এক সুতোয় বাংলাদেশ: মায়েরা জিতলে জয়ী হয় মানুষ!

ফারদিন ফেরদৌস:

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া স্ট্রাইকার কৃষ্ণা সরকারের পায়ের জাদু সবার দেখা হয়ে গেছে! কী অসাধারণ ড্রিবলিং। গোল করবার কী চমৎকার কারিশমা। ইতোমধ্যে দেখা হয়ে গেছে বর্ণাঢ্য চ্যাম্পিয়ন প্যারেড এবং বিপুল গণ সংবর্ধনা।

গোলরক্ষক রূপনা চাকমার চোখ ধাঁধানো অসাধারণ সেভগুলো মন রাঙিয়ে দিয়ে যায় না! সাবিনা খাতুনের দল সামলানোর পাশাপাশি গোল করবার ও গোল করানোর অনন্য দক্ষতায় মন মজে যায় না? ২৩টা গোল দিয়েছে বাংলাদেশ। গোল খেয়েছে মাত্র ১টি। গোল বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছে ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভুটান ও ফাইনালি নেপালকে।

দলকে জিতিয়ে রূপনা চাকমা কী দারুণভাবে বলে দিলেন, আজ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের এই সেরা গোল রক্ষকের অর্জনটা আমার মায়ের জন্য এবং দেশবাসির জন্য উৎসর্গ করলাম। আমি যে পরিবার থেকে উঠে এসে আজ এই অর্জনটা করলাম তা হয়তো বলে শেষ করা যাবে না- তার একমাত্র সহায়ক আমার মা এছাড়া যারা আমার জন্য সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তাদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। আশা রাখি আরো সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাদের সাহায্য- সহযোগিতা পাবো। দেশের হয়ে আরো সুনাম বয়ে আনতে পারবো। আপনাদের আর্শিবাদ ও অনুপ্রেরণাই আমার পথচলা এবং সুদূরে এগিয়ে যাওয়া!

ওঁদের প্রশংসায় আমরা পঞ্চমুখ নয় শুধু
লাখো মুখ হয়ে যাচ্ছি। বহুত্ববাদের সুপার আইকন সাবিনা-কৃষ্ণা-রূপনারা শিরোপা জিতবার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কেউ বলছে না, নারীদের ফুটবল খেলা ঠিক হয়নি। তাঁদের পরা হাফপ্যান্ট ধর্মসম্মত শুদ্ধ পোশাক নয়। ফেসবুক ফিডে ভাসমান নারীর প্রতি সাইবার বুলিং, ভর্ৎসনা, টিপ্পনী ও গালাগালের জায়গা নিয়েছে হার্দিক অভিবাদন।

এই ক’দিনে এ এক বিস্ময়কর বদল আমাদের! নারীরাই পারবে তাদের অর্জন দিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে। যদি তাদের মনপছন্দ জায়গাটি খুঁজে নেয়ার স্বাধীন ইচ্ছাতে বেড়ি পরানো না হয়।

ওদের জয়ে পুরো বাংলাদেশ আজ এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে। বীরকন্যাদেররকে আমরা রাজসিক সম্মাননা দিতে পেরে নিজেরাই ধন্য হয়ে গেছি। বাংলাদেশে এমন দৃশ্য এর আগে দেখা যায়নি। স্পোর্টস মিনিস্ট্রির পৃষ্ঠপোষকতায় শিরোপাজয়ী নারী ফুটবলাররা ছাদখোলা বাসে রাজধানী ঢাকা শহরে চ্যাম্পিয়ন প্যারেড করছেন, হাজার হাজার মানুষ সেই গাড়ির পেছনে বাংলাদেশের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছেন। বর্ণিল ও বিচিত্র প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ, স্কুলের শিশু কিংবা বেখেয়াল পথচারিরা পর্যন্ত। এ যেন নারী শক্তির এক অনির্বচনীয় সুন্দর প্রদর্শনী।

অথচ এইদেশে ধর্মমঞ্চে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং নারীদের খেলার মাঠ বরাবর বিক্ষোভ মিছিল জারি রেখেছে একটি গোষ্ঠী। তারা তাদের মতো কাজ করেছে। নারীরা দেশের গৌরবের মশাল উচ্চে ধরে তাদের জবাবটা দিয়ে দিয়েছে। সবার দোয়া চেয়েছে। আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এই যে সর্বমানুষের সহাবস্থানের তরিকা, ঐকতানের মধুরতম সুর -এটিও আমাদের এই নারীদের শিক্ষা।

নারীদের জন্য এই পথটুকু পাড়ি দেয়াটা মোটেও সহজসাধ্য ছিল না।
এই ফুটবল শিল্পীদের আমরা কী দিতে পেরেছি?
না কোনো সম্মানজনক অর্থনৈতিক সাপোর্ট, না কোনো বিশ্বমানের কোচিং! রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বাইরে নয় এই মেয়েরা। ছেলেরা খেলাধুলা করে যেখানে বাড়তি আয়ের বাইরেও শুধুমাত্র বাৎসরিক বেতন পায় ৫০-৬০ লাখ সেখানে নারী অ্যাথলেটদের মাসিক আয় এ বি সি গ্রেডভেদে মাত্র ৬-৮-১০ হাজার টাকা। ছেলেদের জন্য কাড়ি কাড়ি অর্থ ঢালে কর্পোরেট হাউজগুলো। কিন্তু নারীদের বেলায় নামী কোনো স্পন্সর আসে না। অথচ এই মাটির অমৃত সন্তান ওই নারীরাই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হিসেবে প্রতিপন্ন করেছে।

ওই নেপালের কাঠমান্ডুতে ২০১৮ সালে পাকিস্তানকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হারিয়ে অনুর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ।

২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ স্বর্ণকিশোরীরা আমাদের ফুটবল অঙ্গন মাতিয়ে দিয়ে বিশ্বসভায় তাদের জাত চিনিয়েছিল। বিশ্বের ৫টি দলকে টানা হারিয়ে দিয়ে অপরাজিত থেকে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

সেই তাদেরকেই কিনা চরম অসম্মান ও লাঞ্ছনা উপহার দেয়া হয়েছিল। খেলা শেষে কোনো নিরাপত্তা না দিয়ে একটি লোকাল বাসে করে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার উপজেলার কলসিন্দুরে তাদের আঁতুরঘরে ফেরৎ পাঠানো হয়েছিল। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বেশিরভাগ সদস্যের বাড়িটা ওখানেই।

গাড়িতে অভিভাবকহীন এসব কীর্তিমতি ফুটবলারদেরকে একা পেয়ে উত্যক্তও করে ছেড়েছিল কিছু কাপুরুষ। এলাকায় যাওয়ার পরও অনেক ফুটবলার লাঞ্ছনা ও গঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন। অল্পবয়সী এই মেয়েদের প্রতি এতোটা অসম্মান, অযত্ন, উপেক্ষা, অনাদর ও অবহেলা কেন দেখানো হয়েছিল? তারা মেয়ে বলে? এই প্রশ্নই সেসময় ঘুরপাক খাচ্ছিল সর্বত্র। বাঙালির সুপার কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের নেতৃত্বে সেসময় কলসিন্দুরেই মেয়েরা প্রশিক্ষণ নিত। সেই মেয়েদের অধিকাংশই এখনও জাতীয় দলের খেলোয়াড়। যারা রাজধানী ঢাকায় একটা বিশেষায়িত মাঠ না পাওয়া সত্ত্বেও দেশের জন্য বিজয়গৌরব এনে দিয়েছে।

এখন দিন বদলেছে।
এমন মেয়েদের নিয়ে এতটুকু সমালোচনা আর চলে না। এখন শুধু গর্বে সবার বুক ভরে ওঠবার পালা। যে প্রান্তিক পরগণায় ওদের জন্ম তারা অনুভব করছে এই মেয়েদের মর্ম। ঘরে ঘরে এমন একজন কন্যা সন্তান কে না চাইবে?
নারী যদি সামান্য সুযোগও পায় অসামান্য কারিশমা সে দেখিয়ে দিতে পারে।

আমাদের চিন্তাশৈলির এই যে পরিবর্তনটা বাঙালি সমাজে এনে দিলেন আমাদের বীরকন্যারা তাঁদের প্রতি দাঁড়িয়ে কুর্ণিশ করাটাই আমাদের সমুচিত কর্তব্য। তারা না চাইলেও নিজ দেশে তাদের আগমনে রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে লাল সবুজে মোড়ানো পতাকার সম্মাননাই তাদের প্রাপ্য ছিল।

এখনো যেসব গুটিকয়েক নেটিজেন ও হাতেগোণা দু’ একজন ধর্মগুরু নারীদের ফুটবল খেলার বিরোধিতায় সরব রয়েছেন তাদের নিশ্চয়ই একদিন বোধোদয় হবে। সুশিক্ষা, সম্মান ও মর্যাদায় নারী ও পুরুষের বিভাজন সভ্য সমাজে আর চলে না -এটা মেনে চলবেন।

এই বিজয়ী নারীরাই হতে পারে আমাদের ঝুলে যাওয়া পশ্চাৎপদ সমাজব্যবস্থার সত্যিকারের চেঞ্জমেকার। আমাদের মেয়েরা শুধু মাঠেই ফুটবলের শিল্প গড়েন না, তারা কথাও বলেন ভীষণ প্রাজ্ঞতায় মেপে। আমাদের সমাজদর্পণ তো ওদেরই হওয়া উচিত।

ফাইনালের মঞ্চে নামার আগে সানজিদা আখতার তাঁর সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘যাঁরা আমাদের এই স্বপ্নকে আলিঙ্গন করতে উৎসুক হয়ে আছেন, সেই স্বপ্নসারথিদের জন্য এটি আমরা জিততে চাই। নিরঙ্কুশ সমর্থনের প্রতিদান আমরা দিতে চাই। ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনীকে এক পাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই।পাহাড়ের কাছাকাছি স্থানে বাড়ি আমার। পাহাড়িদে ভাইবোনদের লড়াকু মানসিকতা, গ্রাম বাংলার দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের হার না মানা জীবনের প্রতি পরত খুব কাছাকাছি থেকে দেখা আমার। ফাইনালে আমরা একজন ফুটবলারের চরিত্রে মাঠে লড়বো এমন নয়, এগারোজনের যোদ্ধাদল মাঠে থাকবে, যে দলের অনেকে এই পর্যন্ত এসেছে বাবাকে হারিয়ে, মায়ের শেষ সম্বল নিয়ে, বোনের অলংকার বিক্রি করে, অনেকে পরিবারের একমাত্র আয়ের অবলম্বন হয়ে। আমরা জীবনযুদ্ধেই লড়ে অভ্যস্ত। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়ে যাবো। জয় – পরাজয় আল্লাহর হাতে। তবে বিশ্বাস রাখুন, আমরা আমাদের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখবো না ইনশাআল্লাহ্। দোয়া করবেন আমাদের জন্য”।

সাবিনা, শিউলি, শামসুন্নাহার, আঁখি, মাসুরা, মণিকা, সানজিদা, মারিয়া, কৃষ্ণা, সিরাত, তহুরা, নীলুফার, ঋতুপর্ণা, রূপনা চাকমারা তাদের দেয়া কথা ঠিকঠাক রেখেছেন। আর কিছুই চাওয়া নেই এই মায়েদের, ওঁদের শুধু দরকার সুন্দর খেলার মাঠ, ন্যূনতম আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বমানের কোচিং।

দয়া করে গুটিকয়েক মিসোজিনিস্ট আপনারা নারীর পোশাক, শিক্ষা, কর্ম, ধর্ম নিয়ে আর বিভ্রান্তিকর গবেষণা করবেন না! টিপ্পনী মারবেন না!
নীতি ও সভ্যতাবিবর্জিত নারী প্রগতিবিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাস্যাস্পদ সাজবেন না!

আমাদের মায়েরা তাদের সমস্ত অর্জন সবার সাথে সমানভাবে ভাগ করে নিল। প্রকৃতিগতভাবে আপনি পুরুষ বলে সামাজিক ও ঐশ্বরিক সুবিধাবাদ বেশি পান বলে নারীর প্রাপ্য মর্যাদা কেন দেবেন না!
এক বাংলাদেশের মানুষ হয়ে কেন মানবেন না যে, মায়েরা জিতে গেলে জয়ী হয় মানুষ।

লেখক: সাংবাদিক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

ছবি: অন্তর্জাল থেকে

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.