মাশা আমিনি, তোমার অমৃত প্রাণ আমাদের চৈতন্য ফেরাবে কি?

ফারদিন ফেরদৌস:

ইরানের মাশা আমিনি। বয়স দুই যুগও পার হয়নি। জীবনটা খুব বেশি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেনি। এরইমধ্যে তথাকথিত মোরালিটি পুলিশ তাঁকে মাথায় আঘাত করে মেরে ফেলেছে।

তাঁর অপরাধটা কী? মেয়েটি নাকি রাজধানীতে এসে ঠিকঠাক হিজাব পরেনি। আর এতেই ইরানের শরিয়া পুলিশের ঠুনকো অনুভূতি টিকটিকির লেজের মতো খসে পড়ে গেছে। তাই তাঁকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো!

একটা ধর্মরাষ্ট্রের আইন ও আইনপ্রয়োগকারীরা কতোটা ভয়ংকর ও অমানবিক হতে পারে এই ঘটনা তার সবিশেষ নিকৃষ্ট উদাহরণ।

খুব বেশিদিন হয়নি তথাকথিত ব্যভিচারের অভিযোগে পিতা ও সন্তানের সামনে গর্তে ঢুকিয়ে মাটাচাপা দিয়ে পাথরনিক্ষেপে রক্তাক্ত করে সুরাইয়া নামের এক গৃহবধূকে মেরে ফেলেছে সমাজপতিরা। ওই নারীর শেষ আর্তনাদ ছিল, তোমরা মানুষের প্রতি এতোটা নির্মম হতে পারো? আমি তো তোমাদেরই একজন হয়ে ছিলাম! অথচ স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করবে বলে ওই নারীর ওপর মিথ্যা ব্যভিচারের অভিযোগ চাপিয়ে দিয়েছিল। পশ্চাৎপদ ইরানে ধর্মের নামে এমন নৃশংস ও বীভৎস ঘটনা অহরহই ঘটে চলেছে!

গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যাচ্ছে,
ইরানের তেহরানে হিজাব না পরায় দেশটির মোরালিটি (নৈতিকতা) পুলিশের হাতে আটক মাশা আমিনি নামের তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার তিনি মারা যান বলে জানায় ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমসহ বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলো। মাশার পরিবার এবং অধিকারকর্মীরা বলছেন, তরুণী মাশার মৃত্যু সন্দেহজনক। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। গত মঙ্গলবার পরিবারের সঙ্গে ইরানের রাজধানী তেহরানে যান ২২ বছরের মাশা আমিনি। তখন ইসলামি পোশাকের নিয়ম অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হিজাব না পরায় তাকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেছে, তারা মিজ মাশা আমিনির মাথায় আঘাত করে।

মাশার জানাজার সময় কিছু নারী তাদের মাথার স্কার্ফ খুলে ইরানে হিজাব পরার বাধ্যকতার প্রতিবাদ জানান। শোকার্তরা তখন ‘স্বৈশাসকের মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দেন। সোশ্যাল মিডিয়া ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের দিকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করছে আমিনি হন্তারক পুলিশ। গোপনভাবে মাশাকে কবর দেওয়া রুখতে সকালেই হাজির হতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন ওই বিক্ষুব্ধরা। মাশা তাঁর প্রাণ দিয়ে জানিয়ে গেছেন নারী বা পুরুষের পোশাক কখনোই রাষ্ট্রীয় বা পুলিশি চয়েস হতে পারে না, এটা একান্তই ব্যক্তিগত। ইরানের বেশ কিছু নারী হিজাব খুলে প্রতিবাদ করছেন, এতে অনুমান করা যায় এই পোশাকটি তাঁরা আদৌ স্বেচ্ছায় পরতে চান না।

কালো অবগুন্ঠন ছাড়াও বিশ্বস্বীকৃত বেশকিছু শালীন পোশাক আছে। সেসব পোশাক নিয়ে একশ্রেণীর BIGOT ও ফ্যানাটিক ছাড়া সাধারণের মধ্যে কোনো অভিযোগ বা বাড়াবাড়ি নেই।

একমাত্র হিজাব বা বোরকা নিয়েই রয়েছে বিশ্বব্যাপী নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনা। অথচ বাংলাদেশসহ বেশকিছু মুসলিম কান্ট্রিতে নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী সবাই ‘শালীন পোশাক’ পরে থাকে। ইতোমধ্যে খোদ সৌদিআরবের মতো অতি রক্ষণশীল রাষ্ট্রও আবায়ার মতো অবগুণ্ঠনের ওপর থেকে বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়েছে।

ফারদিন ফেরদৌস

এমন বাস্তবতায় শালীন পোশাক পরা সত্ত্বেও কেবলমাত্র হিজাবের অজুহাতে একজন নারীকে রাষ্ট্র কর্তৃক একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে এটি বিশ্ব সভ্যতার জন্য অতি অবশ্যই অশনিসংকেত। আমরা তথাকথিত মোরালিটি পুলিশিং এর এমন অবস্থানের ধিক্কার জানাই। মাশা আমিনি যেন তাদের মরে যাওয়া চেতনা ফিরিয়ে আনে এই প্রত্যাশা করি।

বাংলাদেশও ইরানি পশ্চাৎপদতার বাইরে নয়। এরইমধ্যে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী এখন বোরকা ও হিজাব পরে। কালো কাপড়ে হাত পা নাক মুখ ঢেকে নিজেদেরকে অচিন করে রাখে। স্কুল কলেজ থেকে আগেকার আনুষ্ঠানিক ড্রেস প্রায় ওঠে যেতে বসেছে।

নারীনিগ্রহের একমাত্র কারণ হিসেবে নারীর পোশাককে দায়ি করে সারাদেশে প্রকাশ্যে ক্যাম্পেন চালানো হচ্ছে। এমনকি বিস্ময়করভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরমাল ড্রেস হিসেবে বোরকা চালু করবার দাবি জানাচ্ছে একশ্রেণীর ছাত্র। বোরকা যদি ইউনিভার্সিটিতে বাধ্যতামূলক হয়ে যায় তখন সেটার নাম আর বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে না এই বোধটুকুও খোয়াতে বসেছে ওই শ্রেণীটি। একটি নির্দিষ্ট ড্রেস যখন বাধ্যতামূলক করা হবে, তাও আবার মুখ ঢেকে নারীর আইডেনটিটিকে গোপন করে রাখবার মতো অবগুন্ঠন, তাহলে ওই শিক্ষায়তনে একে অপরকে শিক্ষার্থী বা শিক্ষকরা চিনবেই কিভাবে আর ভিনদেশি কিংবা ভিন্নধর্মীদের ড্রেসেকোডের সাথে বোরকাকে কিভাবে সমন্বয় করা হবে? এই ব্যাপারটি কি নারীর ড্রেস গবেষকেরা মাথায় রাখছেন?

এরইমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইভা পরীক্ষায় এক নারী তাঁর পুরুষ পরীক্ষকের সামনে মুখ দেখাতে অস্বীকার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছেন। অথচ তিনি যদি তাঁর ধর্মের প্রতি অবিচল থাকতেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় এড়িয়ে গেলেই চলত।

অবস্থাদৃষ্টে আমরা ধারণা করতেই পারি ক্রম অগ্রসরমান পৃথিবী থেকে আমরা সহসাই বিচ্ছিন্ন হতে চলেছি। চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি ও পোশাকের স্বাধীনতা যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি, যদি আমাদের চৈতন্য না ফেরে; তবে অচিরেই বাংলাদেশেও মোরালিটি পুলিশের দেখা মিলতে পারে। আমরাও একেকজন যখন তখন হয়ে যেতে পারি ভয়াল নির্মমতার শিকার মাশা আমিনি।

লেখক: সাংবাদিক
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.