‘গোলমেশিন’ সাবিনা খাতুনকে কতটুকু সম্মান দিতে পেরেছি আমরা?

অনুপম সৈকত শান্ত:

সাবিনা খাতুন। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। ২০০৯ সালে সাতক্ষীরা জেলা দলের হয়ে প্রফেশনাল ফুটবলের শুরু (২০০৭ সালে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী থাকা অবস্থায় প্রথম স্কুল ফুটবল খেলা), সেই লীগে গোলবন্যা বইয়ে দেয়ায় সে বছরেই জাতীয় দলে ঢুকেছে। সতীর্থরা একে একে অনেকেই চলে গিয়েছে, সাবিনা এখনও খেলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জার্সিতে সর্বোচ্চ ৫০ ম্যাচ খেলার রেকর্ড তার, এই ৫০ ম্যাচে ৩৯ গোল দিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতাও সে। ২০১৫ সাল থেকেই জাতীয় দলের অধিনায়ক, ২০১৬ সালের সাফ ফুটবলে তারই অধিনায়কত্বে সাফের ফাইনালে উঠে দল! আর এবারে তো চ্যাম্পিয়ন হলো। এই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে দুই হ্যাট্রিকসহ ৮ গোল দিয়ে গোল্ডেন বুট জিতেছে। টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ও সে, ফাইনাল ম্যাচে গোল না পেলেও দলের দ্বিতীয় গোলটি তারই বানিয়ে দেয়া।

সাবিনা খাতুনের গোল করার ক্ষমতা কতটুকু? জাতীয় দলের জার্সিতে ৫০ ম্যাচে ৩৯ গোল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে তার সতীর্থ কৃষ্ণা রানী সরকার (৯ গোল) ও সিরাত জাহান স্বপ্না (৬ গোল)। পুরুষদের জার্সিতে আমাদের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনজন হচ্ছে আশরাফ উদ্দিন চুন্নু (৫০ ম্যাচে ১৭ গোল), জাহিদ হাসান এমেলি (৬৪ ম্যাচে ১৫ গোল) ও মোহাম্মাদ আসলাম (৬৮ ম্যাচে ১৪ গোল)! সাবিনার ঘরোয়া লীগে গোল করার হার দেখলে তো চোখ কপালে উঠে যায়!

* ২০০৯-১২ সালে সাতক্ষীরার হয়ে ২১ ম্যাচে গোল করেছে ৭০ টা।
* শেখ জামালের হয়ে এক মৌসুমে (৫ ম্যাচে) ২৫ গোল,
* মোহামেডানের হয়ে এক মৌসুমে (৫ ম্যাচে) ২৮ গোল,
* বিজেএমসি’র হয়ে ২০১৪-১৬-এ ১২ ম্যাচে ৭৪ গোল,
* মালদ্বীপের লীগে ১২ ম্যাচে ৪৩ গোল, ভারতে ৭ ম্যাচে ৬ গোল, আর
* বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ২৫ ম্যাচে ৬২ গোল।

বাংলাদেশের নারী-পুরুষ ফুটবলে ঘরোয়া লীগে এই সংখ্যক গোল কোন খেলোয়াড়ই করতে পারেনি, কোনদিন পারবে বলে মনেও হয় না! সাবিনা খাতুনকে ডাকা হয় গোলমেশিন!

সাফ ফুটবলে বাংলাদেশকে রানার আপ, চ্যাম্পিয়ন বানানো সাবিনা খাতুনকে কতটুকু সম্মান দিতে পেরেছি আমরা? স্বাধীনতা পদক, একুশে পদকের কথা বাদই দেই, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারটা পর্যন্ত তাকে দিতে পারিনি। বয়সভিত্তিক দল ও জাতীয় দলকে অনেকগুলো ট্রফি জেতানো কোচ গোলাম রব্বানি ছোটনকেও কোন সম্মাননা দিতে পারিনি আমরা। অথচ আমাদের ক্রিকেটার ও ক্রিকেট সংগঠকরা কতগুলো জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছে?
* আকরাম খান – ১৯৯৮ সাল
* শেখ দৌলত ও ওমর খালেদ – ২০০১ সাল
* মিনহাযুল আবেদিন নান্নু ও নাসির আহমেদ নাশু – ২০০২ সাল
* জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা ও আমিনুল ইসলাম বুলবুল – ২০০৩ সাল
* আ স ম ফারুল – ২০০৪ সাল
* মোহাম্মাদ রফিক – ২০০৬ সাল
* সৈয়দ আব্দুল মজিদ – ২০০৮ সাল
* নাঈমুর রহমান দুর্জয় – ২০০৯ সাল
* মাশরাফি বিন মর্তুজা – ২০১০ সাল
* খালেদ মাসুদ পাইলট – ২০১১ সাল
* সাকিব আল হাসান – ২০১২ সাল
* মুজফফর হোসেন পল্টু ও খালেদ মাহমুদ সুজন – ২০১৩ সাল
* এনায়েত হোসেন – ২০১৪ সাল
* আহমেদ সাজ্জাদুল – ২০১৫ সাল
* মোহাম্মাদ জালাল ইউনুস ও হাবিবুল বাশার- ২০১৬ সাল
* দিপু রায় – ২০১৯ সাল
* আফজালুর রহমান (মরণোত্তর) ও নাজমুল আবেদিন ফাহিম – ২০২০ সাল

ফুটবলেও চুন্নু, কায়সার হামিদ, মোনেম মুন্না, আরিফ খান জয়- থেকে শুরু করে অনেকেই জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেলেও- কোন নারী ফুটবলারের ভাগ্যে এই পুরস্কার জোটেনি! বাংলাদেশের প্রথম ফিফার প্যানেল ভুক্ত নারী রেফারি জয়া চাকমাকেও এই পুরস্কার দিতে পারিনি। এমনকি ২০১৮ সালে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটাররা এশিয়া কাপ জেতার পরেও অধিনায়ক সালমা খাতুন বা একজনকেও এই ক্রীড়া পুরস্কার দেয়া হয়নি।

স্বাধীনতা পুরস্কারের একটা ক্যাটাগরি হচ্ছে ক্রীড়া। এটি পেয়েছে কাজী সালাউদ্দিন, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া কিংবদন্তী সাঁতারু ব্রজেন দাস, সাফ গেমসে পাঁচ সোনা পাওয়া মোশাররফ হোসেন, সাউথ এশিয়ার প্রথম গ্রান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ, কমনওয়েলথ গেমসে প্রথম সোনা জয়ী শুটার আতিকুর রহমান, সংগঠক হিসেবে জিতেছে বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামাল, প্রতিষ্ঠান হিসেবে জিতেছে বিসিবি আর বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি। বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধু সুলতানা কামাল খুকী বাদে আর কোন নারী খেলোয়াড় বা নারী ক্রীড়া সংগঠক এই পুরস্কার জিতেনি!

বাফুফের কর্মকাণ্ড দেখলে কাজী সালাউদ্দিনের স্বাধীনতা পুরস্কার কেড়ে নিতে মন চায়। কিন্তু আমাদের আগের জেনারেশনের লোকদের কাছে শুনেছি- বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলার হচ্ছে কাজী সালাউদ্দিন (আমাদের জেনারেশনের কাছে সম্ভবত মোনেম মুন্না)! যদি ধরেও নেই- কাজী সালাউদ্দিন বাংলাদেশের পুরুষ ফুটবলের সর্বকালের সেরা, তাহলে নারী ফুটবলের ক্ষেত্রে সাবিনা খাতুন আনপ্যারালালি সর্বকালের সেরা। পুরুষ ফুটবলের ক্ষেত্রে কাজী সালাউদ্দিনের যে অবদান, নারী ফুটবলের ক্ষেত্রে সাবিনা খাতুনের অবদান অনেক অনেক গুণ বেশি! ২০২২ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারটা (ক্রীড়াক্ষেত্রে) সাবিনা খাতুনের পাওয়া উচিৎ! দাবিটা তুললাম।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.