনই আপনি স্বাধীনতার পুরোপুরি এবং কার্যকরি চর্চা করতে পারবেন, তখনই আপনি মুক্তির সাধ উপভোগ করতে পারবেন।

তবে আমার এতোদিনের কাজের অভিজ্ঞতা বলে, স্বাধীনতা সার্বজনীন কিছু না, বরং অনেক বেশি আইনী কাঠামো ও প্রেক্ষিত নির্ভর। অন্যদিকে যখন একজন মানুষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সকল বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নামই মুক্তি ।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদহারণ হলো, ১৯৭১ সনের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম’, ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলেছিলেন। আর তারই জের ধরে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি ঠিকই, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুক্তির পথ সবসময় কণ্টকাকীর্ণ এবং দীর্ঘ। এই পথে পা বাড়ালে মনের জোর দরকার, আদর্শিক লড়াই দরকার। সকল বাধাকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন সমাজের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও Subjective and objective condition বোঝা। নিজের উপর বিশ্বাস রেখে লড়াইটাকে এগিয়ে নেয়া। এসব ব্যতীত প্রকৃত মুক্তি সম্ভব না।

স্বাধীনতার অনেক প্রকারভেদ আছে যার অন্যতম হলো ব্যক্তি স্বাধীনতা। ব্যক্তি স্বাধীনতা (ইংরেজি: Civil liberty বা Personal freedom) হলো ব্যক্তিগত অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, যা সরকার সাধারণত নির্ধারিত প্রক্রিয়া ব্যতীত আইন বা বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে খর্ব করতে পারে না।

এদিকে ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা মানেও স্বেচ্ছাচারিতা নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুক্তি,  স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা খুব বহুল ব্যবহারিক শব্দ। যেগুলোকে সামনে রেখে পথ চলছে, পথ ঘোলাটে হচ্ছে আবার নতুন নতুন আইডিয়া জেনারেট হচ্ছে।

নরসিংদীর রেল স্টেশনে একজন নারীকে হেনস্তা করার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পোশাকের স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে আসে। অন্যদিকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার গাড়িতে চেপে সপরিবারে কুর্দিস্তান থেকে রাজধানী তেহরানে আসছিলেন ২২ বছরের মাহসা আমিন ওরফে জিনা আমিন। সেই সময়ে তাঁদের গাড়ি আটকায় ইরানের পুলিশ। গাড়িতে মাহসা হিজাব পরেননি বলে পরিবারের সামনেই মাহসাকে গ্রেফতার করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। পরে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় ওই তরুণীর। এ ঘটনায় প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে এবং আবারও আন্তর্জাতিক পরিসরে পোশাকের স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে উঠে এসেছে। দুটো ঘটনার কোনটাই পোশাকের সাথে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। এটি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মীয় উগ্র চিন্তা ও মননের বহিঃপ্রকাশ।

পোশাকের স্বাধীনতা মানে রাস্তায় অশালিনতা নয়, আবার পোশাকের অজুহাত তুলে কোন নারীকে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণ করার মতো মধ্যযুগীয় আক্রমণ শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, ফৌজদারি অপরাধও। কোন আইনী কর্তৃপক্ষ একে কোনভাবেই justify করতে পারেন না। পোর্টল্যান্ড ষ্টেট ইউনিভার্সিটির একজন গবেষক দেখিয়েছেন, একজন পুরুষের ধর্ষক হয়ে ওঠার সূচনা তার নিজ পরিবারে। তাঁর ভাষায় ‘dysfunctional parental relationship’, যা শুরু হয় কৈশোরে।

আর এখানেই ধর্ম, মিডিয়া ও পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধারণা দেয়, নারী হচ্ছে যৌনবস্তু, ভোগ্যবস্তু নানাভাবে বস্তুকরণ (Objectification) করা যা দেখলেই তেঁতুলের মত মুখে জল আসে। এই তেঁতুল তত্ত্ব থেকে সভ্য জগতের মানুষকে বের হয়ে আসতে হবে। নারীকে নারী নয়, নারীকে মানুষ হিসেবে দেখবে হবে। রাষ্ট্র পরিবার ও সমাজে নারী -পুরুষের সম মর্যাদা ও সম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, তবেই না সত্যিকারের মুক্তি আসবে।

ক্লারা জেটকিনের কথা দিয়ে শেষ করবো। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর সকল মেহনতি মানুষের মুক্তির সাথে নারীমুক্তিও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত- এই সংগ্রামকে ছড়িয়ে দিতে আজীবন লড়েছেন সুদৃঢ়ভাবে। আমরা কি সেইপথে কোনদিনও হাঁটবো না?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.