প্রসঙ্গ যদি ইডেন কলেজ আর ছাত্রীদের সম্মানের বিষয়-ই হয়

সালমা লুনা:

ইডেন কলেজে ভর্তি বাণিজ্য, হলের সিট বাণিজ্য ইত্যাদি কোন্দলের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের সামনে এক ভয়ঙ্কর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ইডেনের ছাত্রীদের বাধ্য করা হয় ‘সেক্স স্লেভ’ হতে। কলেজটির ছাত্রলীগের কর্মীরাই ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছে।

এতোবড় একটা ঘটনা, এতো ভয়াবহ অভিযোগ অথচ চারিদিকে কেমন একটা অস্বস্তিকর নীরবতা। যেন কিছুই হয়নি, এটাই স্বাভাবিক – এমন এক উদাসীনতা। দু’চারজন যদিও বা কিছু বলতে চেষ্টা করছেন, ইডেন কলেজের ইমেজ রক্ষক দলটি উঠেপড়ে লেগেছে সেটিকে থামিয়ে অন্যদিকে প্রবাহিত করতে।

আরেকটা দলও অবশ্য সরব। যারা সবসময়ই প্রতিক্রিয়াশীল, নারীর প্রতি অসংবেদনশীল, কুরুচিপূর্ণ আক্রমণে পারদর্শী।
মূলত এদেরই প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইমেজ রক্ষক দলটি প্রতিবাদ করা, বিচার চাওয়ার পরিবর্তে সব মেয়ে রাজনীতি করে না, সব মেয়ে সেক্স স্লেভ না, এসমস্ত ডিসক্লেইমার দিয়ে ঘটনাটিকে হালকা করে দিচ্ছেন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন হলেও সরকার দলের কেউ এখনও মুখ খোলেনি।

ভাবছিলাম, আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন না হয়ে যদি আজ বিএনপির ছাত্রদল হতো, তাহলে কী হতো? কিংবা হতো ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীর যৌনদাসী, তাহলেই বা কী হতো?
যাক, কল্পনা না করাই ভালো কী হতো!
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এতো উদারও নয় যে এতোকিছু বলতে বা কল্পনা করতে দেবে।

তবু কিছু প্রশ্ন তো অন্তত করা যায়।

যে মেয়েটি শহরে থেকে লেখাপড়া করবে বলে হোস্টেলে উঠলো, তাকে সিট পাওয়ার জন্য রাজনীতির আশ্রয় নিতে হয়ই বা কেন?
কেন সে স্বাভাবিকভাবে সিট পাবে না? কেন ভর্তিকে কেন্দ্র করে এমন পুরনো বিখ্যাত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বাণিজ্য হবে?
মেয়েরা যদি রাজনীতি করতে চায়, তবে কেন একদিন সেই মেয়েটিকে তারই রাজনীতির সতীর্থ কিংবা বড় ভাইয়ের হাত ধরে পৌঁছে যেতে হয় হোটেলে বড় নেতার কাছে? বড় ক্ষমতাধরদের সন্তুষ্ট করতে, রাজনীতিতে পদ পেতে ভেট হিসেবে কেন মেয়েদের রিজার্ভে রাখেন এই সতীর্থ বা বড় ভাইয়েরা?
এই মেয়েরা সবাই কি স্বেচ্ছায় যায়? অনেক সময় উচ্চাভিলাষী মেয়েগুলো উপরে উঠতে নিজেরাই ব্যবহৃত হয়। সে স্বেচ্ছায় গেলেও এসব কলেজকেন্দ্রিক কেন হবে?
গিভ এন্ড টেক অথবা পৃথিবীর আদিমতম পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে সেটি কোন শিক্ষালয়কে কেন্দ্র করে কীভাবে হতে পারে? হচ্ছে বলে কেন অভিযোগই উঠলো?

যারা আকাশ থেকে পড়লেন এই তথ্য জেনে, আর যারা ছাত্রলীগ বা ইডেন কলেজের সাফাই গাইছেন, তাদের জন্য কোন সমবেদনাই নাই আজকে।
কারণ যখন সেঞ্চুরি মানিকের পর্দা উঠলো জাবিতে, রোকেয়া হলের কেচ্ছাগুলো সেই নেটছাড়া যুগেও প্রকাশ পেতো- তখন সচেতন হলে এখন হয়তো এই দিন দেখতেই হতো না।
কারণ এই দেশ ধর্ষক-বান্ধব। আমরা জেনেবুঝেই কোন না কোন সময় ধর্ষকের পক্ষাবলম্বন করে থাকি।

বাজি ধরতে পারি, এখনও যদি কোন কর্পোরেট দুনিয়ার হর্তাকর্তাদের নিয়ে এমন কিছু শোনা যায় তখনও দেখা যাবে তাদের তাঁবেদার, জোগানদার, পাইক বরকন্দাজ ইয়ারদোস্তের অভাব হবে না। কখনও কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যৌন নিগ্রহকারী হলে বা এসবের সাথে জড়িত থাকলে কীভাবে যেন তারা দায়মুক্তি পেয়েই যায়।

ইডেন কলেজে যা ঘটেছে বলে জানা যাচ্ছে তার প্রতিবাদ করে প্রতিকার খুবই জরুরি।

আমরা সবসময় দেখছি, কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠানে দলগতভাবে নারী নিগ্রহ হয়, বা হয়েছে এই অভিযোগটা কেন জানি সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িতরা মেনে নেন না। তারা ধামাচাপা দিতে উঠেপড়ে লাগেন। আর যদি বিষয়টা ঘটে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তাহলে তো প্রশ্নই আসে না মেনে নেয়ার। প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন বলে এক্ষেত্রে তেমন কিছু তারা করতেও পারেন না।

এদিকে সমাজের উঁচু পদ অলঙ্কৃত করে থাকা নারীরা, ক্ষমতা বলয়ে চড়তে থাকা কিছু চরমপন্থী নারীবাদী নারীরাও প্রাতিষ্ঠানিক ওইসব নিগ্রহের কথা প্রচার হলে কেমন জানি এলোমেলো হয়ে যান। অস্বীকার করেন। এড়িয়ে যান। অন্য দলের ইতিহাস ঘাঁটেন। ফলে ওই ঘটনার প্রতিবাদ হওয়ার চেয়ে সকলে ডিসক্লেইমার দিতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
আর অল্প কদিনেই জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে যায়, নয়তো ঘটনার বিচারের চেয়ে তর্কাতর্কি চলতে চলতে একসময় ঘটনাটিই হারিয়ে যায় সময়ের সাথে।
তখন বিচার তো দূর, ঘটনা আদৌ সত্য কীনা এই নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।

তো, এই মর্মে আপনারা যারা ইডেন কলেজের সাধারণ ছাত্রীদের বিয়েশাদির ভবিষ্যৎ এবং সম্মান নিয়ে চিন্তিত হয়ে ঘটনাটি নিয়ে উচ্চবাচ্যই করতে চাইছেন না, তারা আসলে প্রকারান্তরে ওই যৌন দাসত্বকেই প্রশ্রয় দিচ্ছেন। আপনাদেরই কারো না কারো মেয়েকে যৌনদাস হওয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছেন।

ইসলামি জঙ্গি দলে যৌনদাসী নিয়ে এতো কথা আলোচনা হলো, আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, বহু পুরনো গণমানুষের একটা দলের সবচেয়ে প্রাচীন ছাত্র সংগঠনটির নামে যে ভয়ানক অভিযোগটি উঠলো তাকে অবলীলায় গিলে ফেলতে চাইছেন, উদাসীন হয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন এ কেমন কথা!
কলেজটিতে আপনার বোন পড়ে, আপনার কন্যা পড়ে, আপনার পরিবারের মেয়েদের বিয়ে হবে না – এইসব হাস্যকর যুক্তিতে জায়েজ করে দিচ্ছেন এতোবড় জঘন্য ঘটনা?

যে বিষয় নিয়ে সারাদেশ তোলপাড় হবার কথা, বর্তমান এবং প্রাক্তন সমস্ত ছাত্রীদের ফুঁসে উঠবার কথা, অভিভাবকদের এবং সাধারণ মানুষেরও এক হয়ে প্রতিবাদ জানানোর কথা, সেটি অনুপস্থিত তো বটেই বরং দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগই নিশ্চুপ থেকে অপেক্ষায় আছেন, দেখি কী হয়! যেন এটি খুবই সাধারণ ঘটনা।
সাধারণ মানুষের আরেকটি দল যারা আদতেই নারী নিগ্রহকারী, তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে সেই পুরনো ফুর্তি। তারা ট্রোল করে, ঢালাওভাবে সব ছাত্রীদের যৌনদাসী, ইডেনকে বেশ্যালয় ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে লাগাতার নিজেদের নোংরা মানসিকতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।

অথচ হওয়া উচিত উল্টাটা।
একটা সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার কলাকুশলীদের সমূলে উৎপাটন করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত ছিল। অপরাধীদেরকে চরম শাস্তি না দিলেও অন্তত রাজনীতির অঙ্গনে নিষিদ্ধের দাবি তোলা উচিত ছিল। এসব না হলে হয়তো যে মেয়েরা এই অভিযোগ করেছে তাদের দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জোরপূর্বক বলিয়ে নেয়া হবে যে তারা রাগ করে বা নিছক জেদাজেদি করে এমন বক্তব্য দিয়েছে।

এতে হয়তো ইডেনের মেয়েদের বিয়ে ভাঙবে না, তারা এবং তাদের স্বজনরা সামাজিক মর্যাদা পুনরায় ফিরে পাবে। কিন্তু আগামি ব্যাচগুলোর মেয়েদের নিরাপত্তা বলতে আর কিছু থাকবে না। এরপর হয়তো আরও ভয়ানক কিছুই শুনতে হবে। তখন কোথায় থাকবে সম্মান? বিবেকের কাছেই বা উত্তর কী হবে!

এখনও তেমন দেরি হয়ে যায়নি। খুব আশা করছি শিঘ্রই এর সুরাহা হবে। আর এতেই বাঁচবে ঐতিহ্যবাহী ইডেন কলেজের সম্মান আর এর প্রাক্তন বর্তমান আর ভবিষ্যৎ ছাত্রীদের মান।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.